মাল্যবানের আলো ও অন্ধকার

কবি হিসেবে তো বটেই, ব্যক্তি জীবনানন্দ দাশও ছিলেন গম্ভীর, ভেতরগোটানো এবং গাঢ় নির্জন ধরনের মানুষ। বেঁচে থাকার সময়, তাঁর লেখালেখির ধরন ও চরিত্রের গড়নের কথা কাছের ও দূরের মানুষেরা কিছু কিছু জানতেন। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো করে জানতেন বুদ্ধদেব বসু।

 

ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রগতি পত্রিকার সৌজন্যে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর পরিচয় ও আলাপ হয়। দুজনের সেই আলাপ পরে বন্ধুত্বে গড়ায়। একহিসেবে, বুদ্ধদেব বসুই জীবনানন্দের প্রথম মুগ্ধ পাঠক ও প্রচারক; যিনি নিন্দুকের মুখে চপেটাঘাত করে জীবনানন্দের কবিতার পক্ষে কলম ধরেছেন। পরিচয় ও বন্ধুতার কিছুদিন পরেই আমরা দেখতে পাই, ১৯৩০ সালের ৯ মে, শুক্রবার, জীবনানন্দ দাশের যখন বিয়ে হয় ঢাকার পাটুয়াটুলি লেনের ব্রাহ্মসমাজে, তখন বন্ধু অজিত দত্ত প্রমুখকে সঙ্গে করে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত আছেন বুদ্ধদেব বসু। স্ত্রী লাবণ্যর সঙ্গে অত্যন্ত আনন্দিত ভঙ্গিতে বুদ্ধদেবের পরিচয় করিয়ে দিয়ে জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ইনি কবি বুদ্ধদেব বসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। রত্ন।

 

জীবনানন্দের সৃজন-অন্বেষা ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে বুদ্ধদেব বসু ১৯৪৩ সালে ‘জীবনানন্দ দাশ: বনলতা সেন’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র। বাংলা কাব্যের প্রধান ঐতিহ্য থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন, এবং গেলো দশ বছর যে-সব আন্দোলনের ভাঙা-গড়া আমাদের কাব্যজগতে চলেছে, তাতেও কোনো অংশ তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি কবিতা লেখেন, এবং কবিতা ছাড়া আর-কিছু লেখেন না; তার উপর তিনি স্বভাবলাজুক ও মফস্বলবাসী; এই সব কারণে আমাদের সাহিত্যিক রঙ্গমঞ্চের পাদপ্রদীপ থেকে তিনি সম্প্রতি যেন খানিটকটা দূরে স’রে গিয়েছেন। আধুনিক বাংলা কাব্যের অনেক আলোচনা আমার চোখে পড়েছে যাতে জীবনানন্দ দাশের উল্লেখমাত্র নেই। অথচ তাঁকে বাদ দিয়ে ১৯৩০-পরবর্তী বাংলা কাব্যের কোনো সম্পূর্ণ আলোচনা হ’তেই পারে না; কেননা এই সময়কার তিনি একজন প্রধান কবিকর্মী, আমাদের পরিপূর্ণ অভিনিবেশ তাঁর প্রাপ্য।’

 

বুদ্ধদেব বসু যখন এই প্রবন্ধ লিখছেন, তার আগেই, ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত হিসেব করলেও জীবনানন্দ দাশ অন্তত ১১৭টি গল্প এবং গোটা দশেক উপন্যাস লিখে উঠেছেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত কোনো গল্প বা উপন্যাস তিনি প্রকাশ করেননি, কাউকে পড়তে দেননি, এমনকি আলাপও করেননি।

 

