সাহিত্যিক অনুবাদ অধ্যয়ন এবং একটি সম্ভাবনা : পর্ব দুই

তোমার কানে কি একটা মাছ? (২০১১) Is that a Fish in Your Ear? লিখেছেন ডেভিড বেলোস। মাছ-রহস্যের উৎস কোথায়? ডেভিড বেলোস প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে কম্পারেটিভ লিটারেচারের একজন অধ্যাপক। ফরাসি সাহিত্য পড়ান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের Translation and International Communication এর পরিচালক ছিলেন প্রায় এক যুগ। মাছ-রহস্যের উৎস জানার জন্য প্রথমে গ্রন্থের নামের তাৎপর্য অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা যাক। (আগ্রহী পাঠক বইটি পড়ে নামকরণের সার্থকতা অনুসন্ধান করতে পারেন) ডগলাস নোয়েল অ্যাডামস (১৯৫২-২০০১) ১৯৭৭ সালে বিবিসি রেডিওর জন্য একটি কমেডি-প্লট পরিকল্পনা করেন। পরিচালক ছিলেন সিমন ব্রেট। ১৯৭৮ সালের মার্চ মাস থেকে ইংল্যান্ডের বিবিসি রেডিও ফোর (BBC Radio 4) থেকে শুরু হয় পরিকল্পিত এই প্লটের ওপর রেডিও সিরিজ ‘দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি’ (The Hitchhiker’s guide to the Galaxy) এর সম্প্রচার।

 

পরবর্তী সময়ে এটি ১৯৮১ সালে টিভি সিরিজ, ১৯৮৪ সালে ভিডিও গেম এবং ২০০৫ সালে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়। কী আছে এই কমেডি-প্লটে? এটি হল এমন একটি সৃষ্টি যেখানে বিজ্ঞান আর কল্পনা মিশে একাকার হয়েছে। এখানে কল্পিত ইলেক্ট্রনিক বুক কিংবা মারভিন দ্য রোবট আজ আমাদের কাছে বাস্তবতা। এখানে পাওয়া যেতে পারে আমাদের ‘কানে মাছ’-রহস্য সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর। মূল চরিত্র আর্থার যখন একটি মহাকাশযানে নিজেকে আবিষ্কার করে, তখন ফোর্ড তার কানে একটি হলুদ রঙের মাছ ঢুকিয়ে দেয়। হলুদ রঙের ছোট্ট লিচ (leech, জোঁকের মত একটি কাল্পনিক প্রাণী) ধরনের প্রাণীটি যখন আর্থারের কানে ঢুকে যায়, তখন সে হঠাৎ করেই সবরকম ভাষা বুঝতে শুরু করে। এই সিরিজে একে এমন একটি ব্যাবল ফিশ (Babel Fish) বলা হয়েছে যে তার চারপাশ থেকে ব্রেইন ওয়েব বা মস্তিষ্ক তরঙ্গ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং গ্রহীতার মনে গ্রহীতার ভাষায় তার অর্থ উৎসারিত করে। অর্থাৎ যার কানে এই মাছ থাকবে সে বিশ্বের যে কোন ভাষা বুঝতে পারবে।

 

ডেভিড বেলোস তাঁর গ্রন্থে সম্ভবত এই মাছের কথাই ইঙ্গিত করেছেন। এমন কোনো মাছ আসলে আমাদের কানে আছে কিনা যা দিয়ে আমরা যে কোনো ভাষার সমস্ত কিছু বুঝতে পারি। এই ভাবনা যখন প্রকাশিত হয় তখন বাংলাদেশের কী হাল? ডগলাসের সমকালীন ১৯৭৭ সালের বাংলাদেশ, ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ গ্লানিময় ক্লেদাক্ত জাতি, ৭১-এ মাত্র স্বাধীন হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই এক বিষাদময় অন্ধকারের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। সেসময় পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে বসে ডগলাস আজকের পৃথিবীর আবিষ্কৃত বহু ধারণার অবতারণা করে বেলোস এর মাছের সঙ্গে মানুষের পরিচয় ঘটালেন।

 

