একাত্তরের স্মৃতি বইটি শুধু একজন নারীর মৃন্ময় স্মৃতির ফলকই নয়, একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত থেকে শুরু করে বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের একটি উৎকৃষ্ট দলিল। বাসন্তী গুহঠাকুরতার জীবনসঙ্গী বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হন, এবং ৩০ মার্চ মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাস্ত হন। না, মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি পরাস্ত হননি, অমর হয়েছেন। বাংলাদেশের বিস্তৃত শস্যক্ষেত্রে, উদার আকাশের নীলে তিনি আছেন। পদ্মার ঢেউ থেকে সুবিশাল সমুদ্র তাঁর সেদিনের রক্তের ফেনিল উচ্ছ্বাসে আজো উদ্বেলিত। বাসন্তী গুহঠাকুরতা সেই মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন;
কেমন করে ২৯-এর রাত শেষ হয়ে ৩০ মার্চের সূর্য উঠলো? রাতে বৃষ্টি হয়েছে, অনেক আগুন নিভে গেছে শহরে। লাল সূর্যের প্রভাতী আলো কালো পিচের বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় চকচক করছে। আমি ডায়েরিতে লিখলাম, “একটি সূর্য উঠেছে, আরেকটি নিবছে।
একজন মানবতাবাদীর মৃত্যু হলো বলে যে ব্যক্তিগত শোক তিনি প্রকাশ করেছেন, তা শুধু ব্যক্তির নয়, তা সমস্ত জাতির নিরুদ্ধ অন্তরের পুঞ্জীভূত শোক। বাসন্তী গুহঠাকুরতা নিজেও ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, এবং শিক্ষক। তার রচনার পরিশীলিত আখ্যান কোন বিলাপ নয়, শোকগ্রস্তের প্রলাপও নয়; একজন সচেতন ও সংবেদনশীল নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা। তিনি যা দেখেছেন তা-ই লিখেছেন। তিনি লিখেছেন ২৫ মার্চের কালরাতের ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে কী করে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বাইরে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং কিছুক্ষণের মধ্যে বন্দুকের বিকট শব্দে ৩৪-নম্বর কোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের দেয়ালের পাশে ঘাসের উপর রক্তাক্ত অবস্থায় ড. জ্যোতির্ময়কে আবিষ্কার করেন তারা। ড. জ্যোতির্ময় মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন,
এখন আর কি, লিখতে শুরু করো।
কী লিখবো?
ইতিহাস, ইতিহাস, এইসব।
বাসন্তী গুহঠাকুরতা ইতিহাস লিখতে অপারগ তা জানালে, মৃত্যু শয্যায় ড. জ্যোতির্ময় বলেন, “তবে সাহিত্য, সাহিত্যই লেখো।” যেই অঙ্গীকারের রেশ ধরে বাসন্তী গুহঠাকুরতা প্রায় ১৮ বছর পর একাত্তরের স্মৃতি গ্রন্থটি লিখেছেন। জ্যোতির্ময় সেদিনই জানতেন, এই মৃত্যু, এই ত্যাগ, মুক্তির এই যুদ্ধযজ্ঞে এই রক্তের তর্পণ একদিন ইতিহাস হবে। সেই ইতিহাসে তাঁরও একটা ভূমিকা থাকবে তিনি তা জানতেন, জানতেন বলেই স্ত্রীকে কাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, ইতিহাস লেখো। যদি তা সম্ভব না হয় তবে সাহিত্যই লেখো। বাসন্তী গুহঠাকুরতা ইতিহাসই লিখেছেন তবে তা যে সাহিত্যও তা বলাবাহুল্য।
৩০ মার্চ সকালে ড. জ্যোতির্ময়ের মৃত্যু হলো কিন্তু তাঁর লাশটি মিলিটারি তৎপরতার কারণে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিতে পারলেন না। কন্যা দোলাকে নিয়ে এর কাছে ওর কাছে ছুটেছেন তিনি পরবর্তীকালে, কিন্তু সেদিন ছোটার শক্তিটুকুও ছিলো না, আর থাকবে কি করে, ২৬ মার্চ সকাল থেকে তিনি কিছু মুখে তুললে তো? খাবার কই? আর খাবার সময়ই কই? ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ডে ড. মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাঁর স্ত্রী কন্যারা কিছুক্ষণ কঁকিয়ে শান্ত হয়ে গেলেন, যা অবলীলায় বর্ণনা করছেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা। কিন্তু কাছে গিয়ে যে সেদিন সান্ত্বনা দিবেন এহেন পরিস্থিতি ছিল না। রাস্তাটুকু পার হয়ে ওপারে যাওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে গিয়েছিল, কেননা কেউ এমন একটা রাতের কথা কখনো ভেবেছে, না কল্পনা করেছে!