৫৫ বছরের জীবন ছিল কবি জীবনানন্দ দাশের। জীবদ্দশায় তো বটেই, মৃত্যুর বহুদিন পর পর্যন্তও তিনি নির্জন এবং কেবল অল্প কয়েকটি কবিতার বইয়ের রচয়িতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। যদিও (প্রথমে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ভবন থেকে ‘এক পয়সায় একটি’ কবিতা হিসেবে চটি কবিতার বইটি বেরোয়) সিগনেট প্রেস থেকে পরিবর্ধিত বনলতা সেন কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের পর ক্রমশ তিনি বিপুলভাবে খ্যাতি ও প্রভাববিস্তারী কবি হিসেবে সমাদৃত হয়ে উঠছিলেন। সেসব তিনি বেশিদিন দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর গল্পকার বা ঔপন্যাসিক পরিচয় কেউ জানতো না, তিনি জানানোর সুযোগ দেননি। সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে একটি চিঠিতে ছদ্মনামে উপন্যাস প্রকাশের কথা বলেছিলেন একবার। ওই পর্যন্তই। সঞ্জয়ও তেমন আগ্রহ দেখাননি, জীবনানন্দও পরে ব্যাপারটা চেপে গিয়েছেন। নির্জন ও ভেতরগোটানো স্বভাবের মতো তাঁর কবি-পরিচয়ের বাইরে আর-কোনো পরিচয় সম্পূর্ণ আড়ালে পড়েছিল, নিতান্ত অবহেলায়। কী জানি, হয়ত সচেতন প্রসাসেও এমনটি ঘটতে পারে। ২২ অক্টোবর ১৯৫৪-তে জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর, তুতেন খামেনের গুপ্তধনের মতোন তাঁর কালো ট্রাংক থেকে বেরিয়েছে অজস্র অপ্রকাশিত কবিতার পাণ্ডুলিপি ও খাতাভর্তি বহু কবিতা; একই সঙ্গে আবিষ্কৃত হয়েছে শতাধিক গল্প, কুড়িটির বেশি উপন্যাস, প্রবন্ধ ও প্রায় চার হাজার পৃষ্ঠার লিটারারি নোটস।

 

সচেতন পাঠকমাত্রই স্বীকার করবেন, জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়েই চট করে বুঝে ওঠা যায় না। একটু সময় নিতে হয়, ভাবতে হয়। ধীরে ধীরে তাঁর কবিতার কথা ও ভাব পাঠকহৃদয় আচ্ছন্ন করতে থাকে। তাঁর চরিত্রও তেমনি নিবিড়, বহুবিধ সৃজনরহস্যে আচ্ছাদিত। সে কারণে এত কাছের এবং অনুসন্ধিৎসু পাঠক বুদ্ধদেব বসুর পক্ষেও জীবনানন্দ দাশকে সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই তিনি অবলীলায় বলেছেন, ‘…তিনি কবিতা লেখেন এবং কবিতা ছাড়া আর-কিছু লেখেন না।’

 

আজ তো দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার বোঝা যায়, নিজের মধ্যে বড় ও অন্যধারার গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন ও সম্ভাবনা দেখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ।

 

১৯৫৩ সালে, তখন বেশ কিছুদিন বুদ্ধদেব বসু কলকাতায় ছিলেন না; আমেরিকায় গিয়েছিলেন। এমনই একটা সময়ে জীবনানন্দ দাশ তাঁর ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পায়ে হেঁটে সটান বুদ্ধদেব বসুর ২০২ নং রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাড়ির দোতলায় হাজির হলেন। উদ্দেশ্য প্রতিভা বসুর সঙ্গে উপন্যাস নিয়ে কথা বলা। উপন্যাস লিখে কেমন টাকা পাওয়া যায়? খুব বেশি সময় সেখানে থাকেননি জীবনানন্দ দাশ, তবে তথ্যগুলো জেনে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। এতে বোঝা যায়, ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশের নানা পরিকল্পনা তাঁর ভেতরে বিরাজমান ছিল। কিন্তু সময়, ভালো প্রকাশক ও আত্মবিশ্বাসের অভাব — যে কোনো কারণেই হোক, বেঁচে থাকতে তিনি এত এত গল্প উপন্যাস লেখার পরেও একটাও প্রকাশ করেননি।