নজর ফিরিয়ে আনি দশ বছর আগের কলম্বিয়াতে। ১৯৬৭ সাল। কলম্বিয়ান লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এর ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড  (One Hundred Years of Solitude) স্প্যানিশ ভাষায় আত্মপ্রকাশ করে। এর মূল উপাদান একাধিক প্রজন্মের মধ্যেকার সম্পর্ক। দুই-তিন বছরের মধ্যে, ১৯৭০ সালে প্রকাশিত এর ইংরেজি অনুবাদ নিশ্চিত করেছিল পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ যেমন, ইতালি, ফ্রান্স, আমেরিকায় এর বিভিন্ন পুরস্কার-প্রাপ্তি।

 

এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক সমকালীন বাংলাদেশের দিকে। ১৯৭০-১৯৭১ এর বাংলাদেশ, স্বাধীনতার আকাশে রক্তাক্ত আভার রঙিন সূর্য। তবু বাঙালি কিন্তু তখন সাহিত্যের মাঠে পিছিয়ে ছিল না। নজরুল ছিল আমাদের আঙিনায়। মার্কেজের উল্লিখিত গ্রন্থের গ্রহণযোগ্য বাংলা অনুবাদ আমরা পেয়েছি একুশ শতকে এসে। নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা কতদূর? অবশ্য জহির রায়হান এর ‘স্টপ জেনসাইড’ (Stop Genocide) একটি ভিন্ন, কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আত্মপ্রকাশ ছিল। সাহিত্য থেকে পরিবর্ধিত চলচ্চিত্র সাহিত্যের রূপান্তর (Adaptation) হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। হিন্দি ‘দো বিঘা জমিন’ (১৯৫৩) যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র রূপান্তর। কিন্তু তারপর? কিছুকাল পরে আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৯)-এর ইংরেজি অনুবাদ কোথায়? বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য সাহিত্যিক অনুবাদ প্রয়োজন।

 

উল্লিখিত সময়ে ঘটে যাওয়া পশ্চিম ও পুবের দু-একটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে সংস্কৃতি ও অনুবাদের সংযোগ দেখার চেষ্টা করি। ১৯৭০ সাল। ইতালির আদ্রিয়ানো কেলেনতানো একটি গান প্রকাশ করলেন। গানের নাম প্রিসেনকলিনেনসিনাইনসিউসল (Prisencolinensinainciusol)। ডেভিডের গ্রন্থে এই গানটিকে অনুবাদের ‘ফরেন সাউন্ডিংনেস’ (Foreign soundingness, অর্থাৎ কোনো শব্দ বিদেশি না হয়েও কীভাবে প্রকাশকে বি-দেশীয় করা যেতে পারে) বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তবে, ২০০৮ সালে আদ্রিয়ানো দ্যা নিউইয়র্কার পত্রিকায় জানিয়েছিলেন যে, এই গানটি আসলে তিনি ‘যোগাযোগের সময় অপরকে বোঝার অক্ষমতা’কে বোঝানোর জন্য লিখেছিলেন। গানের প্রায় সবগুলো শব্দই অর্থহীন। একটিও অর্থপুর্ণ শব্দ নেই। একমাত্র অর্থবোধক শব্দ ‘all right’। গানটি আজও জনপ্রিয় গানের তালিকায় শীর্ষে আছে। গানটির মূল সামাজিক অবদান ছিল অন্যরকম।

 

আসলে কেলেনতানো ইতালির সমাজকে বিদেশি আবহ দেয়ার চেষ্টা করছিলেন, যেন ইতালির মানুষ তাদের সংস্কৃতিতে আমেরিকান ইংরেজি গানের ধাক্কা সইতে পারে। বহির্সংস্কৃতির হঠাৎ আগমন যেন তাদের বেখাপ্পা না লাগে। এবার, পশ্চিম থেকে পূর্বে আসি। এদিকে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ। এ বছর গঠিত হয় ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড। এর কেন্দ্র মুক্তিযোদ্ধা আজম খান ও লাকী আকন্দ। বিটিভিতে সরাসরি প্রচারিত হল ব্যান্ডের ‘চার কলেমা সাক্ষী দেবে’ আর ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছু রইবে না রে’ গান। গানগুলোর সামাজিক অবদান আজ বিস্মৃত-প্রায়। নতুন বাংলাদেশের ‘পপ সম্রাট’ নামে খ্যাত আজম খান। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা ব্যতীত অন্য কোন উদ্যোগ যেমন, গবেষণামূলক প্রবন্ধ আছে কিনা, যার উপর নির্ভর করা যেতে পারে, তা খুঁজে দেখা দরকার। কারণ যে প্রজন্মের মাঝে আজম জীবিত, সেই প্রজন্ম চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে যাবে আজমের প্রভাব সম্পর্কে জানার সুযোগ।

