কেমন আছেন? খুব সহজেই আমরা এই প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিই: ‘এই তো ভালো, মোটামুটি, খুব বেশি ভালো না, চলছে…’ ইত্যাদি। হয়ত জবাব দেয়ার একটু পরেই ভাবি, সত্যিই ভালো আছি তো? কিংবা কী নিয়ে খারাপ আছি? অনেক সময় এসব প্রশ্নের জবাব নিজের কাছেই দুর্বোধ্য লাগে। এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন কোনো কাজই করতে ইচ্ছে করে না। লেখা, পড়া, বেড়ানো, আলাপ সব নিরানন্দের মনে হয়। কিন্তু কেন? এক সময় নিরানন্দ ভাব, অস্বস্তি বাড়তে থাকে। হয়ত গভীর বিষণ্ণতা চেপে ধরে। শরীরের ওজন কমতে থাকে, খাবারে অরুচি দেখা দেয়, ঘুম অনিয়মিত হয়ে ওঠে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে। শরীর ও মনের ভেতর তৈরি হয় ভারসাম্যহীনতা। আসলে এই পরিস্থিতিই আমাদের সামনে নিয়ে আসে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার প্রসঙ্গ।
মানসিক স্বাস্থ্য কী?
সাধারণভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলার চোখে দেখার প্রবণতা আছে বাংলাদেশে। এক সময় তাবিজ, পানি পড়া, পীরের বাড়ি রেখে দেয়ার মাধ্যমে মানসিক রোগের চিকিৎসা চলত। এখনও মাঝে মাঝে খবরে দেখা যায়, পায়ে শেকল বা বেড়ি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীকে। অথচ চিকিৎসা ও কাউন্সেলিঙের মাধ্যমে হয়ত রোগ সারানো যেত।
মানসিক সুস্থতার জন্য তিনটি স্তরের ভারসাম্য খুব জরুরি। এক. আবেগিক স্তর, দুই. মনস্তাত্ত্বিক স্তর ও তিন. সামাজিক স্তর। কেউ কেউ আবেগ বা ইমোশনকে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারার দক্ষতা হারিয়ে ফেলেন কখনো কখনো। আবার মনস্তাত্ত্বিক স্তরে নানা ধরনের জটিল চিন্তা ও কল্পনার দ্বারা আচ্ছন্ন হন কেউ কেউ। আবার সামাজিক সত্তার অংশ হিসেবে কেউ কেউ নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন না; হয়ত কারো কাছে সমাজই হয়ে ওঠে ভয়ের প্রতীক। মার্কিন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান দা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ মনে করে, তিনটি স্তর মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও কর্মপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্য জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার ধারাবাহিকতা চলে শৈশব থেকে প্রৌঢ় কাল পর্যন্ত।
মেডিক্যাল নিউজ টুডে পত্রিকায় মানসিক স্বাস্থ্যকে বৌদ্ধিক, আচরণিক ও আবেগিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, ভালো মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে মন ও মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতার ওপর। ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ ভালো থাকার এমন একটি অবস্থা যখন একজন ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা ও দক্ষতা সম্পর্কে বুঝতে পারবে, জীবনের স্বাভাবিক চাপগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে, ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে পারবে এবং নিজের গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
প্রভাবশালী উপাদান
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানগুলো কী? এ বিষয়ে নানা ধরনের বক্তব্য ও গবেষণা রয়েছে। তবে তিনটি উৎসকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ বলে শনাক্ত করা হয়; যেমন : ক. জীবতাত্ত্বিক কারণ- মস্তিষ্ক বা জিনের রাসায়নিক গঠন খ. জীবনাভিজ্ঞতা- তীব্র যন্ত্রণাময় কোনো ঘটনা, অভিজ্ঞতা গ. পারিবারিকভাবে থাকা মানসিক সমস্যার ইতিহাস। আলাদা আলাদাভাবে বা সম্মিলিতভাবে মানুষের জীবনে উপাদানগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণ মানসিক ডিজঅর্ডার
শ্রেণি, বয়স, লিঙ্গ, পেশা নির্বিশেষে মানুষ সাধারণত যে ধরনের মানসিক ডিজঅর্ডারের মুখোমুখি হয় সেগুলো হলো : দুঃশ্চিন্তা বা অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, ভাব বা মুড ডিজঅর্ডার ও সিজোফ্রেনিয়া ডিজঅর্ডার। আমেরিকায় ডিপ্রেশন ও অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বিষয়ক সংস্থা রয়েছে।
অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার
অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার দেখা দিলে মানুষ কোনো বিষয় বা বস্তু বা ঘটনাকে প্রবলভাবে ভয় পেতে থাকে। এর আবার সাধারণ রূপ থেকে মারাত্মক রূপ দেখা যায়। সাধারণত ডিজঅর্ডারের লক্ষণ : অস্থিরতা, মাংসপেশি শক্ত হয়ে আসা, ঘুমের ব্যাঘাত ইত্যাদি। আবার হঠাৎ করেই দেখা দিতে পারে প্যানিক ডিজঅর্ডার। তাড়া করে ফিরতে পারে মৃত্যুভয় ও আতঙ্ক। অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ফোবিয়া। কোনো কিছু নিয়ে মারাত্মক ভয় ও আতঙ্ক। ফোবিয়ার বিষয়টি খুবই ব্যক্তিক। অনেক রকম ফোবিয়ায় মানুষ ভোগে। মাকড়সা, তেলাপোকা, টিকটিকি দেখে ভয় পাওয়া সাধারণ ফোবিয়ার অন্তর্গত। কিন্তু কেউ কেউ চলন্ত ট্রেন দেখেও ভয় পায়। কারো কারো আছে সামাজিক ফোবিয়া। লোকজন, জনসমাগম, ভিড় দেখলে ভয় পান।
