যখন ফুটিল কমল ।। কিস্তি : ৮

পল ক্লী

বায়োগ্রাফিক্যাল ফিকশন বা আত্মজৈবনিক কথাসাহিত্য — যখন ফুটিল কমল। লেখার পরিণতি কী দাঁড়াবে লেখক নিজেই তা ভালো বলতে পারবেন। জাহিদুর রহিম চমৎকার গদ্যে উপহার দিয়েছেন জীবন ও দর্শনের মৌলিক প্রশ্ন ও উত্তর।

 

একবার উঠেছিল, তবু মাঝপথে

যেন থেমেছে করাত,

শুধু গুঁড়ো পড়ে আছে।

অর্ধেক খেলার পরে সমস্ত পুতুল গেছে উঠোন পেরিয়ে;

অর্ধেক প্রেমের পর রোদ পড়ে এসেছে শরীরে

অর্ধেক ঘুমের পর তুমি চলে গেছ।

— ‘অসমাপ্ত’ প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত

 

শুরুর লাইন, ‘পৃথিবীর সুখী পরিবারগুলো আর তাঁদের সুখের উচ্ছ্বাস একই রকম। পৃথিবীর দুঃখী পরিবারগুলো তাঁদের দুঃখের মতো আলাদা আলাদা’।

 

শেষের লাইন, “আমি কেন প্রার্থনা করছি — যুক্তি দিয়ে সেটা বুঝতে যাবো না। তবু আমি প্রার্থনা করবো। এখন থেকে আমার জীবন কেবল আমার। আমার জীবনে যাই ঘটুক — শুধু জানি প্রতিটি মিনিট নতুন হবে, আগের মতো অর্থহীন হয়ে থাকবে না। সময়ের মধ্যে সর্বদা একটা শুভ বোধের অবস্থান থাকে সন্দেহাতীত ভাবে — আর এই বোধ আমার নিজের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারি কেবল আমি”। (আনা কারেনিনা)

 

একটা উপন্যাসের শুরু ও শেষের লাইন এরচেয়ে আর কত সুন্দর হতে পারে? দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে মনোরম এই বইয়ের প্রতিটি শব্দ চুইয়ে নামছে অপ্রাপ্তি আর বিষাদময় মিলনের হাহাকার। এমন বিষণ্ণ অসমাপ্তিই বুঝি জড়িয়ে থাকে প্রতিটি মানুষের জীবনে, জীবনের প্রতিটি কানায়। ভিন্নতা হয়তো আকারে, প্রকারে আর উপলব্ধির সঘন বাস্তবতায়।

 

তবু বিষণ্ণতা তো বিষণ্ণতাই। যা কিছু নিয়ে বলতে চাই, যা কিছু দেখি — রক্ত-মাংসের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা অগ্রাহ্য করে এই আলো-হাওয়া-জল-মাটিতে কেবলি এক আলোকিত মুখচ্ছবি; যেন বহুদূর হতে আসা কাতর এক গাংচিল!

 

কিন্তু তাকে নিয়ে কিবা বলি! আমি কি ফিরে পাবো কিছু যা হারিয়েছি? আমার জীবনের ফেলে আসা পথ, আমার সারাটি জীবন কি এক সঙ্গে এক প্যাকেটে মুড়ে কোন ঝরা পাতার বিকেলে ওই বিবর্ণ পাতাগুলোর মতই কেউ ফেলে যাবে?

 

গ্রহ বা নক্ষত্রকে জয় করেন যিনি, তিনি জানেন কতটা পুড়তে হয় ওই নক্ষত্রের মতো আলোকিত হতে হলে। ছোঁয়ার দূরত্ব পেরোনো হয় না যার, তার তো শুধুই চলার ইতিহাস। আমাকেও বলতে হলে সেই চলার ইতিহাসই তো বলতে হবে।

 

কে যেন আজ পুরনো দিনের কথা বলে গেলো ফিস ফিস করে, সারাদিন আজ আর কাজ হল না। সারাদিন একটা ভোঁতা ভোঁ ভোঁ শব্দ কানে গেথে আছে যেন, একটা উজবুক বোধ। চারপাশের শব্দগুলো যেন বিহ্বল করে দিচ্ছে।