 

মৃত্যুর পর, গল্পকার হিসেবে জীবনানন্দ দাশ প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন অনুক্ত পত্রিকায়। এতে তিনটি গল্প প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭২ সালের আষাঢ় মাসে সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের গল্প নামক বই। আরো পরে, প্রথম যে উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হয় সেটি মাল্যবান

 

মাল্যবান জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। উপন্যাসটি লেখা হয় জুন ১৯৪৮ সালে, অল্প কয়েকদিন সময়ের ব্যাপ্তিতে। তাঁর জীবদ্দশায় উপন্যাসটি ট্রাংকবন্দি অবস্থায় চাপা ছিল। মৃত্যুর কুড়ি বছর পর, তাঁর ছোটভাই অশোকানন্দ দাশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘নিউ স্ক্রিপ্ট’ থেকে এটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটির প্রথম সংস্করণে নামপত্রে প্রকাশকের নাম, প্রচ্ছদ: সত্যজিৎ রায়, কপিরাইট: লাবণ্য দাশ ও সমরানন্দ দাশ, মূল্য: ১০ টাকা — এই কথাগুলো উল্লেখ ছিল। বইয়ের কোথাও প্রকাশকাল উল্লেখ নেই।

 

মাল্যবান নামের খুব সাধারণ ও অনুচ্চ, ন্যাতানো স্বভাবের স্বামী এবং কুশলী-চতুর উৎপলা আর তাদের মেয়ে মনুকে ঘিরে সংসারের সরল ও সাদামাটা দিনযাপনের গল্প ‘মাল্যবান’। কিন্তু উপন্যাসটি পড়তে পড়তে নানা ধরনের অনুভূতি ও ভাবনা তৈরি হয় পাঠকহৃদয়ে। এমনই ম্যাড়মেড়ে ও বিবমিষায় আটকে পড়া দুজন মানুষের গল্প। আবার ঔপন্যাসিকের ভাষা, চিত্রকল্প, কল্পনা ও জীবনযাত্রার উপস্থাপন মুগ্ধও করে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো এই উপন্যাসও ঘোর তৈরি করে চলে। অস্বস্তি ও আনন্দ দেয়। উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রের দিনযাপনের গ্লানি মন ও মনের আকাশ ক্ষতবিক্ষত করে। বেদনায় লীন করে তোলে মুখ ও মনের মানচিত্র। ‘মাল্যবান’ উপন্যাস শুরু হয় এভাবে:

সারা দিন মাল্যবানের মনেও ছিল না, কিন্তু রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে অনেক কথার মধ্যে মনে হল, বেয়াল্লিশ বছর আগে ঠিক এই দিনেই সে জন্মেছিল — বিশে অঘ্রান আজ।
জীবনের বেয়াল্লিশটা বছর তা হলে চ’লে গেল।
রাত প্রায় একটা; কলকাতার শহরে বেশ শীত, খেয়ে-দেয়ে কম্বলের নিচে গিয়েছে সে প্রায় গোটা-দশেকের সময়; এতক্ষণে ঘুম আসা উচিত ছিল, কিন্তু এল না; মাঝে মাঝে কিছুতেই চোখে ঘুম আসে না। কলেজ স্ট্রিটে বড়ো রাস্তার পাশেই মাল্যবানের এই দোতলা ভাড়াটে বাড়িটুকু; বাড়িটা দেখতে মন্দ নয় — কিন্তু খুব বড়ো-সড়ো নয় — পরিসর নেহাত কমও নয়।

