সমাজ ও সমকালের ভেতর থেকে গল্প আহরণের চেষ্টা শিল্পীর সহজাত প্রবৃত্তি। আমাদের চারপাশের মানুষ ও দৃশ্যমান জগতে রয়েছে নানা অসংগতি। সমাজের ভালো-মন্দ দিক শিল্পী তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিতে বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তোলেন। শিল্প অর্থাৎ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে বিরলপ্রজ নাট্যকার সেলিম আল দীনও এর ব্যতিক্রম নন। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানা বিষয় তাঁকে যেমন আলোড়িত করেছে, তেমনি ভাবিত করে তুলেছে মানবমনের বিপন্নতা। আর সে কারণেই বোধ হয় তাঁর রচিত নাটকে সমাজের দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র জীবন অনবদ্যভাবে উঠে এসেছে।
তাঁর সৃষ্টিতে আদিবাসীদের অস্তিত্বের সংকট, শ্রেণী-বৈষম্য, নারী নির্যাতনের চিত্র গভীর মমতায় আঁকা হয়েছে। তাঁর বনপাংশুল নাটকে পাঠকের পরিচয় হয় ক্ষয়িষ্ণু মান্দাই গোষ্ঠী আর বাঙালিদের সংঘাতের সঙ্গে, হরগজ-এ টর্নেডোর ধ্বংসচিত্র ও মানবিকতার বিপর্যয়, প্রাচ্য নাটকে আছে জীবের প্রতি ভালোবাসা, কিত্তনখোলাতে রয়েছে শিল্পী জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার পাশাপাশি নির্যাতিত নারীর উপস্থাপন, হাত হদাই-এ সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র, কেরামতমঙ্গল-এ এসে দেখা যায় পৃথিবীর মানুষসৃষ্ট নরকে যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন কত নির্মম হতে পারে তার দৃষ্টান্ত, অতৃপ্তি ও অবহেলার সঙ্গে বিষাদময় বসবাস কীভাবে আত্মহত্যায় নারীদের বাধ্য করে তা উঠে এসেছে যৈবতী কন্যার মন নাটকে আর নিমজ্জন তো বিশ্বমানবতা ভূলুণ্ঠিত হওয়ার সকরুণ চিত্র। সাহিত্যকর্মে অনালোকিত জীবন ও জগতের ওপর তিনি দিয়েছেন মানবিকতার দৃষ্টি। কথানাট্য চাকাও নাট্যকারের সমাজমনস্ক ও সহানুভূতিশীল হৃদয়েরই পরিচয়বাহী।
সাহিত্যচর্চার প্রথম দিকে সেলিম আল দীন প্রচলিত পাশ্চাত্য প্রভাবিত ধারাতে নাটক রচনা শুরু করেন। কিন্তু অব্যবহিত পরেই তিনি নিজের অন্বিষ্ট গন্তব্য খুঁজে পান। প্রাচ্য নাট্যরীতির স্বর্ণময় প্রভা তাঁকে আকৃষ্ট করে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আত্মস্থ করার চেষ্টা করেন নিবিড়ভাবে। দীর্ঘ দিন তিনি বাংলার বুকে প্রবহমান নিজস্ব ঐতিহ্যগুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন। তিনি তাঁর মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য গ্রন্থে প্রাচীন ও মধ্যযুগের অনবদ্য সৃষ্টি চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, গাজীর গান, শাস্ত্রগান, কৃত্যমূলক পাঁচালী, গীতিকার মধ্যে নাট্যমূলক উপাদানের উপস্থিতি প্রমাণ করেছেন।
বর্তমানে প্রচলিত পালাগুলির পরিবেশনা ও পাণ্ডুলিপি ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নৃত্য, গীত, বাদ্যের সঙ্গে গায়েন-দোহারের বর্ণনা ও সংলাপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নাট্যমূলক আখ্যানই বাংলা নাট্যসাহিত্যের নিজস্ব ঐতিহ্য। আঙ্গিক নিরীক্ষার সমসাময়িক সময়ে পুরাণ থেকে কাহিনি নিয়ে তিনি কিছুটা সংস্কৃত নাট্য আঙ্গিক মেনে রচনা করেন শকুন্তলা। তারপর প্রাচীন ও মধ্যযুগের নাট্যমূলক আখ্যানের অনুপ্রেরণায় বাঙলা বর্ণনাত্মক রীতির আধুনিক রূপের সাথে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেন কিত্তনখোলা নাটকে। হাত হদাই এই পর্বেরই রচনা।