 

‘আমাদের জীবনযাপনকে ঘিরে ধরছে পঙ্গপালের মতো শব্দাবলি, কিন্তু ক্রমে টের পাই যে অল্পে অল্পে তার পরিবহণ গেছে নষ্ট হয়ে। নিষ্ফলা কথায় দিন কাটে দ্রুত, রাত্রে ঘরে ফিরে দেখি হাতে সঞ্চয় ঘটেনি কিছু। অভ্যাসবশে কথা বলা আর মিথ্যে বলার এই সমূহ সর্বনাশ শিল্পেও তার চিহ্ন রেখে যায়’। ( শব্দ থেকে পালানো / শঙ্খ ঘোষ)

 

জীবনের চারপাশ এলোমেলো করে দেয়া এসব পরিত্যক্ত শব্দ আমাকেও ক্রমে অসুস্থ করে তুলছে। কয়েক সপ্তাহ পরে আমাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। এত ভয়ংকর ব্যথা হচ্ছিল, আমি তো জানি ব্যথা হবে কিন্তু এমন ভয়ংকর ব্যথা যে কিছুই কাজ করছিল না। মরফিন-প্যাথেড্রিন দিয়েও ব্যথা ভুলে ঘুমাতে পারছিলাম না। এক সময় দেখতে পেয়েছি মৃত্যুর সোনালি বিদ্যুৎ। না কোনো আশা, না কোনো সান্ত্বনা, কিছুই ছিল না আমাকে সান্ত্বনা দিতে। পুরো পৃথিবী যেন সেই ব্যথার মুহূর্তে নিভে গিয়েছিল।

 

আমি যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম, সেখানে একটি বারান্দা রয়েছে, বাইরের দৃশ্য দেখা যায়। আমার কেবিন রাস্তার ঠিক উপরেই। রাস্তার একপাশে আমার হাসপাতাল এবং অন্যদিকে বাচ্চাদের খেলার ছোট একটা পার্ক। আহ, শৈশব। আজ মনে হয় যেন সেই পৃথিবী কখনও আমারই ছিল না। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে আমার ক্লান্ত লাগে, মনে হয় মিশে যাই বাতাসে। আসলে আমি বেদনার জালে আটকা পড়ে আছি।

 

আমার উপলব্ধি হলো, এই পৃথিবীতে নিশ্চিতভাবে দাবি করা যায়, এমন কোন কিছুর অংশীদার নই আমি। হাসপাতাল না, পার্ক না, আমার চাকরি-ডিগ্রি-উপাধি-মোহ কিছুই না। আমার ভিতরে যা ছিল তা আসলে আমার ভিতরকার দুনিয়ার  অপার শক্তি আর বুদ্ধির প্রভাব ছাড়া আর কিছু নয়। আমি এমন জীবন কাটিয়েছি যেখানে অনিশ্চয়তাই ছিলো নিশ্চয়তা।

 

এই উপলব্ধি আমাকে সমর্পণ আর ভরসার জন্য প্রস্তুত করেছে। আমি জানি, ‘আমার জীবন আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে আজ থেকে আট মাস পর, অথবা দুই বছর পর’ — এমন যেসব চিন্তা আমাকে এলোমেলো করে দিচ্ছিলো হাসপাতালে, সেই চিন্তাগুলোও বিলীন হয়ে গেছে, যখন ভেবেছি কিছুই আমার না। এবং আমার ভেতর থেকে মৃত্যুচিন্তা একেবারে উধাও হয়ে গেছে। হাসপাতালে বন্দি থেকেই প্রথম ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে আমি প্রকৃতপক্ষে উপলব্ধি করলাম।

 

এই পৃথিবীর প্রকৃত রূপে (ক্রিয়া-কর্মে) আমার বিশ্বাসপূর্ণ সত্যে পরিণত হয়েছে। তারপর আমার উপলব্ধি হয়েছে এই বিশ্বাস আমার শরীরের প্রতিটি কোষে জড়িয়ে গেছে। শুধু সময়ই বলে দেবে সে থাকে কি না! এই মুহূর্তে আমি এটিই অনুভব করছি।