ঔপন্যাসিকের বর্ণনায় ক্রমশ দৃশ্যমান ও উন্মোচিত হতে থাকে ঘর ও ঘরের মানুষের ভেতর ও বাইরের জগত। দুজনের ক্রমশ আলাদা ও একা হয়ে যাওয়া। মাল্যবান নিচের ঘরে একা তার নিজের মতো পড়ে থাকে, অবহেলায়। নিয়মিত খাবার, খাবার পানি, শীতের দিনে গরম জল ও প্রয়োজনীয় জিনিসটা পায় না। স্ত্রী-সঙ্গ তো নয়ই। কারণ দুজন আলাদা ও একা। আবার হঠাৎ দুজনে একসঙ্গে ঘুমায়, সঙ্গম করে, পরিতৃপ্ত হয়; তবে এমন ঘটে যেন দৈবের বশে, কদাচিৎ। বলতে গেলে মাল্যবানের কোনো বন্ধুও নেই। লেখালেখি, পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে থাকে। দোতলার ঘরে মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকে উৎপলা। মাল্যবান উপরে যাওয়ার সুযোগ পায় না। কখনো হঠাৎ ইচ্ছে করে, চলেও যায়; কিন্তু উৎপলার ধাতানি খেয়ে সুড়সুড় করে নিচে নেমে আসে। উৎপলার কমবয়েসী একজন প্রেমিক আছে, সে সাইকেল নিয়ে আসে; সাইকেলটা মাল্যবানের ঘরের সামনে রেখে উপরে চলে যায় গটগট করে। মাল্যবানকে পরোয়াও করে না। দরজা লাগিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে, চুপ থাকে আবার রাত বারোটা বেজে গেলেও বেরোয় না। এসব দেখে ও শুনে অসহায় ভঙ্গিতে নানা কথা ভাবে মাল্যবান, দগ্ধ হয়, তার মন ও মেজাজ ক্ষতবিক্ষত হয়; তবে কিছুই করতে পারে না।

মাল্যবানের ছদ্মবেশে এ যেন জীবনানন্দ দাশেরই অন্যজীবনের গল্প; যে গল্পে সত্য ও মিথ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

উপন্যাসের মাল্যবান ও উৎপলার সংসারের বাইরেও নানা ধরনের গল্পসূত্র ও ঘটনাপ্রবাহ আছে, আছে জীবন ও সমাজের বহুমুখী উন্মোচনও। কিন্তু সময় ও প্রকৃতির নিয়মে একটার সঙ্গে আরেকটি গল্প ও ঘটনা এবং আলো-অন্ধকারের মিল হলেও মিল হয় না কেবল মাল্যবান ও উৎপলার। যেমন মিল হয় না তেল ও জলের। একই সংসারে, কখনো একই ঘরে একটেবিলে বসে খাওয়া থেকে গল্প ও হাসিতামাশা করে গেলেও দুজনের দূরত্ব ঘোচে না কিছুতেই। দুজন কীভাবে ও কতখানি আলাদা, তা উপন্যাস থেকেই তুলে ধরা যাক:

