হযরত শেকসপিয়র না শেখ পীর — জিজ্ঞাসে কোন জনা

১. মুফতি সাহেবের শেকসপিয়র

বাংলাদেশের (অতি) বিখ্যাত মুফতি ইব্রাহিমের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করা যাক। ইউটিউব-ফেইসবুক কাঁপানো এই মুফতি বলেছেন, “শেকোসপিয়ার… শেকোসপিয়ার আসলে শেখ যুবাইর… অ্যারাবিয়ান… অ্যারাবিয়ান… অ্যারাবিয়ান আছল… ওর মূল হইলো আরবি।” লিবিয়ার আলোচিত রাষ্ট্রনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ঠিক একই কথা বলেছিলেন। শেকসপিয়ার যে শেখ যুবাইর এর পেছনে অবশ্য যুক্তি আছে। প্রথমত, কামেল এই নাট্যকারের চেহারাসুরত — বিশেষত মুখের দাড়ি। দ্বিতীয়ত, তাঁর রচনাবলি থেকে  প্রাপ্ত “এন্টি-সেমেটিক মনোভাব (দ্য মার্চেন্ট অভ ভেনিসের শাইলক), মূরদের বীরত্বের প্রশংসা (ওথেলো), সনেটগুলোতে উল্লিখিত ডার্ক লেডি এবং নাটকগুলোতে বিভিন্ন আরব্য ভাষিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের ব্যবহার।”

 

বেশ কয়েক বছর আগে তুর্কি ঐতিহাসিক কাদির মিসিরিলিগ্লু শেকসপিয়রকে (কামেল ) পীর বানিয়ে দেন। তিনি বলেন, শেক্সপিয়রের প্রকৃত নাম আসলে শেখ পীর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেকসপিয়রকে ইসলামী বানানোর কারণ কী?

 

২. শেকসপিয়র  আসলে কে ছিলেন?

শেকসপিয়র আসলে কে ছিলেন? শেক্সপিয়রের নাটকগুলো প্রকৃতপক্ষে কে বা কারা লিখেছেন? তিনি কি একজন ব্যক্তি ছিলেন, নাকি একাধিক ব্যক্তি ছিলেন? এইসব প্রশ্ন সেই ১৭৮৫ সাল নাগাদই করা শুরু হয়েছিল। সমাজের নাক উচুঁ স্বভাবের লোকজন এই ধরনের প্রশ্নসমূহ উসকে দিয়েছিল এবং এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ শেকসপিয়রের সামাজিক অবস্থান।  শেক্সপিয়রের সময়ে নাটকের সাথে সংশিষ্ট মানুষজনদের ভিখিরির চেয়ে একটু ভালো মনে করা হতো। তারপর, শেকসপিয়রের পারিবারিক প্রভাব প্রতিপত্তিও তখন ছিল না। সেই সময়ে ইংল্যান্ডের সমাজে মোটামুটি দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি, আর (জন)সাধারণ শ্রেণি। শেকসপিয়রের বাবা ছিলেন সাধারণ শ্রেণির মানুষ। সাধারণ থেকে অভিজাতদের কাতারে পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। (যদিও শেকসপিয়র এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন।) হেন কারণে শিক্ষায়তনের  অনেক সভ্য বিশ্বাস করতেন, শেকসপিয়রের মতোন একটা স্কুল পাশ গ্রাম্য ছোকরা দ্বারা এতো চমৎকার গীতধর্মী কবিতা ও গদ্য লেখা অসম্ভব। নিশ্চয়ই শেকসপিয়র নামের আড়ালে অন্যকেউ এসব লিখেছেন।

শেকসপিয়রের কবর খোঁড়ার চেষ্টা করলে তাকে স্ট্যাটফোর্ড’র এক পাগলাগারদে ভর্তি করা হয়।

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ। ইতিমধ্যে শেকসপিয়রের খ্যাতির রঙ চড়ে গেছে। শেকসপিয়রে অবিশ্বাসীরা তাদের স্বপক্ষে তথ্য প্রমাণ নিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যখনই কেউ না কেউ শেকসপিয়রকে খোলাখুলিভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তারা বিমুখ হয়েছিলেন। মার্ক টোয়েন, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এমারসন, ওয়াল্ট হুইটম্যান, এবং অরসন ওয়েলসের মতো বিখ্যাত মানুষের শেকসপিয়রের প্রকৃত পরিচয় এবং তাঁর রচনাবলী নিয়ে ছিলেন নিঃসন্দেহ। অতএব তারা ছিলেন শেকসপিয়র পক্ষীয়। এবং বিপরীতভাবে,  অনেকেই শেকসপিয়রের নাটকগুলো রচয়িতা হিসেবে তাদের পছন্দের প্রার্থীর জন্য ঝান্ডা তুলেছিলেন।