চাকা নাটককে তিনি অভিহিত করলেন কথানাট্য নামে। পাঁচালীর অনুসরণে রচিত হয় বনপাংশুল ও প্রাচ্য। তবে তাঁর রচিত নাটকের আঙ্গিকের ক্ষেত্রে একটি থেকে অন্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাঙলা বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিতে লেখা হলেও কেরামতমঙ্গল, কিত্তনখোলা, যৈবতী কন্যার মন, নিমজ্জন নাটকগুলো একটি থেকে অন্যটি গঠনগত দিক থেকে ভিন্ন। যে গল্পটি যেভাবে বলতে ভালো লেগেছে তিনি সেটা সেভাবেই বলেছেন। চাকা নাটকে কথাসরিৎসাগরের কথামুখ, কথাপীঠ, তরঙ্গ, লম্বক-গল্প বিভাজনের এই রীতি যৈবতী কন্যার মন বা হরগজ-এ পাওয়া যায় না।
আবার হাত হদাই নাটকে বিভাজন রীতি জোয়ার ভাটার সাথে সংশ্লিষ্ট রেখে করা হয়েছে। মোট একুশটি জোয়ার এবং উনিশটি ভাটায় এ নাটকের কাহিনী বিস্তৃত। কিত্তনখোলা নাটকের কাঠামো বন্দনার পরে ‘সর্গ’ দ্বারা বিভাজিত হয়েছে, যেমন : প্রথম সর্গ, দ্বিতীয় সর্গ। অন্যদিকে কেরামতমঙ্গলের গল্প উপস্থাপনে অনুসৃত হয়েছে ‘খণ্ড’ দ্বারা বিভাজন রীতি, যেমন : নখলা খণ্ড, বিরিশিরি খণ্ড। এ সকল উদাহরণই সেলিম আল দীনের নিরীক্ষাপ্রবণতার পরিচয় বহন করে। তবে ভিন্ন ভিন্ন শিল্প আঙ্গিক তাঁর রচনায় একটি মাত্র আঙ্গিকের রূপ পরিগ্রহ করেছে। শিল্পের কোন একটি মাধ্যমে সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পের সব মাধ্যম আত্মীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন এই নাট্যাচার্য। এই শিল্প আঙ্গিককে তিনি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব অভিধায় সনাক্ত করেন।
১৯৯১ সালে রচিত চাকা নাটকে তিনি নিজেকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পী বলে ঘোষণা করেন। কথানাট্য চাকার কথাপুচ্ছ অংশে বলেছেন, ‘আমি কথার শাসনে নাটক রচনা করেছি তাই এর নাম দিয়েছি কথানাট্য।’১ কথা বলতে বলতে এই নাটক পরিপূর্ণ অবয়বপ্রাপ্ত হয়েছে। বর্ণনা, সংগীত, সংলাপ, কবিতা, দৃশ্যচিত্র — সব মিলেমিশে এক হয়ে ধরা দিয়েছে কথানাট্য চাকায়। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য প্রাণিধানযোগ্য :
চাকাকে কেউ যদি কাব্য বলে আপত্তি করব না- গল্প বললে অখুশী হব না। আমি সব সময় চেয়েছি আমার লেখা নাটকগুলো নাটকের বন্ধন ভেঙে অন্য সব শিল্পতীর্থগামী হোক। কারণ শিল্পে আমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী।২
তিনটি মঞ্চ নাটক শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকায় ১৯৮৬ সালে নাট্যকারকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। সেখানে তিনি শুধু নাটক রচনা করলেও শিল্পমাধ্যমের ক্ষেত্রে নিজেকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী হিসেবে ঘোষণা করেন।৩ সমকালীন বাঙলা নাট্যরীতিতে সেলিম আল দীন দ্বৈতদ্বৈতাবাদ শব্দটি শিল্প পরিভাষা হিসেবে প্রথম প্রয়োগ করলেও ভাবনাটি প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে ধর্মীয় আবহের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যদিও সেলিম ধর্ম থেকে দূরে সরে এসে শুধুমাত্র শিল্পের প্রসঙ্গেই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘বাঙলা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের পূর্বাপর’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি শিল্পতত্ত্বটির স্বরূপ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন:
মূলে ‘দ্বৈতদ্বৈতাবাদ’ কথাটি ‘অচিন্ত্য’ অর্থেই প্রযুক্ত হয়েছে, যেহেতু তা চৈতন্যের কাব্যতত্ত্ব থেকে গৃহীত। আলোচ্য শিল্প পরিভাষা ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদী তত্ত্ব’ নামেও অভিহিত হতে পারত। ‘অচিন্ত্য’র অর্থ অভাবনীয় অর্থাৎ যা ভাবা যায় না, তবে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে অচিন্ত্য ‘তর্কাতীত’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শিল্প পরিভাষায় ‘অচিন্ত্য’ কথাটি পরিত্যক্ত হওয়ায় এই শব্দের আত্যন্তিক ধর্মস্বত্বকে খানিকটা লাঘব করা যায়। কিন্তু তাতে একটা বিপত্তি হল, ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ মূলে দার্শনিক নিম্বার্কের মত।
