কোচপাড়ায় সারাদিন

সীমান্ত লাগোয়া গ্রামটির নাম নওকুচি। শেরপুরের উত্তর জনপদ ঝিনাইগাতির রাংটিয়া বিট। এখানেও কোচ বসতি। কত ঘর আর? আশি পঁচাশি ঘর হবে হয়তোবা। উদোম গায়ে রবীন্দ্র কোচ মন্দিরের পাশের জমিন  নিড়িয়ে দিচ্ছি — কাছে যেতেই উঠে দাঁড়ালেন। গলায় তুলসীমালা। ছোট করে হাঁটুর উপর গুটানো ধুতি। জিজ্ঞেস করতেই বললেন এটি খাং খাংয়ি মন্দির আর রাস্তার পাশেরটি সোনারয় ও রূপারয় মন্দির।

 

ছোট্ট ঘরের মত চৌচালা টিনের ঘর — কোচদের ঠাকুর ঘর; আরাধনার চাতাল। একদিকে দেবী হিরণী অন্যপাশে দেবতা দ্বয়ের থান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লৌকিক দেবী ও দেবতা। জ্যৈষ্ঠ মাসে পূজা হয়। কোচিনীরা কেউ কেউ শনিবার মঙ্গলবারে ফুল জল দেয় দেবীর থানে। নইলে সারা বছর হাট করে খোলাই থাকে ঠাকুর ঘর।

 

জ্যৈষ্ঠ জাঁকজমকে পুজো হয়। কিংবা বলা চলে পূজার্চনা হতো। তখন বিত্ত ছিল, চিত্ত ছিল। গাঁওবুড়োদের কর্তৃত্ব নেতৃত্ব ছিল। এখন তেমন জৌলুস নেই। জমি নেই। ফসলের বাড় বাড়ন্ত নেই। তবে আনুষ্ঠানিকতা রয়ে গেছে। জ্যৈষ্ঠে এখন বলি হয় — পাঁঠা কবুতর — মানতের; সাংসারিক আয় উন্নতি আর আলাই বালাই মাড়ি-মড়কের গ্রাম ছেড়ে যাবার মানত। যার মানত সে-ই পুজা আর্চনায় পৌরহিত্য করেন। শ্রদ্ধায় গলায় কালোপাড় ধুতি জড়িয়ে মাটিতে কপাল ঠকিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন। ফুল বেলপাতা আর ফসলি জমির ধানের ছরা কিংবা মৌসুমী ফল কিংবা উঠানে সদ্য বেড়ে ওঠা লাউ কুমড়া দেবী খাং খাংয়ির উদ্দেশে নিবেদন করা। সকলের সাথে জড়িয়ে সকলকে নিয়ে এই আরাধনা। যিনি মানত করেন তিনি এই পুজার লাঙলের হাল ধরেন মাত্র।

 

রবীন্দ্র কোচ জানালেন নির্দিষ্ট কোন পুরোহিত নেই। নেই কোন নির্দিষ্ট বিধি বা পদ্ধতি। শুধু শ্রদ্ধা অহৈতকি ভক্তি আর সারল্য মন নিয়ে দেবীর থানে দেবতার থানে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা। রবীন্দ্রকোচেরা যাপনে সংস্কৃতিতে বংশ পরম্পরা কোচ ধর্মাশ্রিত। রাষ্ট্রিক পরিচয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি। দাবী দাওয়া সুযোগ সুবিধার কোটাধিকরে আরো অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী মিলে আদিবাসী। লৌকিক পারলৌলিক মঙ্গলার্থে সনাতন হিন্দুধর্মে আস্থা রেখে রবীন্দ্র কোচদের জীবন চলছে।

 

হাল আামলে যুক্ত হয়েছে ইস্কনের প্রভাব। কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের বৈদিক আচার বিচারের ষোল নাম বত্রিশ অক্ষরের জীবন। গলায় তুলসির কণ্ঠি, নাকে কপালে তিলক কেটে ঝোলানো জপমালা হাতে নিয়ে ভক্তিবাদের জীবন। সপাক রান্না করে ইষ্টদেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করেই তবে নিজের ভুরিভোজন।

 

