“১৯৭১ আজ শেষ হয়ে গেল, জানি না, আগামী কালের দিন কিভাবে শুরু হবে”, ব্যক্তিগত ডায়েরিতে কথাগুলো লিখেছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল, তারিখটি ছিল ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ১৯৮৯ সালে সুফিয়া কামালের ১৯৭১ সালে লেখা এই ব্যক্তিগত ডায়েরিটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল একাত্তরের ডায়েরি শিরোনামে। লেখার শুরুতে উল্লেখিত অংশটির মাধ্যমেই এই গ্রন্থটি শেষ হয়েছে। ঠিক কী ভেবে লেখক এই কথাগুলোর মাধ্যমে নিজের লেখা ডায়েরিতে ১৯৭১ সালের আলোচনা শেষ করেছিলেন তা হয়তো সঠিকভাবে জানার সুযোগ খুব একটা নেই। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ লেখকের এই উক্তিকে এক ধরনের স্বতঃসিদ্ধে পরিণত করেছিল নিঃসন্দেহেই।
একটু সময় নিয়ে চিন্তা করলেই দেখা যায় যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীদের নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন ডিসকোর্স প্রচলিত নেই, পাকিস্তানি বাহিনীর ধর্ষণ ও পরবর্তী সময়ে নির্যাতিত নারীদের সমাজে গ্রহণ না করার আলোচনা ছাড়া। ইতিহাসের ইংরেজি হিস্টোরিকে যেমন হিজ স্টোরি হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতা নারীবাদী ডিসকোর্সে কিংবা অন্তত জেন্ডার স্টাডিজের আলোচনায় প্রায়শই দেখা যায়, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও যেন সেই আলোচনার একটি আদর্শ টেস্ট কেইস।
কিন্তু লৈঙ্গিক রাজনীতি বাদ দিলেও যে কোন ঘটনারই নারীবাদী কিংবা নারীকেন্দ্রিক ডিসকোর্স নিয়ে আলাদা আলোচনা থাকা জরুরি। কারণ মানবীয় যোগাযোগ সম্পর্কিত তাত্ত্বিক আলোচনায় এমন কিছু তত্ত্ব রয়েছে যেখানে দাবিই করা হয়ে থাকে যে, নারী ও পুরুষের ভাষা, মনস্তাত্ত্বিক নির্মিতি ও আচরণগত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ডেবোরাহ ট্যানেনের জেন্ডারলেক্ট স্টাইল তত্ত্ব আমাদের অন্তত তাই বলে। অপরদিকে স্ট্যান্ডপয়েন্ট তত্ত্ব আমাদেরকে বলতে চাচ্ছে সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সামাজিক কাঠামোতে যাদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক বা নিচে, তাদের থেকে তথ্য অনুসন্ধান করা হলে অপেক্ষাকৃত কম পক্ষপাতমূলক ও নির্মোহ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
এসব কারণেই এই পুরুষতান্ত্রিক বিশ্ব বা মানব সমাজে নারীবাদী আঙ্গিক থেকে যে কোন ঘটনা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা বা নারীর দৃষ্টি থেকে দেখার চেষ্টা করা হলে একেবারে ভিন্ন কিছু বিষয় নজরে আসার সম্ভাবনা থাকে, যেসব বিষয় পুরো ঘটনাটিকে আরও বেশি বৈচিত্র্যময় হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। এই যেমন অধ্যাপক আফসান চৌধুরীর সম্পাদনায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত গ্রামের একাত্তর শীর্ষক বইতে মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদেরকে পুরুষদের চেয়ে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের সাহায্যে আফসান চৌধুরী দেখিয়েছেন যে, আক্রান্ত দেশের জনগণ হিসেবে পুরুষরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন নারীরাও সেসব জটিলতার সম্মুখীন তো হয়েছিলেনই, সাথে নারীদের সামাজিক অবস্থানের জন্যে কোন কোন ক্ষেত্রে অধিক ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছেন।

যুদ্ধের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধিজনিত সমস্যা ও খাদ্যসঙ্কট ছিল। আবার সেই সময়ের সমাজে, বিশেষত গ্রামের দিকে পরিবারের পুরুষদের খাওয়া হয়ে গেলেই নারীরা খেতে বসতেন। এই কারণে খাদ্যের নানামুখী সঙ্কটের ফলে অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাস্থ্যগত ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন গ্রামের নারীরাই। আর এই তথ্যটি আমাদের কাছে পৌঁছাতে সময় লেগে গিয়েছে ৪৮ বছর। অথচ এই তথ্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাধারণ মানুষের ত্যাগ স্বীকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নমুনা হয়ে থাকার কথা। এসব কারণেই যে কোন সামাজিক ঘটনারই নারীকেন্দ্রিক ডিসকোর্সের উপস্থিতি ঐ সমাজের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই কারণেই মূলত ব্যক্তিগত ডায়েরি হওয়ার পরও বেগম সুফিয়া কামালের একাত্তরের ডায়েরি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এর মাধ্যমে আমরা বুঝে নিতে পারি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়, সমাজ বাস্তবতা ও সেই সময়ের মনস্তত্ত্ব।