প্রস্তাবিত শিল্পতত্ত্বে শিল্পের প্রাণধর্ম এবং আঙ্গিকগত ভেদের মীমাংসা আদ্যন্ত ‘অচিন্ত্য’ রূপেই সাধিত। অর্থাৎ এতে সাহিত্যের আঙ্গিক সম্পর্কিত সকল ভেদজ্ঞান বর্জনপূর্বক একটি মাত্র অভাবনীয় ঐক্যের উপলদ্ধিতে শিল্পাঙ্গিক সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এ তত্ত্ব নিয়ে বিতর্কের অবতারণা করা যায় কিন্তু একে অস্বীকার করার উপায় নেই (মূলে অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদের ব্যাখ্যাও তাই)। সুতরাং এ শিল্পতত্ত্বেও এক অর্থে ‘অচিন্ত্য’, এ ক্ষেত্রে দ্বৈতাদ্বৈতবাদ (বা ভেদ-অভেদ) শিল্পতত্ত্বের সঙ্গে ‘অচিন্ত্য’ শব্দ রূপে পূর্ব সংলগ্ন হচ্ছে না। কাজেই বক্ষমান প্রবন্ধে ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ অর্থেই ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ ধরে নিতে হবে।”৪
উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্টতই উল্লেখ করা যায়, একটি ধর্মদর্শন রূপান্তরিত হয়েছে শিল্পদর্শনে, আর সেজন্যই ‘অচিন্ত্য’ শব্দটিকে সচেতনভাবে বর্জন করা হয়েছে। মধ্যযুগে রচিত বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, জীবনী সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন প্রভৃতি বর্ণনাত্মক অভিনয় রীতির আশ্রয়ে বিভিন্ন আসরে পরিবেশিত হত। এগুলোর মধ্যে পাত্র-পাত্রীর মুখের সংলাপ, কাহিনির বর্ণনা, দ্বন্দ্ব অর্থাৎ নাট্যগুণ বিদ্যমান। এসবের পাশাপাশি রয়েছে গান, নৃত্য, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি সম্বলিত অভিনয়-যাকে বর্ণনাত্মক অভিনয় রীতি বলে অভিহিত করা হয়েছে।
উপন্যাসের গুণ, কাব্যের চিত্রকল্পতা, গানের মাধুর্য্য, বর্ণনার অনুপুঙ্খতা, সংলাপের গতিময়তা, চিত্রকর্মের সূক্ষ্মতা কাহিনিকে নানা দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে পরিণতি প্রাপ্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যা একই অঙ্গে সব রূপকে ধারণ করে অভেদ ভুবনের দিক নির্দেশ করে। গায়েন রীতি ও চরিত্রাভিনয়রীতিতে যা মূর্ত রয়েছে। নিজস্ব ঐতিহ্যকে আধুনিক সমাজ ও জীবনের অনুষঙ্গে নিজের নাট্যসাহিত্য সৃজন করার কৃতিত্ব বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাঁর হাতে বাংলা বর্ণনাত্মক নাট্য আঙ্গিক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। সে আঙ্গিকের আলোকে নিজস্ব ধারায় নাট্যরচনার এক পর্যায়ে সেলিম আল দীন নিজেকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পীরূপে উল্লেখ করেন।
দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পী সেলিম আল দীন রচিত চাকা নাটকের গল্পটি সাধারণ আটপৌরে গ্রামীণ জীবনের। নিষ্পাপ ভোর — ‘আকাশ যখন মিহীনীল কাঁথা’৫ তখন সূর্য দিগন্তের রেখায় সোনা রঙ ছড়িয়ে পৃথিবীর স্থানে স্থানে অতি উজ্জ্বল প্রতিফলন তৈরি করেছে। ঠিক এমনই স্বচ্ছ সুন্দর আলো ফোটা ভোরে গ্রামের পথ বেয়ে গল্পে উঠে আসে একটি গরুর গাড়ি। জলি ধানের বতরে যাবে বলে হলাঙ্গা ফকিরের সাদা ষাঁড় দুটো ভাড়া নিয়ে দিল সোহাগীর বিলের দিকে যাত্রা শুরু করে গাড়োয়ান বাহের। গাড়িটির সাথে পাঠকও গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে এগিয়ে চলে। কিন্তু পথ মধ্যে তৃতীয় তরঙ্গে জানা যায় হলুদ পলেস্তরা খসা এলংজানি হাসপাতালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার অপঘাতে নিহত হোসেনালি নামের এক যুবকের লাশ এসেছে। তাকে পৌঁছে দিতে হবে নির্দিষ্ট ঠিকানায়। বৈশাখের এক সকালে লাশ ও একটি ঠিকানা নিয়ে গাড়োয়ান ও দুজন সহযোগীর সাথে ডোম ধরমরাজ কাকেশ্বরী গাঙের পাড়ের গঞ্জ এলংজানি থেকে যাত্রা শুরু করে। পথে পথে নানা অভিজ্ঞতায় তারা দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় নবীনপুর গাঁয়ের এক নদীর তীরে এসে এসে পৌঁছায়। আর সেই নদীর তীরে অজ্ঞাত পরিচয় যুবকের লাশটি শাস্ত্রমতে দাফন করে।