পরদিন উৎপলা আগ বাড়িয়ে বললে, ‘সিনেমায় চল।’
অফিস ছুটি ছিল সে-দিনও, তিনেটর শো’তে গেল তারা। ট্রাম থেকে নেমে উৎপলা বললে, ‘বক্সে বসবে তো?’
‘না, সে ঢের খরচ।’
‘তা হলে কোথায় যাবে আবার। ছবিতে বক্সে না বসলে ভালো লাগে না।’
‘কেন, নিচের গদিতে ব’সেও তো বেশ আরাম।’
‘আরামের জন্য বলছি না।’
‘তবে?’
‘বক্সে বসলে নিচের লোকেরা হাঁস-হাঁসানির মতো ঘাড় বাঁকিয়ে আমাদের দিকে তাকায়, দেখতে বেশ লাগে –’
মাল্যবান হেসে বললে, ‘ওঃ, সেই কথা; দু’-তিন ঘণ্টার জন্যে তো শুধু, তারপর বায়োস্কোপ ভেঙে গেলে কেউ কি আর বক্সের মানুষদের কথা মনে রাখে?’
‘তা রাখে না বৈ-কী। যদি কোনও চেনা মানুষ নিচের থেকে আমাদের দেখতে পায়, তা হলে জনে জনে ব’লে বেড়াবে কথাটা। আচ্ছা রগড়ই হবে! খুব কি খারাপ জিনিস হবে কথাটা চার হাতে পায়ে চতুর্দিকে ছুটে বেড়ালে — ’
কেমন যেন নির্দোষ শয়তান মেয়ের মতো হাসি — ডেঁপো ইস্কুলের — উৎপলার পাউডার ক্রিম মাখানো চমৎকার মুখখানাকে আঁকড়ে ধরল।
হি হি করে ক’রে হাসতে লাগল সে।
মাল্যবান আড়চোখে একবার উৎপলার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘না, তা নয় — তবে আমাদের কী লাভ?’
‘বেশ রগড় হয়।’
‘এ-রকম রগড়ের কী আর মূল্য আছে।’
‘মূল্য নেই? তুমি বললেই হল; নেই? নিশ্চয়ই আছে। না থেকে পারে না।’
হাঁটতে হাঁটতে উৎপলা বললে, ‘সেদিন তো সোনার ঘড়ি বেচে তিন-শো পঁচাত্তর টাকা পেলেÑবক্সের টিকিট কিনতে তোমার এত ভয় –’
‘মিছেমিছি পয়সাবাজি ক’রে কী লাভ।’
‘মিছেমিছি হল?’
‘চেনা মানুষ কে এমন থাকবে নিচে যে, বক্সে আমাদের দেখে ঈর্ষায় রাতে ঘুমোতে পারবে না আর’ বলে মাল্যবান একটু দাঁত বের করে হাসল।
উৎপলা বললে, ‘ঝপ করে মিথ্যে কথা বলে ফেললে।’
‘কেন, মিছে কথা কী হল?’
‘ঈর্ষার কথা বলেছিলাম আমি?’
‘বেশ মজা হবে, বেশ পাঁয়তারা কষা হবে, বলেছিলে তুমি। তা তো হবে, কিন্তু অন্যরা ঈর্ষায় না পুড়লে রগড় ফলাও হয় কী ক’রে?’
‘বেশ তো, পুড়ুক হিংসায়।’
‘বেশ। পুড়ুক।’ মাল্যবান টিকিট-ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। মাল্যবান, অবিশ্যি, সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট কাটল — ম্যাটিনির সময়ে আদ্ধেক দামে পেলে — দু’টাকাও খরচ হল না তার।
‘যাক, আমি বাড়ি ফিরে যাইÑ’ উৎপলা প্লাগ ঢোকাতে গিয়ে বিদ্যুতের ঘা থেয়ে যেন বললে।
‘কেন?’
‘দেখব না সিনেমা।’
‘তুমিই তো সকাল থেকে তাড়া দিলে সিনেমায় আসবার জন্যে।’
‘ঢের হয়েছে, আর কোনও দিন আসতে চাইব না।’
‘কিন্তু এখন তো চল।’
‘তুমি আর মনু যাও।’
‘আর তুমি?’
‘ঠিক আছে। যাও তোমরা।’
‘হুশ। এ-রকম ছেলেমানুষি করে না-কী, পলা।’
‘কী টিকিট কিনেছ, দেখেছি আমি,’ ঝামটা মেরে উৎপলা বললে, ‘ছেলেমানুষি? আমার? নাম ডোবালে তুমি। ধন মান খোয়ালে টিকিট কিনে।’
উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হতে পারে — জীবনানন্দ দাশ ‘মাল্যবান’ লিখছেন না। মাল্যবানই যেন জীবনানন্দকে লিখছেন। এমনই আলোছায়ার গল্প ও উপকথায় ঠাসা মাল্যবান ও উৎপলার জীবনের আখ্যান।

নিজের ভাড়া করা বাসায়ও মাল্যবান যেন বহিরাগত। পাসপোর্টহীন। কোনো ভালোবাসা নেই, অধিকার নেই; আবার সংসারের দায়িত্বও এড়াবার সুযোগ নেই। একবার উৎপলার পক্ষের একপাল আত্মীয় আসে বাসায়। দোনামোনা করে উৎপলা বলেই ফেলে স্বামীকে, কটা দিন তুমি বাইরে থাকো। বাসায় এত মানুষের জায়গা হবে না। এছাড়া উপায় কী বলো?