এই মন্দিরের প্রসারিত তল্লাটে পাঁচ পাঁচটি বট — কোনটি প্রবীণ, কোনটি সতেজ যুবক — ছড়াচ্ছে ডালপালা চারদিকে। এক অখণ্ড নিরবতা এখানে। রোদ আগলে বটের ছোট ছোট পাতা বিছিয়ে দিয়েছে পরম মমতায় ছায়ার আঁচল। লোকমুখে পঞ্চবটি নামেই আজকাল স্থানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টেরর আওতাধীন এই চাতাল। বটের শক্ত চোয়াল আর পেশীবহুল হাতের মতো প্রসারিত ডাল এক দিকে নীলাকাশে মেলে দিয়েছে, অন্যদিকে মাটির গভীরে জড়িয়েছে একের শিকড়ের সাথে অন্যের শিকড় — পরস্পরে দূরত্ব রয়ে গেলেও মাটির অনেক নিচে গভীরে গভীর সম্পর্ক।

 

এই পঞ্চবটির চাতালে বটের প্রসারিত হাত আর ঝুরিনামা  মাটির গভীরে ঢুকে পড়া রশির মতো ঝুরি দেখতে দেখতে একটি কথাই মাথার ভেতর ঘুরে ফিরে আসছে। পা-ফেলা দূরত্বে এই রবীন্দ্র কোচ কিংবা প্রাঞ্জল সাংমা অথবা অনাদি সরকারদের বসত। আমার পড়শি। পড়শি আমি একজন।

 

পাশে পাশি বেড়ে ওঠা। পাশপাশি থানা। অথচ কী অবাক কাণ্ড! কত কমই না জানি আমি তাদের সম্পর্কে।  আমার বাঙালি জাতিসত্তার ফিতে দিয়ে মাপতে গিয়ে এদেরকে কখনো সংজ্ঞায়িত করেছি আদিবাসী, কখনো জাতিসদৃশ ব্যাসবাক্য করে সমস্তপদে করেছি ‘উপজাতি’ বলে, আবার কখনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দাগকাটা লক্ষণবৃত্তে ফেলে দিয়েছি। প্রত্যেকে যে একরঙে নয় এই বোধ আমাদের জারিত হলো কই? ভিন্নতার সৌন্দর্য চোখ মেলে আর দেখবার ফুসরত পেলাম না। নাম্বার ক্রিয়েটস পাওয়ার বলে একটা কথা তো আছেই সমাজে। তার জোরে একই ছাঁচে সবাইকে গড়বার কসরত।

 

বড্ড গোলমেলে একটি অবস্থা। বাঙালির তত্ত্ববিশ্বে উচ্চকোটির হিন্দুদের ভাব চেতনা যতটুকু জায়গা করে নিয়েছে ততটুকু এদেশে সংখ্যা গরিষ্ঠে মানুষের ভাব-ভাবনার বিশ্বাস ততটুকু নেই। যেমন নেই প্রান্তিক ভূমিজ রবীন্দ্র কোচদের সহ অপরাপর গোটা পঞ্চাশ জাতিসত্তার উপস্থিতি।

 

বরং একে অপরকে খারিজ করে দেবার মহিমাহরণ করে দেবার অবদমিত করে দেবার প্রবণতা স্বাধীনতার পর থেকেই বিদ্যমান। জাতিসত্তার ধ্যান ধারণা ও তার নির্মাণে উচ্চকোটির ধ্যান ধারণাকে এক ও একমাত্র চিন্তা আর মুক্তির ধারণা চাপিয়ে দেবার তৎপরতা সমাজ-কাঠামো নির্মাণে কোন ইতিবাচক ভূমিকা রাখেনি। বরং ভেদ বিভেদে অবজ্ঞা কেন্দ্রীভূত চরিত্র হবার কারনে অপরকে ফেলে দেয় প্রান্তিকের প্রান্তিকে।

 

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর খরচা হয়ে গেলে তবু এই ভূখণ্ডের অপরতার জনজাতির অনন্যতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার আকুলতাকে একটি সাধারণ সংজ্ঞায় চিহ্নিত করতে পারলাম না। কখনো বাঙালি হয়ে যাবার তাড়না কখন অস্তিত্ব অস্বীকারের রাজনীতির গণিতের মারপ্যাচে বারবার পাল্টিয়েছে সংজ্ঞার পর সংজ্ঞা। স্বস্তি আনেনি; বেড়েছে অবিশ্বাস আর বিভ্রান্তি।

 