অন্যায়ভাবে মৃত অনামা ব্যক্তিগণ সমাজে নানা ভাবে নীরব নির্যাতনের স্বীকার হয়। কিন্তু জীবিত মানুষ-যাদের ‘চারপাশে সেদ্ধ গরম ভাতের ভাপ’৬ তারা ‘লাশের চারপাশে মাছি উড়তে’৭ দেখেও সামাজিক সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে হঠাৎ অতিরিক্ত গাম্ভীর্যে বলে ওঠে ‘এখানে এসবের ঠাঁই হবেক না’।৮ নাট্যকার এ নাটকের কথাপুচ্ছে বলেছেন :
১৯৮৬-৮৭ সালের গণঅভ্যুত্থান আকস্মিক ভাবে স্তব্ধ হলে অন্য সবার সঙ্গে আমিও সমান বিচলিত হই। রাজনৈতিক দলের বাদানুবাদের-আবর্তে শহীদদের শব নাম পরিচয়হীন দিগন্তের দিকে ভেসে যায়-এ রকম বেদনা এই চাকা নাটকের মূলে আছে।৯
এ প্রসঙ্গে ড. লুৎফর রহমানের মন্তব্য :
তাঁর রচনায় জীবন সম্পর্কিত গভীর মানবিক বোধের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক শাসন-শোষণের স্বরূপ উন্মোচন প্রয়াস আছে।১০
সেলিম আল দীন অবশ্য নিজেই বলেছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তিনি নাটকটি রচনা করেন নি। তবে নাটকটির যে একটি ‘নিজস্ব ও নৈসর্গিক অর্থ আছে’ — তাও তিনি কথাপুচ্ছে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের স্বীকার হয়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে ভেসে চলে যে ব্যক্তির লাশ সেও একদিন পৃথিবীতে দৃপ্ত পা ফেলে হেঁটে চলত, আনন্দ-বেদনায় কম্পিত হতো তাঁরও অন্তর। মৃত্যুর পর নিজের লাশের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না মানুষের। তাই জীবিতের অবহেলার বা প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোন প্রত্যুত্তর সে দিতে পারে না। আর ঠিক এখানেই মানবিকতায় আর্দ্র হয়ে ওঠে সেলিম আল দীনের মন। এ বিষয়ে আলোচ্য নাট্যকারের বক্তব্য স্মরণযোগ্য :
এবং লেখার পর আমারও মনে হয়েছে সমকালের বেদনা এ রচনায় বহুদূরে নানা বাঁক ঘুরে ভিন্ন শিল্প ভাষায় এসেছে। ধরা যাক আমি বাস্তবেই একটি গল্প বলতে চেয়েছি, সে গল্পের শববাহী চাকার সঙ্গে সঙ্গে চলে যাচ্ছি মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে। এ কাহিনীর ক্ষেতমজুরদের হাতে কবর খনন হলে অনামা মৃতের গতি হলো। কেউ যে চিনতে পারল না তার কষ্ট নিবারিত হল জানাযা ও কবরের পরে। সে আনন্দ ও শোকের যদি কোন মানবিক তাৎপর্য থাকে তবে তাতেই আমি খুশী হব।১১
দিল সোহাগীর বিলে ধানের বতরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া বাহেরকে ৫০ টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব দেয়া হয় লাশ ঠিকানা মত পৌঁছে দিতে। লাশ নিতে হবে শুনে সঙ্গী পইরাতের একজন পালিয়ে যায়। আর বাকি দুজনের একজন বৃদ্ধ, হাঁপানি রুগী। অন্যজন যুবক থেকে গেল শুধু কৌতূহলের কারণে। লাশের সঙ্গে গেলে কেমন লাগে তা দেখার জন্য। আলোচ্য নাটকের পরতে পরতে নাট্যকার নানা দার্শনিক সত্য পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। মানুষের কৌতূহল প্রবণতার বিষয়ে নাট্যকারের অভিমত-‘কৌতুহল এক আজব কারবার কৌতুহল মানুষকে বিষ পিঁপড়ার বাসা পর্যন্ত নিয়ে যায় বোলতার হুল নখে তুলে দেখতে বলে* বড় চন্দ্রবোড়ার মুখ হা করে ভেতরটা কেমন দেখে নিতে বাধ্য করে।’১২
গরুর গাড়িটি পথ চলতে চলতে কাব্যময়তাও ঘনীভূত হয়। গল্প বুননের যাদুতে দৃশ্যকল্পগুলো পাঠকের চোখে নতুন ভাষা হয়ে ওঠে।