অন্যের দুঃখ তিনি দেখেছেন, স্বভাব-মমত্ব নিয়েও তার কাছে যেতে পারেননি, নিজেই যে অকুল সমুদ্রে ভাসছেন। সমুদ্রে পথ হারালে তাও মৃত্যুর নিশ্চয়তা থাকে, কিন্তু নিরন্তর জীবন মৃত্যুর দ্বিধায় পড়ে বাঁচা অসহ্য, সেই অসহনীয় জীবনকে তিনি যাপন করেছেন। মূলত এই ছিল আপামর জনতার ভবিতব্য। মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়িয়েছে। ড. গুহঠাকুরতার পরিবার ছিল হায়ার মিডল ক্লাস, তথা উচ্চ মধ্যবিত্ত, যা তদের জীবনাচারে স্পষ্ট; এঁদের মতো পরিবারেরই যদি এই দশা হয়, তবে সাধারণের জীবনের গ্লানির চিত্রটা ঠিক কেমন হবে তা পাঠক আন্দাজ করতে পারবেন।
একাত্তরের স্মৃতিতে বাসন্তী গুহঠাকুরতাও কিছু তার বর্ণনা করেছেন। ড্রাইভার গোপালের ঢাকা থাকা নিয়ে গুহঠাকুরতার উদ্বেগে তা স্পষ্ট। এই বিপর্যয়ে গুহঠাকুরতা পরিবারের প্রথম আশ্রয়দাতা ডাক্তার আহমেদ যখন লাইসেন্সবিহীন গোপালকে গাড়ির চালক হিসেবে নিযুক্ত করে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত চলে যান, বাসন্তী গুহঠাকুরতার দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না, যদি মিলিটারিরা রাস্তায় গাড়ি আটকায়? চেক করে গোপালকে? নির্ঘাত মারা পড়বে। বরং গোপাল গ্রামে চলে যাক। গ্রামের মানুষ যে শান্তিতে আছে এমনও তো নয়। ঘর-সংসারের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন গুহঠাকুরতা, তা তার নিত্য দিনের সাংসারিক অভিজ্ঞতার কারণেই পেরেছেন।
একাত্তরে মার্চ অবব্যহিত সময়টাতে, আশ্রয়টা ছিল মানুষের প্রথম দাবী। অতঃপর খাওয়া পরার সমস্যা মৌলিক। এটা মিটে গেলে আর কিছু কেউ চাইতো না। শহরের মানুষ মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। গ্রামের মানুষও তাই। খাদ্য সংকট নিয়ে বলতে গিয়ে গুহঠাকুরতা বলছেন :
মে মাস খুব গরম, কখনো সখনো বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরম কমছে না। তরিতরকারিও বাজারে আসে না। মাছ বিশেষ করে নদীর মাছ তো কেউ কেনে না। খায়ও না। মাছের পেটে মানুষের গোস্ত।
ভয়ঙ্কর চিত্র। একাত্তরের ভয়াবহতা নিয়ে সমাজে অনেক কল্প-কাহিনিও প্রচলিত আছে, কিন্তু না, এটা কোন কল্পকাহিনি নয়, এটা কোন কবির মিথকথনও নয়, এটা বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরী, ইছামতীর চিত্র। এটাই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার চিত্র।
পাকিস্তানী নীলনকশার একটা প্রধান এজেন্ডা ছিলো বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। যা তারা করেছে ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১৪ ডিসেম্বর, এমনকি ১৫-১৬ বিজয়ের দিনেও। ড. মনিরুজ্জামান, ড. গোবিন্দ দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাসহ আরো অনেকেই ২৫ মার্চ রাতের অপারেশনে নিহত হন। এছাড়া বিজয়ের অবব্যহিত পূর্বে মুনীর চৌধুরীকে হাত বেঁধে মাটি মাখা মিলিটারি গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে সেই দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ানে বর্ণনা করেছেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা। যখন মুনীর চৌধুরী গাড়িতে উঠতে চাইছিলেন না, বন্দুকের নল তাঁর পিঠে ঠেকিয়ে জবরদস্তি গাড়িতে তোলা হয়েছিলো, সেই দৃশ্য ভোলার নয়।