এতে করে মানুষের সাথে মানুষের যে, পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি সেটিই হয়ে গেছে নড়বড়ে। আগাম নিজের শ্রেষ্ঠত্ব খুঁটিপুঁতে অপরকে আমার বিপরীতের প্যার্টানে ফেলে দিলেও তো আর ব্যক্তি হিসেবে মানুষের অনন্যতা চোখে পড়ে না। গড়ে উঠে না একে অপরের উপর নির্ভর করে গড়ে তোলা একটি গণতান্ত্রিক সমাজ। প্রত্যকে অনন্য ও একে অপরের উপর নির্ভরশীল ধ্যানধারণার ভিত্তি গড়তে না পারলে প্রবৃদ্ধি সূচক উর্ধ্বমুখী হলেও মনুষত্ব্যের বিকাশ হয় না। মানুষকে মানুষের অখণ্ড পরিচয়ে পরিচিত না করে মানুষের খণ্ড পরিচয়ই প্রাধান্য পায়। অপরকে ভাবি ‘সেমি বিল্ড’ — শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এমনই। জাতিবাদের ধারণা এমনই অপরকে সেমিবিল্ড না ভাবলে তার চলে না। অপরের মুক্তি দাওয়াই তার কোচরে তার ভাবাদর্শ একমাত্র নিশানা।

 

অপরের ভেতর অন্যনতা খোঁজা ও তার বিকশিত করার পরিসর নির্মাণের ভেতর দিয়েই একটি সমাজ বিনির্ণত হতে পারে। সংখ্যা সেখানে একটি গণণামূলক সংখ্যা মাত্র। সাপেক্ষেরর প্রেক্ষিতে নিছক সংখ্যামাত্র। সেটি কোন ভাবেই কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়।  তবু বাংলাদেশের রাজনৈতিকতায় সংখ্যা মোটাদাগে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু ভাগে বিভক্ত।

 

বুড়িমাঠের পূর দিকে কালী মন্দির — শ্যামা কালী মন্দির; নিত্য পুজিত হন না তবে বাৎসরিক পুজা হয় তন্ত্রমতে পুরোহিত দর্পণের পুজাবিধি অনুসারে। ব্রাহ্মণেরর পৌরহিত্যে শ্যামা পূজিতা।রমানত আছে। বলি আছে। অমাবস্যা তিথি অনুসারে পুষ্পার্ঘ্য প্রদান করে আসছে রবীন্দ্র কোচেরা।

 

পাশেই শ্মশান। মৃতের উবু বা চিৎ করে শুয়ে মুখাগ্নি করেই দাহ সম্পন্ন হয়। আছে তের দিনে শ্রাদ্ধ আর চৌদ্দ দিনে শুদ্ধি করে পারিবারিক স্বাভাবিক জীবনে ফেরা রীতি এখন চললেও; রবীন্দ্র কোচেরা বংশ পরম্পরায় দাহ নয় গোর দেয়া বিধিই ছিল থান থেকে একটু দূরে বনের কোন উন্মুখ চাতালে। সে বিধান উঠে গেছে বহুকাল হলো। তখন এ চাতাল ছিল  সকলের। গোষ্ঠী সম্পদ।

 

এই বন আর কোচদের সমূহ সম্পদ নয় এখন। সরকারের। ফরেস্ট ডির্পাটমেন্টের প্রযত্নে। বিট কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া চাষাবাদ করা দূরে থাক নিজের উঠানে পুঁই গাছের মাচাও বানাতে পারে না। কারো কারো রেকর্ড মূলে মালিকানা থাকলেও অধিকাংশ জমিতে — হোক গাছ গাছালি ঘেরা বন বা আবাদি জমিন — কোচ শিকড়বিহীন গেরস্থ। যে জমি একদা সকলের সে জমিতেই সে এখন অনাবাসী বহিরাগত উপেন।

 

বুড়িমাঠের এক প্রান্তে উঁচু টঙ ঘরে বসে বসে দেখছিলাম প্রশস্ত সবুজ প্রান্তর। এখানেই ফুটবল খেলা জমে মৌসুমে। কালী পুজা উপলক্ষ্যে এক সময় এই মাঠেই  দিনব্যাপী মেলা বসলেও এখন আর সেই জাঁকজমক নেই। দুই একটি খেলনার দোকান দায় সাড়াগোছের এখন থাকে বটে কোন উৎসব উৎসব ভাব নেই — নেহাতই একটি ধর্মীয় উৎসব। নির্দিষ্টি নিয়মে বাঁধা। প্রাণহীন।