 

মাল্যবান হতভম্ব এবং বোকা হয়ে যায়। কী করবে, কী বলবে — খুঁজে পায় না। সময় গড়ায়। এদিকে আত্মীয় গিজগিজ করছে বাড়িতে, তাদের জন্য বাজার সদাই এবং দেখভালও করতে হচ্ছে।
উপন্যাসে একসময় দেখি, স্ত্রী উৎপলা মাল্যবানকে ফুটপাতে গিয়ে শুতে বলছে। স্ত্রীর কথায় অনুরোধ ও বিরক্তি দুটোই আছে। মাল্যবান অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, কখন যাব! উৎপলা বলে, এখনই যাও।
ফুটপাতে গিয়ে না শুলেও শেষ অবধি মেসে চলে যায় মাল্যবান।

 

মাল্যবানের ছদ্মবেশে এ যেন জীবনানন্দ দাশেরই অন্যজীবনের গল্প; যে গল্পে সত্য ও মিথ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

 

মাল্যবান উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বিচিত্র অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা জমা হতে থাকে করোটিতে। কখনো কাহিনির অভিনবত্বে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। কখনো মুগ্ধতা জাগে। সামান্য একটি উপন্যাসের পরিসরে এত আলো ও অন্ধকার, এত গোলকধাঁধা, গলিঘুঁজি ও হাওয়া বয়ে চলে, থেমে থেমে এগুতে হয়। পাঠ থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে হয়।

উপন্যাসের একেবারে শেষে ছোট একটি দৃশ্য তৈরি করেছেন জীবনানন্দ দাশ; এই বর্ণনাটুকু পড়ে আমাদের শ্বাস ভারি হয়ে আসে, চোখ ছলছল করে, গলার কাছে কী যেন এসে ভীড় করে। কেন?

মাল্যবান নামের চরিত্রটি কী ভয়ংকর ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিরি ভেতর দিয়ে তার জীবনকে বয়ে নিয়ে চলে, তবুও সে সংসার থেকে কেটে পড়ে না। কীভাবে সে পেরে ওঠে? এসব ভেবে শ^াস ঘনো হয়ে আসে। বুকের বাতাস থেমে যায়।

 

ওপরের ঘরে উৎপলা থাকে তার নিজের রাজত্ব নিয়ে। সেখানে তার প্রেমিক ও প্রিয়মানুষদের অনায়াস যাতায়াত সিদ্ধ হলেও মাল্যবানের অনুপ্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ ও দণ্ডিত। ওপরের ঘরের বাথরুমে মাল্যবানকে স্নান পর্যন্ত করতে দেয় না উৎপলা। মাল্যবানকে স্নান করতে হবে বাড়ির অন্য মহিলাদের নজরের সামনে, নীচের চৌবাচ্চায়। খোলা জায়গায়। কিন্তু খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে বৌ-ঝিদের আনাগোনা চোখ-মারা মুখটেপার ভেতর স্নান করতে ঠিক জুত লাগে না মাল্যবানের। উপন্যাসের ভাষায়, যেন ‘শিবলিঙ্গের কাক-স্নান হচ্ছে’। মাল্যবানের এ কথা শুনে উৎপলা বলে, ‘তা হলে তুমি কি বলতে চাও দরজা জানলা বন্ধ ক’রে এক-হাত ঘোমটা টেনে তুমি ওপরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকবে, আর মেয়েমানুষ হয়ে আমি নিচের চৌব্বাচায় যাব — ওপরের বারান্দায় ভিড় জমিয়ে দিয়ে ওদের মিনসেগুলোকে কামিখ্যে দেখিয়ে দিতে?’