 

খুব সম্প্রতি একটি গুরুত্বপুর্ণ বইয়ে আজমের অবদান সম্পর্কে জানা গেছে। লিখেছেন মাকসুদুল হক। বইয়ের নাম বাংলাদেশের রকগাথা: আজম খানের উত্তরাধিকার (২০২০)। মজার ব্যাপার হল, এর ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন তানভীর হোসেন। বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদের ঝুড়ি যেখানে ভারহীন ওজনে পরিণত হয়, সেখানে সংগীত বিষয়ক গ্রন্থের অনুবাদ অবশ্যই প্রশংসনীয়।

সংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর সূত্রগুলো। সেখান থেকে সাহিত্যিক অনুবাদের গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।

এখানে আরও একটি ব্যাপার লক্ষ্য করতেই হবে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে কেলেনতানো যেভাবে ইতালির দর্শক-শ্রোতাকে তৈরি করতে চেয়েছিলেন, আজম খানের ভূমিকার সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য আছে কিনা। প্রথমত, একেবারেই নেই। ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে একাত্ম হওয়া আজম খান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুকান্তের কবিতায় সুর দিয়ে গণজাগরণের গান গেয়েছেন। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি থেকে জানা যায় এই গান সম্পর্কে। ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’। আজম খানের সেই বাঙালি ঢঙের সুর সম্পুর্ণ পাল্টে গেল স্বাধীন বাংলাদেশে। আগ্রহী পাঠক ‘আলাল ও দুলাল’ গানের ভিডিও দেখে গানটি শুনতে পারেন। তখন লক্ষ্য করে দেখবেন, রক গানের আদলে আলাল ও দুলালের বর্ণনা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু আলাল ও দুলাল লুঙ্গিপরিহিত হাজি জানের তাড়া খেয়ে ছুটছে বাংলার মাঠে-ঘাটে। কানে রক-তাল আর রক-সুর, আর চোখে চিরপরিচিত বাংলার গ্রামে আলাল-দুলালের দৌড়। বড্ড বেখাপ্পা লাগতে পারে আজ। অথচ এই মিশ্রণটাই জিইয়ে রেখেছিল সদ্যবিজয়ী-স্বজনহারা-যুদ্ধাবশেষের মানুষকে; তাদের প্রাণে বিনোদনরূপে আনন্দের দমকা হাওয়ার জোগান দিয়ে।

 

আবার, তাঁর ‘রেল লাইনের বস্তিতে’ (১৯৭৪-১৯৭৫) গানের ‘হায় বাংলাদেশ’ কতটা হাহাকার বহন করে, তা আজও অনুসন্ধানের প্রয়াস দেখা যায় না। স্পষ্টতই, ইটালিতে রক যেভাবে প্রবেশ করবে, একই সময়ে হলেও বাংলায় সেভাবে অনুপ্রবেশ ঘটবে না। কারণ ঘটনার নিয়ামক আলাদা। বাংলায় রকের হাওয়া এসেছিল আরও আগেই। তবু, এই মিশ্রণগুলো থেকেই আমাদের নির্ণয় করতে শিখতে হবে সংস্কৃতি-মিশ্রণের গতিপ্রকৃতি কোন পথে যাবে। সংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর সূত্রগুলো। সেখান থেকে সাহিত্যিক অনুবাদের গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। আমরা ভুলে যাই, যে কোনো বিদ্যা অধ্যয়নের উপাদান সংস্কৃতিতেই নিহিত আছে। তাই সংস্কৃতির উপাদান হোক বাংলা সাহিত্যিক অনুবাদ অধ্যয়নের তত্ত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্র।

 

সাহিত্যে চোখ ফিরাই। ডগলাসের সমকালীন ১৯৭৭ সালের বাংলাদেশ। অকৃতজ্ঞ বাঙালির মেরুদণ্ডহীন বন্ধ্যা সময়ের যাত্রা। সৌভাগ্যবশত অন্ধকারের ভেতর এক চিলতে আলো পড়েছিল সাহিত্যের জগতে। এই বছরই কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীনতা পদক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এই বছরের একুশে পদকধারী সাহিত্যিক হলেন শামসুর রাহমান। বাংলাদেশ তখন মাত্র স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে এমন সাহিত্যিকদের, যাঁদের ভেতর রয়েছে বৈশ্বিক হয়ে উঠার তীব্র শক্তি। স্বীকৃতি আমরা দিতে পেরেছি, কিন্তু জল সেঁচে তুলে আনতে পারিনি ঝিনুক ভেঙে তাঁদের জ্বলজ্বলে মুক্তোকে। “বেঁধে রাখে যেমন ঝিনুক খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ”। এ আমাদের ভালবাসার ধরন।