সামাজিক বৈষম্য ও শ্রেণি-সংগ্রামের যে চিত্র বর্তমান পৃথিবীতে চলমান তা দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি নাট্যকারের। বাস্তবতা ও পুরাণের কথকতায় গল্প এগিয়ে চলে গ্রামের পথ বেয়ে। লাশ দেখে ভীড় বাড়ে। কার লাশ, কিভাবে মারা গেল?-এ সব প্রশ্ন বিদ্ধ করে গাড়োয়ানকে। সরকারী হুকুকে যাচ্ছে শুনে নানাজন নানা মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। কেউ কেউ নিজের জানা-শোনা অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে নতুন কাহিনির জন্ম দেয়।
হোসেনালির মৃত্যু নিয়েও নানা গল্প তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হয় ও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। নাট্যকার অভিমত দিয়েছেন ঠিক এভাবেই ‘লোকপুরাণ ও বৈদিক কথকতা’১৩ যুগে যুগে বাস্তবতার আকার পেয়ে এসেছে। একজন কালাই মটর ডালের বস্তা টানা শ্রমিক মনে মনে ভাবে অতিকায় কোন দৈত্য মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে এসে গল্পের হোসেনালির ‘বুকে নখ ফুটিয়ে তার রক্ত পান ও গিল কলিজা খেয়ে নিয়েছিল।’১৪ শোষণে নিপীড়িত সেই শ্রমিকের কাছে ভূত বা দৈত্য বলতে মহাজনের চেহারা ভেসে ওঠে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় নিপীড়িত শ্রেণীর ভাবনা এর মাধ্যমে স্পষ্ট রূপ পায়।
গরুর গাড়িটি পথ চলতে চলতে কাব্যময়তাও ঘনীভূত হয়। গল্প বুননের যাদুতে দৃশ্যকল্পগুলো পাঠকের চোখে নতুন ভাষা হয়ে ওঠে। চাটায়ের ফাঁক দিয়ে হোসেনালির পা দেখে যুবক শুকুর চান ভাবে চাটাই মোড়া মৃত মানুষটির বয়স হয়ত তারই মত। নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে সে কল্পনার রাজ্যে নানা রকম ছবি আঁকে। ভাবে, মৃত ব্যক্তিটি যাকে ভালোবাসতো সেই মেয়েটি রাতে পিতলের কুপির আলোতে চুল বাঁধতে বসবে, হয়ত ঠিক তখনই লাশটি ঠিকানা মত গিয়ে পৌঁছাবে। মেয়েটি হোসেনালির লাশ এসেছে শুনে কুপি ফেলে হয়ত অন্ধকারের মধ্যে দৌড়ে আসবে।
গ্রামীণ আলো আঁধারের রাতে অপ্রত্যাশিতভাবে হোসেনালির মৃতদেহ দেখে স্বজনদের কান্নার চিত্র কেমন হবে তা ভাবতেই শিওরে ওঠে জীবিত শুকুর চান। সাঁওতাল যুবক ধরমরাজ মাতাল হয়ে এই লাশকে ‘পোড়ামাটির ধরম ঠাকুর’১৫ ভেবে নিয়ে সাঁওতাল পুরাণের কথা বর্ণনা করে। কাহিনির এক পর্যায়ে বাহের তার গাড়ীতে লাশ বহনে অস্বীকৃতি জানালে প্রৌঢ় তাকে বলে ‘হাজার ফিরিশতা না এই লাশের পাশে’।১৬ সঙ্গে সঙ্গে বাহেরের ধর্মভীরু মনে সম্ভ্রম জেগে ওঠে। গাড়োয়ানের মনে হয় লাশকে স্বশ্রদ্ধ সম্মান দেখানো জীবিতের কর্তব্য। তার নিজের সন্তানের অকাল মৃত্যুর চিত্র যেন এই লাশ বহনের শোককে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এক পর্যায়ে বাহের তার লাশ বহনকারী গাড়ির পাশ দিয়ে পাকা ধানের আঁটি বোঝাই গাড়ি যেতে দেখে মনে মনে তৃপ্তি পায় এই ভেবে যে, ‘শস্যের চেয়ে কি লাশের মূল্য কম’১৭ নাট্যকারের ভাষায়- ‘না শস্যের চেয়ে লাশ বহনকারীদের অহঙ্কারও কম নয়* কারণ নয়ানপুরের যে গৃহে আজ শোকধ্বনি উঠবে উত্তীর্ণ প্রদোষে সে শস্য সহজে ফলে না* — এ গাড়ীতে এমন এক কষ্ট বহন করে নিয়ে যাচ্ছে সে যে তাতে বরং ভরা ধানের সোনার আড়ত ভূষি উড়ে যাবে*’১৮
মানুষের ভাবনা আর বাস্তবতার মিল আকাশ-পাতাল। নয়ানপুরে হোসেনালির লাশ এসে পৌঁছালে হাজারো মানুষ ভিড় করে। মিলিয়ে দেখে চোখের আড়ালে থাকা অথবা খোঁজ না পাওয়া স্বজনের সাথে। কলেজ ছাত্রী রেহেনা, শরবতী, জব্বারের বাপ, হেড মাস্টার। সবাই আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে, এই অপঘাতে মৃত হোসেনালি তাদের কেউ নয়। ব্যতিক্রম শুধু সোনাফরের মা, যে লাশটি নিজের সন্তান সোনাফরের ভেবে শোকে বিহ্বল হয়ে ওঠে।