 

এই নওকুচি গ্রামে পঁচাশি ঘর কোচ পরিবার আর রাংটিয়ায় শতাধিক ঘর। মূলত কোচদের এখন কৃষিকেন্দ্রিক জীবন। বাড়ির আশেপাশে গেরস্থালি শাকসবজি আর ধান — কোনটা এক ফসলি আবার কোনটা দুই ফসলি। সকলের যে নিজস্ব জমি আছে তা নয় — ছিল না যে তাও নয়; কখন ঋণ বা মহাজনের দাদনের বা টাকার ব্যবসায়ি এনজিওদের খপ্পরে পড়ে জমি ছাড়তে হয়েছে।

 

এখন বাঙালিরা যে জমি লিজ নিয়েছে সেখানে মজুর খাটে। অথবা অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে । কেউ আদিবাসী কোটায় ডিফেন্সে চাকরি করে। কেউ চায়ের দোকানদার। মুদি দোকানের কর্মচারি । আশির দশকের দিকে নালিতাবাড়ি বাজারের সম্পন্ন মুদি দোকানে কোচ বা হদি বা হাজং সম্প্রদায়ের কিশোর যুবকদের পেটে ভাতে কাজ করতে দেখেছি। বিশ্বাসী ও পরিশ্রমী কোচ হদি বা বর্মণ রাজবংশীদের প্রতি ব্যবসায়ীদের নজর ছিল। দোকানে অন্য কর্মচারির তুলনায় এদের মতো আলাদা দৃষ্টি ছিল। পেটেভাতেই যথেষ্ট। আালাদা করে টাকা পয়সা দিতে হচ্ছে না। মাগনা খাটিয়ে নিতে পারছে। তারপরও রয়েছে ডালু বা বানাই সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা অথবা বাল্য বিধবা কোন নারী সম্পন্ন হিন্দুর বাড়িতে ফাই ফরমাশ খাটার জন্য বেগার খাটত।

 

সারা বছর ধরে ব্যবসায়ির দোকানে থাকলেও ব্যবসায়িক বুদ্ধি বা ম্যারপ্যাচ ছিল না বলে জীবনভর বেগার বা পেটেভাতে বা যৎসামান্য বেতনে খেটেও ব্যবসায়ী হতে পারেনি। ফিরে যেতে হয়েছে নিজের কাঁদামাটি জমির কাছে। এই সময়ে কাউকে দেখেছি দেশান্তরি হতে।

 

আশির দশকের পুরাটা সময় ব্যবসায়ির দোকানে পেটে ভাতে থেকেও সুশান্ত হাজং খুব একটা ব্যবসায়িক ম্যারপ্যাঁচ শিখতে পারেনি বলে পরবর্তী সময়ে নিজে দোকানের পসরা বসালেও খুব একটা কুলিয়ে উঠতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অদিবাসীদের সক্ষমতা ও সচেতনাতা বৃদ্ধির জন্য জিও-এনজিওদের কিছু ভূমিকা লক্ষ করা যায়। এখানে নানা ওয়ার্কশপ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হাতে কলমে যুবকদের কাজ শেখার পরিসর সৃষ্টি করে দিচ্ছে আইইডি।

 

‘আদিবাসীরা সাধারণত অন্যের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রর নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়।’ — কথা প্রসঙ্গে বললেন সুমন্ত বর্মণ। মূল সমাজে তারা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাক সংস্কৃতির মানুষ। সরাসরি বাজারের সাথে সম্পৃক্ত থাকলে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে লুকিয়ে থাকা অভ্যাসটা দূর করতে সক্ষম হয় আইইডি সেই ভূমিকাই এখানে পালন করছেন বলে জানালেন তিনি।

 

শিক্ষার হারও কম। আছে ঝরে পড়া। দারিদ্র। বেকারত্ব। বাল্যবিবাহ। জানালেন মিঠুন কোচ। সারল্যমাখা আভা মিঠুনের চোখে মুখে। বেকার। গ্রাজুয়েশন করলেও চাকরি বাকরি হয়নি। মিঠুন চমৎকার ছবি আঁকে। গাছ গাছালি পাখপাখালির ভেতর বেড়ে ওঠা মিঠুনের মন মননে নানা রঙ আর রেখা খেলা করে।

 

