উন্মেষ ধরের কবিতা

উন্মেষ ধর তরুণ কবি। তারুণ্যও হতে পারে প্রজ্ঞাময়; এলোমেলোমির বাইরে গিয়েও পাঠ নেয়া যায় জীবন ও অভিজ্ঞতার। উন্মেষের কবিতা তাই হয়ে উঠেছে প্রজ্ঞা ও মননের কবিতা। তার কবিতা দাবি করে অভিনিবেশী পাঠ ও আস্বাদন। সহজিয়ার পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হল উন্মেষ ধরের একগুচ্ছ কবিতা। 

 

লোক বা লোকধারণার তিন কিস্তি

১-এ চন্দ্র (চন্দ্রকে দূরত্ব-মেনে দেখা)

‘দেখা’-এর ইতিহাস আছে, তাকিয়ে দেখার জোরালো প্রস্তাব আছে ।

সন্ধা নেমে আসার আগেই ‘দেখা’ শেষ হয়, অবসরকালীন বাসনা দীর্ঘ হতে থাকে, লোকে পড়ে অথৈ জলে । লোকে বোঝে তাকিয়ে দেখার কোনও দৃককোণ থাকতে নাই । যেমন, খোয়াবকালীন কোনো বায়না থাকতে নাই; যেমন, বাসনার কোনো যুৎসই ব্যাখ্যা থাকতে নাই । আদতে বাসনারও তো কোনও বস্তুরূপ থাকে না । লোকে যন্ত্রণা পায়, তাকিয়ে দেখার জোরালো প্রস্তাব তাদের (তাঁদের) আরাম দেয় । আরও সমূহ দেখার অন্তরঙ্গতা তাদের (তাঁদের) ইতিহাসকে বদলে দিতে থাকে; দেখার ইতিহাস আছে – এখন এ হলো লোকের হাল আমলের বিশ্বাস ।

 

২-এ পক্ষ  (সাদাপক্ষ ও কালোপক্ষ)

দ্বিধাকে বহু-ধা করে দেখার সুযোগ আছে কোনো ?

একমন যার, সে নিত্যানন্দকে পায়, দুই-এ মেলে ছেদ-অযোগ্য বিচ্ছিরি আলো, চোখে ধন্দ লাগে যা-তা । অবিরত সাদা-কালো যুঝে এখন দ্বিধাকে পেরিয়ে যাওয়ার কোনো সিঁড়ি মেলে না, দুই বা তিন বা চার, পাঁচ….. বাস্তবের মাঝে টোল খাওয়া পয়সার আকারে মিথের জন্ম হয় । বিপুল লোক মিথনির্ভর করে গান বাঁধে (ঘর বাঁধে না, ঘরনিও সাথে থাকে না), শাহাবুদ্দিনের মতো বাকিরাও গোটা কয়েক পটলের সঙ্গে, আরও কয়েক ধুন্দলের সঙ্গে গানও বিক্রি করে । বিক্রি হয় ঘরের ছাদ থেকে বাদামের খোসা অব্দি, বিক্রি হয় আইসক্রিম থেকে অক্ষরের কালো মাত্রাগুলো; নিরালম্ব বাদামের খোসা, ন্যাংটো অক্ষর – এসবই মিথ, লোকে ভালোবাসে । দ্বিধাকে বহু-ধা করে দেখার সুযোগ তো থাকে একমাত্র ‘মিথ’-এই ।

 

৩-এ যতি (পতন, বিজ্ঞাপন, তবুও)

লোকধারণার কোনো স্বর থাকে না, থাকে ঘরের দেয়াল-বাওয়া মাধবীলতার মতো লতিয়ে ওঠা তাদের দেহধারণা ।

লোকধারণায় শ্রুতি থাকে, শ্রুতিদের আদর করা গৃহপালিত নাম থাকে; শ্রুতিগল্প পড়ানো হয় গাঁও-গেরাম উজাড় করা নগরের বিদ্যালয়ে । নগরের পুবে যখন আলো, বর্ষণে শ্রুতি অশ্রুত ! দক্ষিণে বাতাস, বসন্তের নাগরের ভাঁজ-খোলা বিনোদন । হইহই-রইরই, লোকধারণার স্বর পুবে নাই, দক্ষিণে নাই । নাগর উল্লাসে সে স্বর শ্লোগান হয়ে ওঠে না কখনও, সে স্বর অতীত, সে স্বর ঘরহারা ! শ্রুতিতে শোনা দেহধারণা আরও কয়েক জন্ম বাঁচার আশে সুঠাম হতে থাকে, সুদীর্ঘ হতে থাকে, নিয়তি তার : অনন্তর ‍বিজ্ঞাপন বিরতি আরম্ভ হয়, তবুও আরও একটি আরম্ভ লোকধারণায় দুর্লভ নয় ।

 

শৈশব এক ঋতুর হতে পারে

যেখানে দাঁড়িয়েছি, সেখানেই আঙুল গলিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে

রঙিন মার্বেল ।

মার্বেলগুলো দীর্ঘদিন সঞ্চয়ে ছিল মায়ের,

শৈশব বলতে মার্বেলে টোল-খাওয়া দুনিয়াটাকে বুঝি না,

বুঝি একজন ঋতুদিকে,

যার সঙ্গে আমার প্রথম শৈশবে বর-বৌ খেলার ফাঁকে

হয়তো খুঁজে নিয়েছি সিনেমায় দেখা কোনও নায়িকার বিজ্ঞাপন ।

ঋতুদি হারিয়ে গেছে আমার শৈশব পেরোনোর আগেই,

শরীরের রেখাগুলো যখন পড়তে শিখেছি, তখনও

ঋতুদি ‘নায়িকা’ হয়েই আছে, ঠিক ‘নারী’ পরিচিতি পায় নি ।

 

আমার     আঙুল গলিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মার্বেল,

শৈশবের উঠান জুড়ে তারই অবশেষ,

ঋতুদি অনেকদিন আগেই নিরুদ্দেশ !

 

ছবি-উৎসব

কোনও দূর দ্বীপে ছবি-উৎসব হওয়ার কথা আছে

যে দ্বীপে মৃত ব্যক্তির নামে কোনও পরোয়ানা থাকে না

(মৃত্যু সেখানে ছবির ‘সাবজেক্ট’ হয়ে থাকে)

যেখানে দুই পা বাড়ালেই পায়ের ছাপে রঙ লেগে যায়

পাঁচরঙা-সাতরঙা এ ছবিগুলো ঘড়ির কাঁটার মতো বিশ্বাসী হয়

দেখা দুনিয়া নয়, দুনিয়া নুয়ে আসা তারা সম-ভ্রমের কথা কয়

রঙের স্ট্রোকগুলো খুব নরম, হাত বোলালে আরাম লাগে

ছবিগুলো দীর্ঘ হয়, উৎসব হয় ছোটো,

রঙ ঘন হয়ে থাকে (বলক ওঠা দুধের মধ্যে হলুদ গুঁড়োর মতো) ।

সে উৎসবের কোনও নাম থাকবে না, নাম থাকবে ছবির,

নাম থাকবে দর্শককুলের;

মনে রাখুন, উৎসবে বেনামে বিক্রি হবে ছবির স্ট্রোকের আদরগুলো ।

6 মন্তব্যসমূহ

  1. প্রতিটি কবিতাই ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন ভাবের, ভিন্ন আবেগের পসরা সাজিয়ে আমাদের অন্তরলোকে হাজির হয়ে বহির্লোকের ছাপচিত্রের কাহিনি বলে গেল! মুগ্ধতা রেখে গেলাম তাই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here