 

রুদ্র চিনেছিলেন এই ধরনকে। কিন্তু আমাদের সামগ্রিকভাবে এও উপলব্ধি করতে হবে যে, এই ধরন দিয়ে আজকালকার বৈশ্বিক গ্রামে (Global village) “সুখে শান্তিতে বসবাস” করা যায় না। অজ্ঞাতে আগ্রাসনের ভয় আছে। ভুলভাবে উপস্থাপনের আশংকা আছে। মুক্তো আছে, এইই জাহির করে বৈশ্বিক গ্রামে নিজের অবস্থান জানাতে হবে। প্রকাশ করতে হবে যে, আমরা ফেলনা নই। রবি ঠাকুরের বিচ্ছুরণকে শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু এক রবিকে দেখিয়ে আর কতদিন! ব্যাপারটাকে গণতান্ত্রিক করে তোলার প্রয়োজন আছে। কারণ আজ অপরকে শ্রদ্ধা করার যুগ। শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের স্বাধীনতা-পিয়াসীর কাছে পৌঁছানোর আবশ্যকতা আছে।

 

আজ বিশ্বসাহিত্যের ‘ধ্রুপদী সাহিত্য’ সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। ‘যে কোনো প্রান্তে পৌঁছানোর যোগ্যতা আছে যার’ তাকেই বিশ্বসাহিত্যের ভেতর অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতায় পরিণত হয়েছে আজকের বিশ্বসাহিত্যচর্চা। যে জাতীয় সাহিত্য বিশ্বের যে কোন সীমান্তের মানবসত্তার জন্য সত্য হবে, তাই বিশ্বসাহিত্য। তবে শামসুর রাহমান নন কেন? শামসুর রাহমান এর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হয়ে স্বাধীনতা’ জাতীয় হয়েই রয়ে গেছে। আমরা তাঁকে বৈশ্বিক করে তুলতে পারিনি। অথচ বিশ্বের যে কোনো জাতি, ব্যক্তির জন্য কবিতাটির গুরুত্ব সর্বাংশে তাৎপর্যপূর্ণ।

 

তবে শামসুর রাহমানের তুলনায় নজরুল বেশ এগিয়ে আছেন। পারস্য এলাকায় আজও তাঁর পরিচিতি বহুদূর বিস্তৃত। পাকিস্তান আমল থেকেই নজরুলের কবিতা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে এসেছে। ১৯৫৫ সালে মিজানুর রহমানের অনুবাদ হয়েছে বলে জানা যায়। ১৯৫৭ সালে হুমায়ুন কবির এর সম্পাদনায় গ্রিন এন্ড গোল্ড (Green and Gold) এ সর্বহারা থেকে কবিতা অনূদিত হয়ে সংকলিত হয় বলেও তথ্য পাওয়া যায়। এরপর নজরুলকে নিয়ে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কবীর চৌধুরী, সাজেদ কামালের অনুবাদ এখনও খুঁজলে পাওয়া যায়। নজরুলকে নিয়ে সংকট তারপরও তৈরি হয়েছে।

 

১৯৯৭ সালে উইলিয়াম র‍্যাডিস (William Radice) নজরুলকে মুসলিম ঘরানার কবি বলে আখ্যায়িত করে বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে সবার দৃষ্টি থেকে নজরুলকে একপেশে করে সরিয়ে দিলেন। সোয়াস (SOAS) এর মত বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কেউ যদি নজরুলকে এভাবেই পরিচয় করিয়ে দেন, তবে বিশ্ব একেই সত্য মানবে। সৌভাগ্যবশত, তখন (১৯৯৭) এই বক্তব্য বিরোধিতা করে প্রতিবাদ করার মতো আওয়াজ তৈরি হয়ে গিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের মতো কেউ ছিলেন বিশ্বে তর্কের জায়াগায় স্বপক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ করার জন্য।

 