এ কথার কী উত্তর হয়, জানা নেই মাল্যবানের। সে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। সরে যায়। এভাবেই উৎপলার সঙ্গে একজীবন কাটিয়ে চলে মাল্যবান।

 

জীবনানন্দের অভ্যেস ছিল, কোনো একটি কবিতা লিখে শেষ করার পর, ফেলে রাখা ও ফিরে ফিরে পড়া এবং সংশোধন করা। এরপর চূড়ান্ত রূপ তৈরি করে পত্রিকায় বা বইয়ের পাণ্ডুলিপি হিসেবে পাঠানো। এমনকি পত্রিকায় কবিতা পাঠিয়ে, এমনকি ছাপা হওয়ার পরেও তিনি সংশোধন করতেন। কিন্তু গল্প উপন্যাসের বেলায় তিনি এই কাজ করতে পারেননি। হয়ত সময় ও অবকাশ পাননি। নিজের সৃজনকৌশল ও বৈশিষ্টৗ সমুন্নত রেখে জীবদ্দশায় তিনি যদি গল্প উপন্যাস প্রকাশ করতেন, তাঁর সময়ের উল্লেখযোগ্য গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি লাভ করতেন, এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়। হায়, সেই সুযোগটি তিনি করে উঠতে পারলেন না।

 

মাল্যবান উপন্যাস নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে, একটি এমন — জীবনানন্দ দাশ নাকি হাসপাতালের শেষশয্যা থেকে স্ত্রী লাবণ্য দাশকে একরকম মৌখিক নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, ট্রাংকে রক্ষিত রচনাবলী বাইরের কাউকে যেন দেখানো না হয়, প্রকাশ তা দূরের কথা। এমনও শোনা যায়, পরলোকগত জীবনানন্দ দাশ নিয়মিত কবিজায়াকে দেখা দিয়েছেন আরমাল্যবান-এর প্রকাশোপযোগিতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং প্রকাশনার বিপক্ষে অগ্রিম অভিমত জ্ঞাপন করেছেন। ভুল। এটা কিছুতেই হতে পারে না। প্রথমত ট্রামের সঙ্গে দুর্ঘটনার পর, লাবণ্য একবারই হাসপাতালে গিয়েছিলেন, কথা হয়েছিল সামান্যই, হয়ত নয়। লাবণ্য আর্তচোখে স্বামীর রক্তাক্ত বুকে হাত রেখেছিলেন। এটুকুই।

 

জীবনানন্দ দাশ সচেতনভাবেই সিরিয়াসলি ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি কখনো প্রতিভা বসুর কাছে উপন্যাস বিক্রির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন, সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে চিঠিতে ছদ্মনামে উপন্যাস লিখবার বাসনার কথা জানিয়েছেন এবং বয়সে ছোট কিন্তু বন্ধুর মতো জীবনানন্দ-অনুরাগী প্রভাকর সেনকে গল্প উপন্যাস পড়তে দিয়েছেন। এমনকি ‘মাল্যবান’-এর চিত্রনাট্য লিখে প্রেমেন্দ্র মিত্রকে জমা দেবেন বলেও ভেবেছেন। কারণ প্রেমেন তাঁর বন্ধু এবং বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। কাজেই গল্প উপন্যাসের জগতে জীবনানন্দ দাশ হঠাৎ খেয়ালে কবিতা থেকে কলম তুলে ঢুকে পড়েছেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

 

লাবণ্য দাশ মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। তবে স্ত্রী হিসেবে স্বামীকে বুঝে ওঠার রসায়নে দুজনের আজীবন অমিল ও গণ্ডগোল ছিল। জীবনানন্দ দাশ স্বঘোষিত নাস্তিক এবং তিনি মানুষের মানবিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেই তিনি কিনা মারা যাওয়ার পর ভূত হয়ে ফিরে এসেমাল্যবান প্রকাশ করতে মানা করবেন বা হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে পাণ্ডলিপি লুকিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেবেন, তাও লাবণ্যকে; এমনটা কিছুতেই হতে পারে না। কেন? কারণ এই, জীবনানন্দ দাশ তো সারাজীবন তাঁর পাণ্ডুলিপি স্ত্রীর কাছ থকেই বেশি লুকিয়েছেন।