খড়িমাটি দিয়ে আঁকতে আঁকতে মিঠুন কোচ আঁকিয়ে। ছবি আঁকায় ওর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। জেলা শহরে একটি আঁকার স্কুলে বাচ্চাদের আর্ট শিক্ষায় সপ্তাহে দুইদিন। কার্পেটে  বাচ্চাদের সাথে গোল হয়ে বসে মাথা নিচু করে দেখাচ্ছে শাপলা ফুলের গড়ন। অথবা কোন গ্রামের দৃশ্য বা পাল তোলা নৌকা। আমার ছেলের মিঠুনের ছাত্র। অবাক হয়ে দেখি আর্ট স্কুলের শিক্ষক মিঠুন সাইফল মোবারক ঘরভরা বাচ্চাদের হাত ধরে শেখাচ্ছে  রেখার বিন্যাস পেস্টাল বা জল রঙের ব্যবহার — কোন রঙের সাথে কোন রঙ মেশালে কোন রঙের আদল পায়।

 

নওকুচিতে কোন প্রাইমারি স্কুল নেই। যেতে হয় রাংটিয়ায়। অনেক খানি পথ। অনেকের স্কুলে যাবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের আগ্রহ কম। পরিবারের ফুট-ফরমায়েশে বাচ্চাদের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। মিঠুন “দারিদ্রের সাথে সচেতনার অভাবও আছে” বলতে বলতে জানালো কারিতাসের তিনটি স্কুল এবং SIL এনজিও ২টি স্কুল আছে। কোচ পরিবার বাচ্চাদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনাগ্রহ রয়েছে।” নকশী সীমন্ত ফাড়ীর দিকে যেতেই হাতের ডানে SIL International Bangladesh অফিস। সামনে ছোট সাইনে বোর্ডে Language, Education and Development SIL International Bangladesh লেখা পড়তে পড়তে আমরা যখন পঞ্চবটির দিকে যাচ্ছিলাম তখনই মনে পড়ল।

 

আমি যে থানা শহরে বড় হয়েছি সেখানে মঙ্গল ও শুক্রবার হাট বসত। মঙ্গলের হাটকে বলত বড়হাট বার আর শুক্রবারের হাটকে ছোটহাট বার। স্থানিকে যেমন হাটের বৈশিষ্ট্য থাকে তেমনই ছিল আমার থানা শহরের হাট। গমগম করতো। কোন কিছু হারিয়ে গেলে — হোক সে বাচ্চা ছেলেময়ে বা গরু ছাগল — ফাঁকা বিস্কুটের টিন পিটিয়ে খবরটি রাষ্ট্র করতে হতো। হাঁটুরে মানুষের চাপে দ্রুত হাটা যেতো না। মানুষের চলার গতিই আপনাকেই আপনার জায়গায় পৌছে দিত। আপনার পা নয়।

 

পাতিল হাটির এপাশটায় ভিড়ের চাপ কম। গলির একপাশে সারি সারি ভাতের দোকান। সামনের টেবিলে চালুন দিয়ে নানা খাবার ঢেকে রেখেছে। একটু ফাঁক করা। কড়া হলুদ মশলার গন্ধ আর মাছের ঝোলের উপর ভাসা তেলের মৌমাতে জিভে জল এসে যায়। এই গলিতেই বিকেলের দিকে মহিষের ঘন দুধ মাটির পাত্রে মুখটি কচু পাতা বা কলাপাতা দিয়ে বেঁধে সামনে রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুধ বিক্রি করতেন কোচ বা হদি বা কোন বানাই সম্প্রদায়ের লোক। থকথক করতো মহিষের দুধ।

 

এ ছাড়াও হাটে লাল শুকনা মরিচ আদা রশুন হলুদ কাওয়নের চালের পসরা নিয়ে আসতে রবীন্দ্র কোচের মতো লোকেরা। স্থানিকে সবাই এই পাহাড়ী লাল মরিচের জন্য মুখিয়ে থাকতেন। তরকারি ঝাল আর রঙের দিক থেকে এই মরিচ ছাড়া অন্য মরিচ সাংসারিক মানুষের পছন্দ নয়। তেমনি হলুদ। অনাহাটবারে বাবা হলুদ কিনতে চাইতেন না। রঙ মেশানো থাকত হলুদে বাজারের দোকনাগুলিতে। বাবার মতো অনেককে দেখছি কোচ বা হদিদের হলুদের দিকে পক্ষপাত। দাম যাই হোক স্বাদে ও রঙে এই পাহাড়ি হলুদই সেরা। চৈত্রের শেষ থেকে শুরু করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসব্যাপী মরিচ হলুদ বিক্রি হতো হাটে।