পরবর্তী সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রীতি কুমার মিত্রের হাতে নজরুলকে নিয়ে খুব গুরত্বপূর্ণ একটি অনুসন্ধান The Dissent of Nazrul Islam (Poetry and History) (২০০৯) সম্পন্ন হয়। বলা যেতে পারে যে, নজরুলকে বিশ্বে ভুল-পাঠ করার সম্ভাবনাকে সরিয়ে নিজেদের ঘাড়ে নজরুলকে উপস্থাপনের দায়িত্ব নেয়ার মত একটি ব্যাপার ঘটেছে। ফলে, নজরুলের ক্ষেত্রে এখন প্রশ্ন কেবল ‘অনুবাদ হওয়া’ নয়; বরং দাবি, কীভাবে নজরুল যে কোন ক্ষুদ্র বা বৃহত্তর জাতির জন্য পাঠ্য হয়ে উঠেন তা অনুসন্ধান করে বিশ্বে উপস্থাপন করা।

 

আমরা কেন আজ বিশ্বসাহিত্যের জায়গায় দুর্বল? যেকোন যুদ্ধে একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। এক. বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে নির্মূল করা। দুই. গ্রন্থাগারকে পুড়িয়ে ফেলা। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান এই দুটি বিষয়কেই নিশ্চিত করেছিল। ১৪ ডিসেম্বরে সৃষ্ট শূন্যতা নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল পঙ্গু হয়ে ছিল। সাহিত্যচর্চা একজন ব্যক্তিকে বুদ্ধিজীবী হওয়ার পথ দেখায়। মূলত সাহিত্যের সঙ্গে এটাই হল সমাজের দৃঢ় সম্পর্ক।

 

বুদ্ধিজীবীহীন সমাজ আলোর পথে এগোতে পারে না। দীর্ঘ সময় লাগে নতুন বুদ্ধিজীবী সমাজ তৈরি হতে। একজন বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী হয়ে জন্মান না। তাঁকে ধীরে ধীরে বুদ্ধিজীবী হতে হয়। সাহিত্যচর্চা তাঁর পথ মসৃণ কর তোলে। একজন জহির রায়হান কিংবা একজন মুনীর চৌধুরী স্বাধীনতার পরের ২৫ বছরও যদি বেঁচে থাকতেন, আজ বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপথ বিশ্বে অনেক শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারত। তবু আশা বাঁধি। বিশ্বাস করি, অচিরেই বাঙালির ‘কানের মাছ’ উদ্ঘাটিত হবে। কারণ প্রত্যাশিত বুদ্ধিজীবী সমাজ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। তবু আরও বৃহত্তর কলেবরের বুদ্ধিজীবী সমাজ প্রয়োজন। তরুণ-তরুণীদের তৈরি করতে হবে। উন্মোচিত করতে হবে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতি-সাহিত্য-অনুবাদ এর মধ্যেকার সূত্রগুলো। দাঁড় করাতে হবে সংস্কৃতি-উৎসারিত অনুবাদের তত্ত্বগুলো। আকাশপানে তাকিয়ে মুক্ত হওয়ার প্রত্যয় নিতে হবে। উদ্যোগ নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাস্তবায়নের পর আলোচনা-পর্যালোচনা করতে হবে। ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারা’ জয়ধ্বজা উড়িয়ে দিতে হবে বিশ্বাকাশে।

(চলবে)

 

পড়ুন ।। পর্ব এক

সাহিত্যিক অনুবাদ অধ্যয়ন এবং একটি সম্ভাবনা : পর্ব এক

4 মন্তব্যসমূহ

  1. কি অসাধারণ সূচনা। যথার্থভাবেই প্রাবন্ধিক সাজিয়েছেন তাঁর যুক্তি-পরম্পরা। ‘ সংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর সূত্রগুলো। ’-একথাগুলোই প্রমানিত।

  2. নজরুলকে বিশ্বে ভুল-পাঠ করার সম্ভাবনাকে (আশঙ্কাকে?) সরিয়ে নিজেদের ঘাড়ে নজরুলকে উপস্থাপনের.. উঠে আর ওঠের পার্থক্য, ওঠা আর উঠার প্রয়োগে সামান্য ঝামেলা থাকতে পারে। অসামান্য নির্মাণ। মনে হলো, তিয়াশা চাকমা বুদ্ধিবৃত্তি ও চর্চার বিস্তৃত পথে হাঁটছেন। শুভ কামনা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here