মুনীর চৌধুরী আর ফিরে আসেননি। মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে ১৪ ডিসেম্বর একই দিনে একই গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে, তিনিও আর ফিরে আসেননি। ফিরে আসেননি বাংলার ছাত্র আনোয়ার পাশা এবং তাঁর বন্ধু ইংরেজির ছাত্র রাশীদুল হাসান। ইতিহাসের বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ইতিহাসের গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, ড. আবুল খায়ের, এমনকি ডাক্তার মূর্তজা কেউই ফিরে আসেননি। বাসন্তী গুহঠাকুরতার বর্ণনায় দেখা যায়, স্বাধীনতার পর নিখোঁজদের স্বজনেরা তাঁদের স্ব স্ব স্বজনের লাশ খুঁজে ফিরছেন। লাশ শব্দটা ভয়ঙ্কর। “ডাক্তার মূর্তজার স্ত্রী পলা আজো লাশ শব্দটা শুনলে শিউরে ওঠে, বুকে হাত দেয়।” ইনিই সেই ডাক্তার, যার বাসায় মে মাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন মিসেস গুহঠাকুরতা। বড় কাছে থেকে দেখেছেন তিনি কাছের মানুষের মৃত্যু। এইসব মৃত্যু নিয়ে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী মহল তো উচ্চবাচ্য করেন-ই-নি, বরং দালালি করেছেন পাকিস্তানীদের। বাসন্তী গুহঠাকুরতার বর্ণনায় :
…কাজী দীন মুহম্মদ সাহেবকে দেখে তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। তিনি হলেন সেই ছয়জনের একজন, যাঁদের পাকিস্তান সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য দেশ বিদেশে পাঠানো হয়েছিলো। (তাঁরা হলেন, ড. সাজ্জাত হোসেন, কাজী দীন মুহম্মদ, ড. মোহর আলী, রাজিয়া ফয়েজ, ড. ফাতিমা সাদেক, এবং মাহমুদ আলী)। একজন বাদে পাঁচজনই শিক্ষাবিদ।
এরাই মিথ্যাচার করে এসেছেন দেশে বিদেশে। এঁদের মিথ্যাচারের নমুনা দুটি বাক্যেই স্পষ্ট। মিসেস গুহঠাকুরতা যখন কাজী দীন মুহম্মদ সাহেবকে প্রশ্ন করলেন, “আপনারা কেন বললেন, ড. গোবিন্দ দেব আর ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা cross firing-এ মারা গেছেন? জগন্নাথ হলে যুদ্ধ হয়েছে।” পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে ক্রস ফায়ারের নাটক সাজিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা শাসকবর্গের চিরকালের নীতি। সেদিনও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।
সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের যে চিত্র একাত্তরের স্মৃতিতে দেখা মেলে, এর লেখক, (ব্যক্তিগত বিশ্বাস যাই হোক না কেন) সেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে ভিতর থেকে দেখেছেন। না, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে হত্যা করা হয়েছে শুধু এজন্য নয় যে তিনি হিন্দু, সেদিন তো মনিরুজ্জামানকেও হত্যা করা হয়েছিলো, বাংলাদেশিদের বুদ্ধিশূন্য করাই ছিলো যার টার্গেট। কিন্তু গোপালের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন যে পালিয়ে বেড়িয়েছে তার চিত্র পরতে পরতে অংকন করে গেছেন গুহঠাকুরতা।
সাধনা ঔষধালয়ের মালিক প্রবীণ যোগেশ চন্দ্র ঘোষকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। “২৭ শে রাতে লোহারপুলে এগারজনকে ব্রাশফায়ারে মেরেছে। তাই গেন্ডারিয়ার হিন্দুরা বেশি আতঙ্কিত, দিশেহারা হয়ে অন্যের আশ্রয়ের আশায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেরাচ্ছিলো।” বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে জুতা সেলাই করা মুচি পর্যন্ত, রেহাই ছিলো না কারো। বাসন্তী গুহঠাকুরতা Holy Family Hospital-এ নিজের নাম পরিবর্তন করে স্বাক্ষর করেছেন, বাসন্তী গুহঠাকুরতা, ইংরেজিতে সিগনেচার করতেন B G নামে, দেখলেন B G-তে হয় ‘বারবারা গমেজ’। এই নামেই হলি ফ্যামেলি হাসপাতালে আত্মগোপন করেন গুহঠাকুরতা। কন্যা দোলাকে সিস্টার সারার অরফানেজ Bottomley Home-এ রেখে আসেন। দোলার নাম রাখা হয়, Monica Rossario। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দেখলেন সেখানে আরো অসংখ্য হিন্দু আছেন, এরা আত্মগোপনেই আছেন। গোপালের গাড়ি চালানো এবং ডাক্তার আহমেদকে নিয়ে দাউদকান্দি-কুমিল্লা-চৌদ্দগ্রাম যাত্রার একটা নাটকীয় বর্ণনা দিয়েছেন গুহঠাকুরতা;