 

সেদিন এখন পাল্টে গেছে। বাড়ির গিন্নিদেরও হলুদ মরিচ কিনে শুকিয়ে মিলে ভাঙা; তারপর রোদে দেয়া যথাযথভাবে সংরক্ষণের কসরত চেয়ে কর্পোরেটদের প্যাকট হলুদ মরিচ মশলা অনেক বেশি আশ্রয়ী ও ঝামেলা মুক্ত। ছোট সংসার এতো হুজ্জকে সামলায় বাবা! ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঝুলানোই থাকে। কিনে আনো ছিড়ো ব্যবহার করো  আর ছুঁড়ে ফেলো প্লাস্টিক প্যাকেট গোছের সংসার আমাদের।

 

সারা গাছে লাল ঝুমকো জবা ঝুলে আছে। বৈশাখের ঝকমক রোদে আরো লাল হয়ে বাতাসে একটু একটু করে কাঁপছে ঝুমকো জবা। উঠানের এক পাশে পাল্লা করে রেখেছে ক্ষেত থেকে সদ্য কেটে আনা ধানের আঁটি। অন্যপাশে টিউকল। মাটি থেকে উঁচু একটা ঢিপিতে বড় একটা গাজী ট্যাংক বসানো। শ্যাঁওলা পড়ে আছে।

 

এটিই জাগেন্দ্র কোচের বাড়ি। রাংটিয়া বিটের কোচ সম্প্রদায়ের গাঁওবুড়া। উজ্জ্বল তামাটে গায়ের রঙের ছোট খাটো মানুষ। প্রাচীন প্রথার ধারাবাহিকতায় তিনি মণ্ডল। তেমন প্রভাব প্রতিপত্তি না থাকলেও জাগেন্দ্র কোচকে তারা মান্যগণ্য করে।

 

সামাজিক নানা অনুষ্ঠান মায় বিয়ে মৃত্যু বা বাৎসরিক পূজাঅর্চনা অথবা পরিবারের ভালো মন্দের সাথে কোচেরা এই মণ্ডলের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। বুদ্ধি পরামর্শ কিংবা নানা দায় ও কর্তব্যের কথা তিনি ঠিক করে দেন। তাঁর উঠানে ঢুকবার পথেই একটা খোলা ঘরে পড়ে আছে পরিত্যক্ত তাঁত। সময়ের দাপটে ভেঙেচুরে গেছে  শানা, দক্তি, নরাজ এর মতো তাঁতের প্রধান অঙ্গগুলো। বছর দশেক আগেও খটখটা খটের উচ্চকিত সশব্দে মুখরিত থাকত কোচপাড়া। সুতার পুটলি মুখে নিয়ে টানা ও পোড়েনের ভেতর দিয়ে কাপড় বুনতে বুনতে ছুটত মাকু। মাকু খটখটি তাঁতের প্রধান হাতিয়ার। মাকু ছাড়া বুনন হয় না। তাঁতযন্ত্রে ঝোলানো হাতল টেনে টেনে সুতা জড়ানো মাকু আড়াআড়ি ছুটে ছুটে কাপড় তৈরি হয়।

 

নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কোচদের আয়ের উৎস ও সক্ষমতা তৈরির জন্যই এই গাঁওবুড়ো “জাগেন্দ্র কোচের বাড়িতে ও গান্ধীগাঁও কোচবাড়িতে চিত্তরঞ্জন তাঁত ও বাঁশের তাঁত মিলিয়ে ১৫টি” স্থাপনে এগিয়ে আসেন কারিতাস, ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক আলবার্ট মানখিন।

 

তাঁতের ঘর তৈরি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজনীয় সুতার সংস্থান করেন কারিতাস। বলেন চম্পা বর্মণ। এক সময়ে কারিতাসের মাঠ কর্মকর্তা হিসাবে এই অঞ্চলে কোচ গারো বর্মণদের ভেতর কাজ করতে আসেন। এখানে গামছা লুঙ্গির সাথে সাথে কোচদের নিজস্ব পোশাক ল্যাফেন ও ওয়াকচুও তৈরি হতো। যেকোন জনজাতির পোশাকে ফুটে ওঠে তাঁর সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য। বাঙালির প্রভাব ও পাওয়ার লুমে উৎপাদিত পণ্য দাম কমের কারণে কোচদের ভেতর লুঙ্গি শার্ট প্যান্ট শাড়ি ম্যাক্সি পরার প্রবণতা বিদ্যমান।