সুফিয়া কামালের বইটির নাম একাত্তরের ডায়েরি হলেও তিনি ডায়েরিটি লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে। ফলে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ও সাধারণ নির্বাচনপরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময়গুলো এই ডায়েরির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে।
বেগম সুফিয়া কামাল চল্লিশের দশকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। দেশবিভাগের পর চলে আসেন এপাড় বাংলায়। কিন্তু পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে কোন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে সোচ্চার থেকেছেন বেগম সুফিয়া কামাল; বিভিন্ন ইস্যুতে নারীদের সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তিনি থেকেছেন সদাসম্পৃক্ত। তাঁর কর্মজীবন ও তৎপরতা সম্পর্কে ধারণা না থাকলে যে কারও এই ডায়েরির প্রথম কিছু অংশ পড়ে মনে হতে পারে সুফিয়া কামালের পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে তিনি পাকিস্তানকে সফল করতে যারা কাজ করছে তাদের প্রতি ইতিবাচক কথা লিখেছেন তাঁর ডায়েরিতে, উল্লেখ করছেন কায়েদে আযমের মাজার ঘুরে আসার কথাও। তবে সুফিয়া কামালের কর্মজীবন সম্পর্কে ধারণা থাকলে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে তাঁর এসব কর্মকাণ্ড মূলত ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে তাঁর নিরন্তর সমর্থনের এক প্রকার বহিঃপ্রকাশ।
তাঁর এই ভ্রমণের সময় তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালিদের প্রাধ্যন্য বৃদ্ধিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অন্তর্দাহের কথাও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে তিনি উর্দু ভাষায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, বক্তৃতা করেছেন। এসময় উর্দু ভাষায় কথা বলতে পারাকে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিপরীতে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সুফিয়া কামালের এসব পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার প্রকৃতি থেকে মূলত তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, আবার বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করার একটি পৃথক আঙ্গিক সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়, ঠিক যেমনটা বলা হয় নারীদের চিন্তার আলাদা প্রকৃতি সম্পর্কে জেন্ডারলেক্ট স্টাইল-এ।
ডায়েরির প্রথম দিকে যদি কোন পাঠকের মনেও হয় বেগম সুফিয়া কামাল পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল, তাহলে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের রোজনামচা পড়ে সেই পাঠকের ভুল তার নিজের কাছেই ধরা পড়বে। মার্চ’৭১ মাসের অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আশুরার প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা পালনের প্রসঙ্গে সুফিয়া কামাল ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে দেশে সারা বছরই শহীদ দিবস সেখানে আলাদা শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতার কোন প্রয়োজনীয়তা থাকে না। বাঙালিদের ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি পাকিস্তানি শোষকদের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে এ যেন এক শক্তিশালী বিবৃতি!