 

অসুস্থ যাত্রায় আমার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন আমার প্রিয়জন শুভাকাঙ্ক্ষীগণ। সম্মিলিত প্রার্থনা বা শুভ বোধ একটি দুর্দান্ত শক্তি, দ্রুত জীবনের স্রোত, আমার মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আমার মাথার উপরে কপাল দিয়ে ফুটে উঠেছে। কখনো একটি কুঁড়ি হয়ে, কখনো একটি পাতা, কখনো একটি শাখা হয়ে… আমি খুশি হয়ে তাদের দিকে তাকাই। মানুষের সম্মিলিত প্রার্থনা থেকে উদ্ভূত প্রতিটি ফুল, পাতা আর শাখা আমাকে একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়। আমার উপলব্ধি হয়েছে, ঢেউয়ের মধ্যে যে তরঙ্গের দোলা সেটাকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই, কেননা প্রকৃতির তরঙ্গ দুলছেন প্রতিনিয়ত। ঘুরছে একটি নীরব শব্দের অন্তরে। এলিয়ট কী অপূর্ব লিখেছিলেন, “যদি হারানো কথাগুলো হারিয়ে যায়, যদি ব্যয়িত শব্দগুলো ব্যয় হয়ে যায়, যদি না বলা হয় কথা , না-শোনা হয় শব্দ, তবু এখনো পৃথিবীতে না-বলা কথা আছে, না-শোনা শব্দ আছে, শব্দহীন একটি শব্দ আছে, শব্দের ভিতরে শব্দ আছে, গভীর অন্ধকারে আলোর প্রজ্বলন আছে, আর এই অস্থির পৃথিবী ঘুরছে সেই শব্দের বিপরীতে, সেই নীরব নীরব শব্দের কেন্দ্রে।’’

 

কিন্তু নীরব সেই শব্দের কেন্দ্রে মানুষ পৌঁছাতে পারেন না, মানুষের সৃষ্টি হয়তো সেখানে পৌঁছে যায়। শিল্পী যেখানে পৌঁছাতে চান, শিল্প সেখানে পৌঁছে না। শিল্প হলো অসম্পূর্ণতার সাধনা। শিল্প এক বিবশ বোধ। কিন্তু মানুষ এসব বোঝে না, বুঝলেও মানতে চায় না কেন? নীৎসে বলেছিলেন, “Sometimes people don’t want to hear the truth because they don’t want their illusions destroyed.’’

 

মানুষের এই ইমোশন কি সময়ে সময়ে সময়ে মুছে যায় নি, তবু মুছে গেলেও ইলুশন নিয়ে মানুষ দুনিয়ায় হাজার হাজার বছর লড়েছে, মনে পুষে রেখেছে। মানুষ ইলুশন ভালোবাসে, অন্তত দুনিয়ার ইতিহাস আমাদের তো তাই বলে। জগত তো চলে ইতিহাসের সূত্র ধরে। আল-মিকাদ্দিমায় ইবনে খালদুন লিখছিলেন, ‘অতীত আর ভবিষ্যৎ এর মধ্যে মিল দুই ফোটা বৃষ্টির পানির মতো’। কিন্তু সময়ের এই চলার পথ কি আমরা বুঝতে পারি এই ঘোর লাগা একঘেয়ে জীবনে? কত দূর পারি? সময়, আমাদের জন্মধাত্রী, আবার সে-ই আমাদের ঘাতক। গতকাল সময় আমাদের দুগ্ধপান করিয়েছিল আর আগামীকাল কাল সে আমাদেরই গিলে খাবে। এভাবেই চলছে, সে কথা আমরা ভালোভাবেই জানি।

আসলেই কি জানি?