 

শেকসপিয়রের মৃত্যুর চারশো পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এতগুলো বছরে শেকসপিয়রের সৃষ্টিকর্মের রচয়িতা হিসেবে পঞ্চাশ জনের বেশি মানুষের নাম উথ্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক নাম আপাতগ্রাহ্য, অনেক নাম একেবারেই  হাস্যকর। এইসমস্ত নামের মধ্যে স্যার  ফ্রান্সিস বেকন, ক্রিস্টোফার মার্লো, এবং এডওয়ার্ড ডি ভেরা অন্যতম।

 

স্যার ফ্রান্সিস বেকন একজন ইংরেজ দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। শেকসপিয়রের সময়ে তিনি ইংল্যান্ডের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং লর্ড চ্যান্সেলর ছিলেন। ডেলিয়া বেকন নামক একজন আমেরিকান ভদ্রমহিলা (বেকনের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই বা থাকলেও থাকতে পারে), ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত  পুস্তকে বলেন, বেকনই আসলে প্রকৃত শেকসপিয়র। তিনি মোটামুটি ভালোই অনুসারী যোগাড় করেছিলেন। এমনকি এই তালিকায় নাথানিয়েল হথর্ণও ছিলেন। (হথর্ন-পরবর্তী বেকনই যে প্রকৃত শেকসপিয়র তা অস্বীকার করেন।) যদিও  ভদ্রমহিলা তাঁর দাবির পক্ষে  অনুসারী যোগাড় করতে সফল ছিলেন, তাঁর গবেষণা নিয়ে বোধহয় একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন। শেকসপিয়রের কবর খোঁড়ার চেষ্টা করলে তাকে স্ট্যাটফোর্ড’র এক পাগলাগারদে ভর্তি করা হয়।

 

শেকসপিয়রের সমসাময়িক অন্যতম নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লোকে তাঁর মেধা, চমৎকার সংলাপ, নাটক রচনার ধরণ ইত্যাদির জন্য প্রকৃত শেকসপিয়র ভাবা হয়। কিন্তু, মার্লো ১৫৯৩ সালে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন। অনেকেই মনে করেন, মার্লো আসলে নিহত হননি। তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি শেকসপিয়রের সমস্ত নাটকের রচয়িতা।

 

অক্সফোর্ডিয়ান নামধারী একদল লোক মনে করেন অক্সফোর্ডের সপ্তদশ আর্ল এডওয়ার্ড ডি ভেরার ছদ্মনাম  শেকসপিয়র। তিনি অভিজাত পরিবারে জন্মেছিলেন। তাঁর বইপত্র ও শিক্ষাদীক্ষা পাওয়ার সুযোগ ছিল।  শেকসপিয়রের নাটকে ইউরোপের যে সব শহরের নাম পাওয়া যায় সেসব জায়গাও তিনি ভ্রমণও করেছিলেন। মার্লোর মতোন এডওয়ার্ড ডি ভেরাও শেকসপিয়রের আগে, ১৬০৪ সালে, মারা যান। শেকসপিয়র তাঁর সর্বশেষ নাটক রচনা করেছেন ১৬১৩ সালে। ডি ভেরার সমর্থকেরা দাবি করেন, মৃত্যুর পূর্বেই তিনি সমস্ত নাটক লিখেছেন, এবং মৃত্যুর পর ক্রমশ প্রকাশের ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন।

 

কেউ আসলে তেমন প্রশ্নটশ্ন করেন না : দান্তে কি সত্যিই দ্য ইনফার্নো লিখেছেন? অথবা, ইলিয়াডের রচয়িতা হোমার কি কারো ছদ্মনাম ছিল ? কিন্তু শেকসপিয়রের নাম কেন এতো সন্দেহের সুড়সুড়ি জাগায়? নিশ্চয়ই কোন ব্যাপার আছে।

 

৩. সাধারণের শেকসপিয়র

জগতে যারা মহান, যারা নিজেদের কর্মের জন্য দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছে সুবিদিত, তাঁদেরকে মুফতির মতো (ধান্দাবাজ) লোকেরা নিজেদের জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য দলে টানতে চান। এতে শেকসপিয়রের মতোন মানুষের ইজ্জত কমে না। বরং শেকসপিয়রের আবেদনের ব্যপ্তি কতো সুদূরপ্রসারী তা নির্দেশ করে। সাধারণের শেকসপিয়র আসলেই শেকসপিয়রই। তিনি একজনই। তাকে শেখ পিয়ার আলী বললেই বা কি, শেখ পীর বললেই বা কী। যুগে যুগে তিনি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম বড় হুজুর।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here