সুফিয়া কামালের এই ডায়েরিতে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের অসহযোগ আন্দোলনকে বিভিন্নভাবে সংগঠিত করার পাশাপাশি তিনি পুরো পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন গভীরভাবে। এজন্যেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে ঐ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের মতামতের চাপে এক প্রকার ‘বন্দি’ হয়ে পড়েছিলেন। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরের প্রাক্কালে এসে আমরা জানি সে সময় তরুণ ছাত্রনেতাদের এক ধরনের সার্বক্ষণিক চাপ বঙ্গবন্ধুকে সামাল দিতে হচ্ছিলো।
এই ডায়েরিতে বেগম সুফিয়া কামাল খুব সহজভাবে এমন কিছু বিষয় লিখে রেখেছেন যেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার অবকাশ থেকে যায়। অখণ্ড পাকিস্তানের সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামরিক দমনপীড়ণ ও বাঙালিদের উপর নিত্য গুলি চালানোর ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বারবার পাকিস্তান আন্দোলন ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিচালিত অপারেশন সার্চলাইট, গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারত সরকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে যেসব বিবৃতি দিয়েছিল সেসব বিবৃতি নিঃসন্দেহেই বাঙালিদের ভেতর সাহস সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সুফিয়া কামাল এসব বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছিলেন এসব বিবৃতিতে যা বলা হচ্ছে সেসব সহায়তা ও সমর্থনের প্রকৃত কার্যকরণ কবে হবে তাই আসলে দেখার বিষয়।
ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে যখন ঢাকায় ভারতীয় বিমানবাহিনী আক্রমণ শুরু করলো তার প্রচলিত ইতিহাস পাঠে আমরা এই বিমান অভিযানকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এক দারুণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু সুফিয়া কামাল এই সময়কে নির্দেশ করে তাঁর ডায়েরিতে একদিকে যেমন একে বাঙালিদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান বলছেন, বাস্তবতার অপর দিকে হিসেবে এই বিমান আক্রমনের ফলে নতুন করে জনমনে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করতেও ভুলে যান নি। এভাবে পুরো ডায়েরির বিভিন্ন অংশে তথা সুফিয়া কামালে চিন্তায় পাকিস্তানের দুই অংশের বিভিন্ন বাস্তবতা ও মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিশ্লেষণে সংক্ষিপ্ত পরিসরে এক ধরনের দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের স্বাদ পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালে ৬০ বছর বয়সী সুফিয়া কামালের যে সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল, তার কারণে তিনি খুব সহজেই পাকিস্তান ও পাকিস্তানপন্থিদের রোষানলে পড়েছিলেন। আবার তাঁর গুরুত্বের কারণেই হয়তো তাঁর মৃত্যুর ভুল সংবাদ ভারতীয় গণমাধমে প্রকাশিত হওয়ার পর পাকিস্তানি গণমাধ্যমে তাঁর বেঁচে থাকার সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ডায়েরি থেকে ঐ সময়ে তাঁর নিঃসঙ্গতার কথা খুব সহজেই পাঠক অনুধাবন করতে পারবেন। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোনভাবে তিনি তাঁর একাকীত্বের কথা লিখেছেন, তাঁর একাকীত্বকে ভালো না লাগার কথাও তা থেকে বুঝতে পারা যায়। কিন্তু তারপরও তিনি একবারও তাঁর পরিচিতিদের দোষারোপ বা নিদেনপক্ষে কোন অভিমানও প্রকাশ করেন নি। বরং তিনি মনে করেছেন তাঁর নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবেই পরিচিতিজনেরা তাঁর কাছে আসছে না। এক্ষেত্রে এই কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন যে ক্র্যাক প্লাটুনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক গেরিলা যোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক, পরিচয় ও পারস্পরিক তৎপরতা ছিল। আর এ কারণেই ডায়েরির পাতায় পাতায় তিনি তাঁদের কথা উল্লেখ করেছেন।