নয়ানপুরেই একজন হোসেনালির খোঁজ পাওয়া যায়। সেই হোসেনালি মনোযোগ দিয়ে মৃত হোসেনালির মুখ নিরীক্ষণ করে। জীবিত ও মৃত্যের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক অথচ পাশাপাশি অবস্থিত। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় এই মৃত তাদের গ্রামের কেউ নয়, তাই তার ঠাঁই এখানে হবে না। যেন জীবিতের দায় যদিও বা নেয়া সম্ভব কিন্তু মৃতের নয়। নাট্যকার কৌশলে শিক্ষিত মানুষের বিবেকের দরিদ্রতা এই কথানাট্যে সংযুক্ত করেছেন। হেড মাস্টার সাহেব জানান এই গ্রামে স্কুল, কলেজ আছে। লোকজন শিক্ষিত। উপমন্ত্রী এসেছিল গেল মাসে। আর তাই অপঘাতে মৃত উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরা লাশ তাদের কেউ হতেই পারে না। তিনি সদম্ভে বলেন- নবীনপুর বলে ‘জুয়াড়ী গরুর দালাল আর সিধেঁল চোরদের গ্রাম* সে গ্রামে সবচেয়ে বেশী অপঘাতে লোক মরে*’১৯ এই ব্যক্তিও ঐ গ্রামের হতে পারে। তিনি ধরেই নিয়েছেন লাশটি ভালো কোন মানুষের নয়। তারপর ‘অভুক্ত ক্লান্ত চারজন মানুষ ও একজন ভুল ঠিকানায় আসা মৃত যাত্রা শুরু করে।’২০ এবার উদ্দেশ্য নবীনপুর।
গরুর গাড়িতে চাটাই মোড়া একটি লাশ। ঠিকানাবিহীন। ঘুরছে একের পর এক জনপদ। তাকে ঘিরে বাড়ছে কৌতূহল। চলতি পথে কতজন মৃতের সাথে নিজেদের পরিচিত চোখ, নাক, মুখ, ‘ডানদিকের চোখের নিচের ছোট্ট তিল’২১ মিলিয়ে নেয়। আর আপনজন নয় ভেবে যার যার মতো করে স্বস্তি খোঁজে। হয়ত ‘যে কান্না এখানে কেউ কাঁদলো না সে কান্না দূরে অপেক্ষা করছে*’২২ কিন্তু লাশ অথবা ফসল-চাকা ও ষাঁড়েদের কাছে ভেদাভেদহীন। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে তারা আপন নিয়মে এগিয়ে যায়। হয়তবা ‘স্বজন নাই পরিচয় নাই বলে জগতে অজানা অচেনা মানুষও অন্তত এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলবে না’২৩ বলে চাকাদ্বয় মানুষের লজ্জা ঢাকতে বদ্ধ পরিকর হয়ে ওঠে। তাই চাকার শব্দে ‘মিহি কান্নার কথকতা’২৪ শোনা যায় গ্রাম্য ও চিত্রিত পথে প্রান্তরে। প্রৌঢ় বলে ওঠে ‘চাকায় কান্দে শুকুর চান দেখ তাই চাকায় কান্দে।।’২৫
নবীনপুরে প্রবেশের মুখে বিয়ে বাড়িতে মাইকের উচ্চ আওয়াজ। বিয়েটা বকশি বাড়িতে। একটি যুবকের কথাতে স্পষ্ট হয় এই বাড়িতে সমাজের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিদের বসবাস। ক্ষমতার দাপট থাকলেও, নেই মানবিকতা। শিক্ষিত তথাকথিত ভদ্র লোকদের কাছে পচন্ত লাশ নিতান্তই ঝামেলার বস্তু। নবীনপুরের অধিবাসীদের একবারও মনে হয় না তিনজন লোক অজানা এক মানুষের লাশের ঠিকানা খুঁজতে ব্যাকুল। সহানুভূতি ও সাহায্যের বদলে উল্টো ষাঁড় ও লাশ বহনকারীদের উপর এক পর্যায়ে হামলা চালানো হয়। গ্রামের লোকেদের চেহারা দেখে মনে হয় তারা ‘যেন অবিলম্বে নতুন কোন হত্যাকাণ্ডে নামবে*’২৬ ‘আমরা এট্টু ওই গাছের ছেমায় ভাত আইন্ধে খামো এট্টুক্ষণ* আমরা তিনজন মানুষ গতকাল থিকে পেরায় না খেয়ে আছি’২৭ ক্ষুধার্ত ক্লান্ত মানুষগুলোর এমন আর্তিতেও জীবিত মানুষদের মনে করুণার সঞ্চার হয় না।
গাড়ির পাটাতনে পচন্ত লাশ নবীনপুরবাসীর আর্দ্র দৃষ্টি পায় না। ফুলে ওঠা একটা লাশের বিরুদ্ধে তারা একজোট হয়ে ওঠে। বরং সরকারি লাশ, তাই কোন ঠিকানা নাই বলে হাসাহাসি করে। এমনকি গন্ধ ছোটা লাশটি মাটি চাপা দেওয়ার জন্য একটু সরকারি জায়গা চাওয়ার অপরাধে বাজার কমিটির মেম্বারও গাড়োয়ানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। অথচ ধানের বতরে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে ডেকে যার গাড়িতে লাশের সওয়ার চাপিয়ে দেয়া হয় সেই খাটুনি বেচা সমাজের অবহেলিত গাড়োয়ান ও তার সঙ্গীদ্বয় একবারও বলতে পারে না এই লাশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একজন ডাকপিয়নের থেকে বেশি কিছু না। টাকার বিনিময়ে নিছক দায়িত্ব পালন যাদের লক্ষ্য ছিল এক দিন ও এক রাতের ব্যবধানে তারাই অনুভব করে লাশটি তাদের আপনজন হয়ে উঠেছে।