কাজেই না, মেলানো যায় না।

 

ব্যক্তিচরিত্রের মতো মাল্যবান উপন্যাসেও এই বৈপরীত্যের আভাস ও প্রকাশ আমরা নানাভাবে দেখতে থাকি। চতুর ও ছলনায় পারদর্শী উৎপলা ও বেচারা মাল্যবানের জীবনের গল্পের টুকরো ও দীর্ঘ বেদনাঘন দীর্ঘশ্বাসে ভেজা দিনলিপি দেখে ও অনুভব করে যেন ফুরোয় না। ফুরোয় না যেমন শীতরাতের বিরহের দীর্ঘ সময়। উপন্যাস শেষও হচ্ছে সেভাবেই:

…কোনও দিন ফুরুবে না শীত, রাত আমাদের ঘুম?
ফুরুবে না। ফুরুবে না।
কোনও দিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?
না, না, ফুরুবে না।
কোনও দিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?
ফুরুবে না। ফুরুবে না। কোনও দিন —

উপন্যাসের একেবারে শেষে ছোট একটি দৃশ্য তৈরি করেছেন জীবনানন্দ দাশ; এই বর্ণনাটুকু পড়ে আমাদের শ্বাস ভারি হয়ে আসে, চোখ ছলছল করে, গলার কাছে কী যেন এসে ভীড় করে। কেন? কারণ পুরো উপন্যাসে উৎপলা তার সরল ও ব্যর্থ স্বামীকে সারাজীবন ধরে কোন চোখে দেখে এসেছে, তা ফুটে বেরিয়ে এসেছে। উপন্যাস থেকে দৃশ্যটা হুবহু তুলে দিচ্ছি:

…শীত-রাতের প্রবাহের রোল শুনতে শুনতে মাল্যবানের ঘুম ভেঙে গেল। টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিল সে। তাকিয়ে দেখল, ঘর অন্ধকার; টেবিলের থালা-বাসন সমস্ত সরিয়ে এঁটো পরিষ্কার করা হয়েছে কখন যে, সে টেরও পায়নি; টেবিল ফিটফাট পরিচ্ছন্ন — কালো সরীসৃপের পিঠের মতো চক-চক করছে।
মাল্যবান বুঝতে পারছিল না, কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল। এই যে এইমাত্র উৎপলাকে দেখছিল, বিছানায় শুয়েছিল, কথা শুনছিল — এসব তাহলে ঘুমের ভেতর দেখা, নির্জ্ঞান পরলোকের কণ্ঠে শোনা? জেগে থেকে, তা হলে সে কোন অব্দি শুনছিল? মাল্যবান হেঁট করে অন্ধকারে বুঝে নিতে চেষ্টা করছিল।
মনে পড়ল তার। মনটা বড়ো খারাপ হয়ে গেল। কিছু হবে না, কিছু সে করতে পারবে না বলে উৎপলা তার পর মাল্যবানকে এঁটো টেবিলে ঘুমিয়ে পড়তে দেখল; এঁটো পরিষ্কার করল; মশারি ফেলল; বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়েও পড়ল; — কিন্তু, মাল্যবানকে জাগিয়ে দেওয়াও উচিত মনে করল না?

জীবনানন্দ দাশের ‘মাল্যবান’ উপন্যাস এভাবে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এর কাহিনি ও চরিত্রের সংকটের ব্যথাভার যেন ঝুলে থাকে, শেষ হয় না। উপন্যাসের ভেতরের দুঃখ-কষ্ট-গ্লানি ও ভরকেন্দ্র মনকে আর্ত ও আচ্ছন্ন করে। আচ্ছন্নতার সেই বোধ কিছুতেই কাটে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here