পৃথিবীতে সর্বপ্রথম যে বইটি লেখা হয়, তাতে রাজা গিলগামেশের নানা অভিযানের বর্ণনা আছে। তিনি কিন্তু মরতে চাননি। এই মহাকাব্য পাঁচ হাজার বছর আগে মানুষের মুখে মুখে শুরু হয়েছিল, এরপর একে একে সুমেরীয়, আক্কাডিয়ান, ব্যাবিলনিয়ান এবং আসিরিয়ানদের দ্বারা লিখিত রূপ পেয়েছে।

 

ইউফ্রেটাস নদীর তীরের রাজা গিলগামেশ ছিলেন মানুষ ও দেবীর শংকরজাত পুত্র। স্বর্গীয় অভিলাষ, (বনাম) মানুষের নিয়তি: উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি দেবীর কাছ ক্ষমতা ও সৌন্দর্য আর মানুষের কাছ থেকে পেয়েছিলেন মৃত্যু। বন্ধু এনকিদুর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মৃত্যু শব্দটি তার কাছে অর্থহীন ছিল।

 

গিলগামেশ ও এনকিদু দু’জনেই বিস্ময়কর কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। তারা একসঙ্গে দেবতাদের আবাসভূমি সিডার বনে প্রবেশ করেছিলেন এবং দৈত্যকায় সেই রক্ষককে পরাজিত করেন, যার গর্জনে সমস্ত পর্বতমালা থর থর করে কাঁপতো। এরপর তারা স্বর্গের ষাড়কে অপদস্থ করলেন, যার এক গর্জনে মাটিতে এমন গর্ত সৃষ্টি হতো যেখানে শত শত মানুষ নিমেষেই নিঃশেষ হয়ে যেত। এনকিদুর মৃত্যুতে গিলগামেশ ভেঙে পড়েন। তিনি আতংকিত বোধ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, তার বীর বন্ধু মাটির সৃষ্টি, আর তিনি নিজেও তাই। অতএব, শাশ্বত জীবনের সন্ধানে বের হলেন গিলগামেশ।

 

অমরত্বের খোঁজে বহু মরুভূমি-প্রান্তর পারি দিলেন, তিনি আলো আর অন্ধকারকে অতিক্রম করলেন, বড় বড় সব নদী- সাগর পার হলেন, এবং এরপর উপস্থিত হলেন স্বর্গের বাগানে। রহস্যের অধিকারিণী, পানশালার এক মুখোশধারী পরিষেবিকা তাকে আপ্যায়ন করলেন। তিনি সমুদ্রের অন্য পাড়ে পৌঁছালেন, মহাপ্লাবনের পরেও টিকে থাকা সেই জাহাজটি আবিষ্কার করলেন। বৃদ্ধকে যুবায় পরিণত করে সেই গাছও তিনি দেখতে পেলেন, এরপর, তিনি উত্তর এবং দক্ষিণের নক্ষত্রের গতিপথ অনুসরণ করলেন, যে দ্বার দিয়ে সূর্য প্রবেশ সেই দ্বার তিনি খুললেন এবং যে দ্বার দিয়ে সূর্য অস্ত যায় সেই দ্বার তিনি বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর তিনি অমরত্ব লাভ করলেন। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত সে অমরত্ব।

 

আসলে অমরত্ব বলে এই জগতে কিছু নাই, কিছুই নাই। ‘কুল্লি মান আলাই-হা ফা’ন, ওয়া ইয়াবকা ওয়াজহু রাব্বিকা জুল জালিলি ওয়াল ইকরাম’-এই হলো সর্বশেষ। সেখানে অমরত্বের যে বাসনা ধন-সম্পদ-প্রভাব -প্রতিপত্তি ইত্যাদি দিয়ে যেসব মানুষের অন্তর ভারাক্রান্ত করে, তাঁদের আত্মা মরে যায়। সেসব মানুষই হয় অকৃতজ্ঞ ও জালিম।

 

শোপেনহাওয়ার তার প্রিয় কুকুরের নাম রেখেছিলেন আত্মা। মানুষজনের সঙ্গে  পছন্দ করতেন না। তেমন বন্ধু কেউ ছিল না, কাউকেই তিনি ভালোবাসতেন না। প্রিয় কুকুরের আচরণে বিরক্ত হলে তাকে ‘মানুষ’ বলে ডাকতেন।  ভদ্র কুকুরকে মানুষ বলে ডাকাই তো তার অপমান। ভালো কুকুরের আচরণ মানুষের চেয়ে ঢের ভালো।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here