সেলিম আল দীনের চাকা শুধু লাশের গল্প নয়। এখানে জীবনের হাজারো আয়োজনের পাশাপাশি ঘাপটি মেরে আছে মানুষ জীবনের শেষ পরিণতির দৃশ্যকল্প। প্রতিদিন জীবন্ত মানুষকে ঘিরে কতশত গল্প জন্ম নিতে থাকে। আর মৃত মানুষের চারপাশে ভিড় করে কান্না অথবা হোসেনালির লাশের মতো লাল পিঁপড়া ও মাছি। অথচ একটু ভাবলেই বোঝা যায় এই হোসেনালিও কারো সন্তান ছিল। তারও ছিল সুখ-দুঃখ, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পূর্ণ একটা জীবন, ছিল পরিজনের জন্য ভালবাসা ও বুক ভরা স্বপ্ন। সব পেছনে ফেলে সে আজ অনামা গন্তব্যে চলে গিয়েছে। এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে আমরা প্রত্যেকেই ধাবমান-যে যার মতো করে। নাট্যকারের ভাষায়, ‘সবাই মরে, তবে কেউ কারো মতো করে মরে না।’২৮
নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া হাজারো প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে একদিন প্রত্যেকেই লাশে পরিণত হবে। যেমন গল্পের হোসেনালি আর হোসেনালি নয় হয়ে গেছে হোসেনালির লাশ। সভ্য সমাজ মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষও একে অন্যের প্রতি থাকবে শ্রদ্ধাশীল। কর্মব্যস্ত সমাজে মানুষে মানুষে বাড়ছে দুরত্ব। দায়িত্ববোধহীন সমাজ জীবিতের প্রতি উদাসীন। মৃতের প্রতি সেখানে কোন ভালোবাসা অপেক্ষা করে না। একদিনের ব্যবধানে কাঁচামরিচের হলুদ ও লাল রং ধারণ নীরবে প্রবহমান সময়েরই প্রতিচ্ছবি। মানব জাতির এই হাজার বছরের পথ চলা কী তাকে সত্যিই কোথাও পৌঁছাতে দিচ্ছে।
আধুনিক সভ্য সমাজে মানুষকে যতদিন নির্মমতার শিকার হতে হবে ততদিন পর্যন্ত চাকা তার আপন নিয়মে মানবতার বাণী বহন করে মিহি সুরে কেঁদে চলবে।
নাগরিক ব্যস্ত মানুষ মানবিকতার পাশাপাশি যেন নিজের অস্তিত্বকেও ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। এক রাতের ব্যবধানে মৃতের শরীর ফুলে যে বিকৃত আকার ধারণ করেছে সে রূপকে যেন জাঁক-জমকপূর্ণ এ জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশিত হয়েছে। তবু মানুষ ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। কিন্তু প্রকৃতির কাছে সবাই সমান। মানুষের অবহেলা যাকে তীব্রভাবে আঘাত করেছে নদীর দুই তীর তাকে দুই হাত বাড়িয়ে টেনে নেয়। সভ্য মানুষের জনপদ প্রত্যাখ্যান করল বলে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষও লাশটি রাস্তায় ফেলে যেতে পারে না। নদীর তীরে খন্তায় করে বালূ তুলে কবর তৈরি করে। অবাক হতে হয় দোয়া কলমা না জানা মানুষগুলো জানাজা পড়তে গিয়ে কাঁদে। কবর দেয়ার পর গাড়োয়ান কবরের পাশের মাটি খামচে ধরে কাঁদতে থাকে। ‘কেন। সে জানে না* এই মৃতের প্রতি দূর্ব্যবহার পরিচয়হীন করুণ কবর কিংবা তারই পথ চলার এক সঙ্গী চিরকালের জন্য ধুলি মাটির নীচে চলে যাওয়া।।’২৯
মানব জীবনের সার্থকতা যারা অনুধাবন করতে পারে না তাদের কাছে মানুষের বিকৃত হয়ে ওঠা মৃতদেহ শুধুমাত্র একটা লাশের অতিরিক্ত কোন অর্থ বহন করে না। নামে মাত্র যারা জীবিত তাদের কাছে সংক্ষিপ্ত জীবন পূর্ণতার নয় বরং শূন্যতার। আত্মসুখসন্ধানী এ সকল মানুষ ‘জীবনের প্রচুর ভাড়ার’৩০ উপভোগে অক্ষম। কিন্তু জীবিতের জীবন তো শুধু নিজের জন্যই নয়। মর্ত্য জন্মের শেষ আলো পেছনে ফেলে হুদয়বান ও হৃদয়হীন সবাই পাড়ি জমাবে অনিশ্চিত গন্তব্যে। হেড মাস্টার, বকশি বাড়ির কর্তাব্যক্তি, বাজার কমিটির মেম্বার যে উদার ভালোবাসা দেখাতে পারেনি তা পেরেছে হতদরিদ্র বাহের, প্রৌঢ় ও শুকুর চান — আইচ্ছা ঠিকানা ভুল হলে কি মরা মানুষের দায়িত্বটা কুনোজন নিবু না। যে মরা তারতো নিজের কিছু করণের ক্ষমতা নাই* সে না পারে চলতে না পারে নিজের কুনো উপকার করতে*৩১ গাড়োয়ানের কথাটা যেন পেণ্ডুলামের মতো আধুনিক মানুষের সামনে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে।