…আমি গাড়ি থামাইয়া দিলাম। আমারে নাম জিগাইলো, আমি ফট কইরা কইলাম ‘হাবিব’। একটা মিলিটারি এমন জোরে কইলো ‘হাবিব’? আমার তো পিলা চমকাইয়া গেলো। আমার পাশের লোকেরে নাম জিগাইলো, ও তো নাম ভুইল্যা গেছে। বলে, ‘হাম কম্পাউন্ডার হ্যায়।’ ‘কিয়া? কিসকা কমান্ডার হ্যায়?’ তখন আমি কইলাম, ‘ও ডাক্তার সাবকা দাওয়াই বানাতা হ্যায়। কম্পাউন্ডার, কমান্ডার নেই হ্যায়।’ তখন জিগায়, ‘তোমারা লাইসেন্স কাহা?’ ‘ভুল গিয়া। ঢাকামে রতা হ্যায়।’ তখন ধাক্কা দিয়া কয়, ‘তোমকো সামনেমে গুলি করেগা’।
টানা ন’মাস যুদ্ধ চলার পর, ১১ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর রকেটবৃষ্টিতে পর্যুদস্ত পাকিস্তানী সৈন্যদের অসহায় অবস্থায় দেখে বাসন্তী গুহঠাকুরতার মনে হয়েছিলো Macbeth নাটকের কথা, সৈন্যদের ক্যামোপ্লাজ করা পোশাকে মাথা নিচু করে এগিয়ে আসাকে মনে হয়েছিলো নাটকের সেই ‘শেরউড’ বনের কথা। কিন্তু নাটকে শেরউড বন এগিয়ে এসেছিলো আর পতন হয়েছিলো ম্যাকবেথের, এখানে, উল্টোটা, মুক্তিসংগ্রামের নায়কেরাই টিকেছিলো, আর পাকিস্তানী শেরউড যেই পাহাড় বেয়ে এসেছিলো সেই পাহাড়ের চূড়া থেকেই নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো ইতিহাসের নিম্নতর গহ্বরে। ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলো বাংলাদেশের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
স্বাধীনতার দিনও খুব আনন্দের ছিলো না। বিশেষ করে একজন সংবেদনশীল মানুষ যখন দেখলেন, মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দেয়নি তখনো, আর দেশের নানা প্রান্তে ক্যাম্প খুলে বসেছে, এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিপ্রকাশ যখন ঘটছে প্রতিহিংসার মধ্য দিয়ে তখন আর আনন্দিত হওয়া যায় না। গুহঠাকুরতার বয়ানে :
তখন তো ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধা, ঘরে ঘরে অস্ত্র, গোলাবারুদ — তা নিয়ে এরাও ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই রাজাকার আলবদর, আলশামসদের অনুকরণে আমাদের স্থানীয় অনুচরদের ওপর।… তরুণদের উত্তপ্ত রক্ত নতুন করে রক্তের প্লাবন বইয়ে দিলো। রক্ত দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা। বিজয়ের পরপরই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেলো।
স্বাধীনতার পরও আরো কিছুদিন দেশে অরাজকতা চলেছে এর সাক্ষী দিচ্ছেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা। ১৮ ডিসেম্বর শতাধিক মানুষ খুন হয়েছিলো। মূলত তখনো উভয় পক্ষই এইসব হত্যাকাণ্ডে সক্রিয় ছিলো। উত্তপ্ত রক্ত যোদ্ধারা যেমন রক্তের প্লাবন বইয়েছিলো, আলবদর আলশামসদের পৈশাচিকতা তখনো কমেনি। ১৮ ডিসেম্বর রায়ের বাজারে পাওয়া যায় দুইজন বুদ্ধিজীবী ডাক্তারের লাশ। একজন হার্টের চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বি, আরেকজন চোখের চিকিৎসক ডা. আলীম চৌধুরী। দু’জনকেই ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে নিয়ে অত্যাচার করে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। তাঁদের দেহে সেই অত্যাচারের ছাপ ছিলো। বুকে বুলেট আর কপালে বেয়নেটের ক্ষত ছিলো। এমনি ছিলো পাশবিকতা, শোনা যায়, “…চোখের ডাক্তারের চোখ উপড়ে ফেলে চোখের উপর রেখেছিলো। আর হার্টের ডাক্তারের হার্ট বের করে বুকের উপরে রাখা হয়েছিলো।” তবু ডাক্তার ফজলে রাব্বির লাশ পাওয়া গেছে। অনেক সাহিত্যিক সাংবাদিকের লাশটুকুও তো পাওয়া যায়নি। বাসন্তী গুহঠাকুরতা বলছেন, “তাঁদের পেতে হলে সারা বাংলাদেশের মাটি চষতে হতো।” বাংলার মাটিকে তাঁরা অর্জন করেছেন। তাঁদের রক্তে মাংসে মিশেছিলো বাংলার মাটি, তাঁদের রক্তমাংস মিশে গেছে বাংলার মাটিতে। বাংলার আকাশে, বাতাসে। তাঁদের ঘাম-রক্ত মিশে আছে বাংলাদেশের বিস্তৃত ফসলের মাঠে, স্বাধীনতার সোনালি শস্যে।






