আগস্ট’৭১ মাসের শেষ দিকে আলতাফ মাহমুদ, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বড় ছেলে রুমিসহ আরও অনেক গেরিলা যোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর প্রায় নিয়মিতভাবেই তিনি তাঁর ডায়েরিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই মানুষদের মঙ্গল কামনা করেছেন কিংবা তাঁদের খোঁজ না পাওয়ায় নিজের হতাশা ও দুঃখ ব্যক্ত করেছেন। আবার তিনি এই অস্বাভাবিক সময়ে স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাতেও দুঃখ পেয়েছেন, আনন্দ লাভ করেছেন অবলা পশুর মা হওয়া উপলক্ষ্যে।
সুফিয়া কামালের ডায়েরির প্রতিটি পৃষ্ঠায় একজন মাকে খুঁজে পাওয়া যাবে খুব সহজেই। একজন মা যিনি যে কোন পরিস্থিতির জন্যে সদা প্রস্তুত। একজন মা, যিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণ করে সবার কল্যাণের প্রার্থনার কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন নিয়মিত। তাঁর ডায়েরির পাতায় পাতায় সৃষ্টিকর্তার সাথে এক ধরনের কথোপকথনের স্বাদ পাওয়া যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর লাগাতার হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতনের বিপরীতে সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে তাঁর লেখায় অনেক সময় সৃষ্টিকর্তার প্রতি এক ধরনের অভিমানের সুরও লক্ষ্য করা যায়। ঠিক যেন একজন মা তাঁর সন্তানদের নিরাপত্তা চেয়ে চেয়ে শেষ পর্যন্ত অভিমান ও হতাশার সুরেই ভরসা রাখা যায় এমন কারও কাছে নিজেকে আবারও সঁপে দিচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চাইলেই সুফিয়া কামাল অবরুদ্ধ ঢাকা শহর কিংবা দখলকৃত বাংলাদেশ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। বরং এই নিদারুণ বিপজ্জনক সময়ে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে মিথ্যা বিবৃতি দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এসময় রুশ বিপ্লবের বার্ষিকীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নিয়েছেন। ডায়েরির পাতায় পাতায় তিনি লিখেছেন মৃত্যুকে তাঁর ভয় না পাওয়ার কথা। তিনি শুধু অপমানিত হতে চান নি, তাঁর বিশ্বাস ছিল জীবনের চেয়ে আত্মসম্মানের মূল্য অনেক বেশি।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সাথে সাথেই সুফিয়া কামাল আবারও রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন স্বাধীন দেশের পক্ষে কাজ করার জন্যে। এসময় তিনি যেমন আওয়ামী লীগের আয়োজনে অংশ নিয়েছেন আবার তাঁকে দেখা গিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও যোগাযোগ রাখতে। সুফিয়া কামালের ডায়েরি পাঠককে তাঁর দর্শন বুঝতে সাহায্য করে। মূলত দেশ ও মানুষের কল্যাণ, নারীদের অধিকার সচেতন করে তোলার সকল পথই মিশেছে সুফিয়া কামালের পথের সাথে। এজন্যের দেশ ও মানুষের পক্ষের সকল তৎপরতায় তাঁকে দেখা গিয়েছে; শারীরিকভাবে, তা সম্ভব না হলে মানসিকভাবে।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪৯ বছর পেড়িয়ে এসেও আমাদের এখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক করতে হয়। একাত্তরের শত্রুদের আস্ফালনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ তথা আপামর জনসাধারণকে অনেক সময় পিছুও হটতে হয়। ঠিক যেমন বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছিলেন তাঁর ডায়েরিতে :
এখন গোপন শত্রুর দল হানা দিয়ে বারে বারে
পরাজিত-বিদ্বেষে
রক্তের স্রোত বহাইতে চাহে সোনার বাংলাদেশে।
তাই বাংলাদেশের ইতিহাসকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে কিংবা বাংলাদেশকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে হলে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সমসাময়িক সময়ে, সকল ক্ষেত্রেই পুরুষতান্ত্রিক ভাবধারা থেকে বেরিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীর চোখ দিয়েও দেখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ডিসকোর্সের সাথে সাথে নারীর চোখে, নারীর চিন্তায়, নারীর ব্যাখ্যায় মুক্তিযুদ্ধকে দেখে, ভেবে ও বুঝে নিতে পারলেই মুক্তিযুদ্ধ কিংবা আমাদের ইতিহাসের সার্বিক চিত্রপট স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা সম্ভব হতে পারে, নাহলে আংশিক চিত্র দিয়ে জাতীয় জীবনের আংশিক লক্ষ্যই পূরণ করা যাবে মাত্র।






