মুড ডিজঅর্ডার
খুব পরিচিত একটি সমস্যা মুড ডিজঅর্ডার। একে ডিপ্রেসিভ বা বিষণ্ণতাজনিত সংকট হিসেবেও দেখা হয়। মুড ডিজঅর্ডার দেখা দিলে ব্যক্তির আবেগ ও অনুভূতির অতিরিক্ত প্রকাশ যেমন দেখা দেয়, আবার তার উল্টো রূপও দেখা যায়। দৈনন্দিন জীবন ও কাজে মুড ডিজঅর্ডার ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর থেকে সৃষ্টি হতে পারে উঁচু মাত্রার বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন। আবার প্রকৃতি প্রভাব ফেলে মানুষের মুডের ওপর। যেমন : বৃষ্টি, বর্ষাকাল, শীতের শুরু মানুষকে সাময়িকভাবে বিষণ্ণ করে তুলতে পারে।
সিজোফ্রেনিয়া ডিজঅর্ডার
মানসিক সংকটের তীব্র রূপ হিসেবে সিজোফ্রেনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এর কারণ নিয়ে মনোবিদগণ এখনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন নি। সিজোফ্রেনিয়াকে তারা দুটি দিক থেকে ভাবেন। হতে পারে এটি একক কোনো মানসিক সংকটজাত সমস্যা। অথবা অনেকগুলো মানসিক সমস্যার সমষ্টি। সাধারণত ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়ার প্রাদুর্ভাব হয় বলে বলে মনে করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ। সিজোফ্রেনিয়ার দেখা দিলে মানুষ অযৌক্তিক চিন্তা করে, বিভিন্ন ঘটনা প্রত্যক্ষ করে যা আদতে ঘটছে না। বিভিন্ন ঘটনা, ব্যক্তি ও বস্তুর সাক্ষাৎ পায় বলে দাবি করে, অথচ যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ কেবল মনের সূত্রেই প্রকাশিত হয় না, শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যাও তৈরি হয়। মেডিক্যাল নিউজ টুডে কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্ভাব্য কিছু উপসর্গের তালিকা উপস্থাপন করেছে। যেমন :
- বন্ধু, পরিবার, পরিজন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া।
- স্বাভাবিক আনন্দদায়কগুলোকে পরিহার করা।
- অনেক বেশি ঘুমানো অথবা অনেক কম ঘুমানো।
- অনেক বেশি খাওয়া অথবা কম খাওয়া।
- হতাশা অনুভব করা।
- শারীরিকভাবে বল বা শক্তি না পাওয়ার অনুভূতি তৈরি হওয়া।
- মুড বা ভাব পরিবর্তনের জন্য নিকোটিন বা অ্যালকোহল জাতীয় বস্তু গ্রহণ।
- নেতিবাচক অনুভূতি প্রদর্শন।
- দ্বিধাবোধ করা।
- দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করতে না পারা; যেমন : অফিসের কাজ বা রান্না করা ইত্যাদি।
- একই চিন্তা ও স্মৃতির পুনরাবৃত্তি।
- শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা করা।
- বিভিন্ন কণ্ঠস্বর বা শব্দ শোনা।
- ঘোর, তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব অনুভব করা।
সমাধান
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে সমাধানের উপায় একটি বা দুটি মাত্র নয়। একই পদ্ধতি সবার ওপর সমানভাবে কাজ করে না। তবে সমাধানের প্রথম স্তর হলো: সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে বুঝতে পারা, শনাক্ত করতে পারা। মনে রাখতে হবে, ‘মানসিক সমস্যা’ কোনো একক অসুখ নয়, শরীরের অসুখের বিভিন্নতার মতো মনেরও বিভিন্নরকম অসুখ হতে পারে। তাই সবার আগে জানতে হবে অসুখটা আসলে কী? মনোচিকিৎসক, মনোবিদ সংকটগুলোর উৎস, কারণ ও চিকিৎসা-পদ্ধতি নির্ধারণ করে থাকেন। তাই মানসিক সমস্যার উপসর্গ প্রকাশ পেলে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে। চিকিৎসক রোগের ধরন অনুযায়ী, ঔষধ কিংবা সাইকোথেরাপি দেবেন। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে জড়তার কিছু নেই। অন্য সব অসুখের মতো মনেরও অসুখ হয়। এই সত্য মনে রাখাটা জরুরি।
সাইকোথেরাপি
কথা বলার সমস্যাগুলোকে যৌক্তিকভাবে চিহ্নিত করতে ও ভাবতে সহায়তা করে সাইকো থেরাপি। চিন্তা-প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যপূর্ণ পন্থার দিকে নিয়ে যান থেরাপিস্ট।
আত্ম-উদ্যম
মানসিক সংকট থেকে উত্তরণের বড় একটি উপায় আত্ম-উদ্যম। সমস্যার কারণগুলো শনাক্ত করা, বাস্তব ও যৌক্তিক সমাধান খোঁজা, বিক্ষিপ্ত মনকে কেন্দ্রীভূত করা। এজন্য দৈনন্দিন জীবনে অভ্যাসগত পরিবর্তন আনা জরুরি। নির্দিষ্ট রুটিন মানা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, সুষম খাদ্য গ্রহণ, মেডিটেশন ও রিলাকজেশনের বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করা, বন্ধু-পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক অস্থিতিশীলতাকে স্থিতাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করেন মনোচিকিৎসক ও থেরাপিস্টরা।
* লেখাটি তৈরি করা হয়েছে মেডিক্যাল নিউজ টুডে ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবপেইজে প্রকাশিত ও পরিবেশিত বিভিন্ন লেখার সহায়তায়।