ভালবাসাকে পায়ে দলে স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরীচিকার পিছনে কেবলি ছুটে চলেছে মানুষ। আধুনিক সভ্য সমাজে মানুষকে যতদিন নির্মমতার শিকার হতে হবে ততদিন পর্যন্ত চাকা তার আপন নিয়মে মানবতার বাণী বহন করে মিহি সুরে কেঁদে চলবে। সুন্দর পৃথিবীতে অমানবিকতাকে পাশ কাটিয়ে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার মন্ত্রে উজ্জীবিত হোক সবাই। সহানুভুতি ছড়িয়ে পড়ুক দিক দিগন্তে।
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র ৪, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৯, পৃ ১৬৩
২. পূর্বোক্ত, পৃ.১৬৪
৩.‘শুধু নাটক রচনা করলেও শিল্প মাধ্যম সম্পর্কে আমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী। কেননা শিল্পের সমস্ত রঙ, শব্দ, চিত্র, পাথর, নীলিমা, অগ্নি ও বরফ, শেষ পর্যন্ত পুরুষ অর্থাৎ মানবাভিসারী।’ — সেলিম আল দীন, তিনটি মঞ্চ নাটক, বাংলা একাডেমী ঢাকা, ১৯৮৬, পৃ. ভূমিকা।
৪. সেলিম আল দীন, ‘বাঙলা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের পূর্বাপর’, সেলিম আল দীন সম্পাদিত থিয়েটার স্টাডিজ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা ১৯৯৯ (পুনর্মুদ্রিত), নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
৫. সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র ৪, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৯, পৃ ১২৬
৬. পূর্বোক্ত, পৃ.১৫৯
৭. পূর্বোক্ত, পৃ.১৫৯
৮. পূর্বোক্ত, পৃ.১৬০
৯. পূর্বোক্ত, পৃ. কথাপুচ্ছ
১০. লুৎফর রহমান, কালের ভাস্কর সেলিম আল দীন, রোদেলা প্রকাশনী, ২০০৯, পৃ.৩৪
১১. সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র ৪, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৯, পৃ. কথাপুচ্ছ
১২. পূর্বোক্ত, পৃ.১৩২
১৩. পূর্বোক্ত, পৃ.১৩৩
১৪. পূর্বোক্ত, পৃ.১৩৩
১৫. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৪
১৬. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৮
১৭. পূর্বোক্ত, পৃ.১৪২
১৮. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪২
১৯. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪৯
২০. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪৯
২১. পূর্বোক্ত, পৃ.১৪১
২২. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪১
২৩. পূর্বোক্ত, পৃ.১৪০
২৪. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪০
২৫. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪০
২৬. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫৬
২৭. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫৬
২৮. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৬
২৯. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬১
৩০. জীবনানন্দ দাশ, কবিতাসমগ্র, দি স্কাই পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০১২, পৃ.১৭৯
৩১. সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র ৪, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৯, পৃ. ১৫৩







