 

পরম্পরা অভ্যাসের কারণে অনেক কোচনী ঠিক বাঙালি নারীর মতো শাড়ির কুচি দেবার অভ্যস্ততা নয়, এমনকি বুকের দিকে ঢেকে ঢাড়ের পাশ দিয়ে শাড়ীর আচঁল ছেড়ে দেবার রীতিও আয়ত্ত করতে পারেনি। শাড়ি ব্যবহার করে সেই ল্যাফেন ও ওয়াকচুর মতো করে। নতুন কেনা শাড়ি দুইভাগে কেটে ভাগ করেই পরেন। শাড়ি যে একবারেই পড়তে পারেন না তা ঠিক নয়। পাশাপাশি লাগোয়া বাসের প্রভাব বলয়ের কারণে অনেক কিছুই কোচেরা অভিযোজন করে নিয়েছেন। “স্বকীয়তা থেকে একটু একটু করে সরে গেছে পাল্টে গেছে তাদের জীবনযাত্রার ধরন।”

 

পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই আমরা এগিয়ে যাই। কাউকে এক জায়গা রাখার ভাব ভাবনা প্রকৃতির বিরুদ্ধ। কোচ গারো বানাই ডালু বাঙালি সবাই আমরা পরিবর্তনের সড়কেই আছি। তারপরও আলাদা রঙ নিয়ে আমাদের যে যাপন তা অন্যের তাপে চাপে ভাঁপে মিশে গিয়ে অন্যের রঙে রাঙিয়ে উঠব তেমনটি আমাদের প্রত্যাশিত নয়।

 

একটি নিজস্ব আঁচড় বৈচিত্র্যের সমাহার আনে। বৈচিত্র্যে ঐকতান যখন কোরাস গেয়ে উঠে তখনই মূলত মানুষের স্বস্তি। মানুষ তো একই ডাইসে ফেলা কোন পুতুল নয়। সে সকলের সাথে সম্পর্কিত হবার জীব নিয়ে হাজির। সেটি যখন বিপন্ন হয় তখনই আমরা গাড্ডায় পড়ে যাই। কথা হচ্ছিল ল্যাফেন আর ওয়াকচু নিয়ে। কোচ নারীরা পায়ের গোড়ালি থেকে বগলের সমান বা বুক পর্যন্ত যে বস্ত্রাংশটি পরে সেটিই ল্যাফেন আর ওয়াকচু এক ধরনের বর্ণিল ওড়না। প্রাত্যহিক নয় বিবাহ অনুষ্ঠানাদিতে গায়ে জড়িয়ে রাখে।

 

চম্পা বর্মণ স্থানিক সংস্কৃতির ছাপ নিয়ে যে পোশাক আশাক তাঁর উৎপাদন ও বিপণনে তিনি উচ্চকিত। ভিন্নতার স্বাদের ভেতর যে রুচি ও ঐতিহ্যের পরম্পরা বিদ্যমান তিনি সোটি চান। নিজেই গড়ে তুলেছেন ব্লু রিবন নামে একটি ফ্যাশান হাউজ। তাঁত বেশি দিন টিকেনি। উৎপাদনশীলতার গতি না থাকার কারণ যেমন ছিল তেমনি ছিল সুতার অপ্রাপ্যতা। ছিল উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ বাজারজাত করণের অভাব। পাওয়ার লুমের বিপরীতে হ্যাণ্ডলুমের যে ধরনের “দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পৃষ্ঠপোষকাতা প্রয়োজন তা ছিল না।”

 

কুটির শিল্প দাতব্যের মতো বেড়ে উঠতে পারে না। তাঁর বাজার চাই। পণ্যের বিচলন চাই। সেটি জাগেন্দ্র কোচ তৈরি করতে পারেন নি। হেরে গেছেন। বিভিন্ন আয়ের উৎসের সংস্থান না করতে পারলে একতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। যদিও তাঁর স্ত্রী রায়তি কোচ ‘একজন দক্ষ তাঁতী ছিলেন।নিজে যেমন শিখেছেন তেমনি অন্যদেরও শিখিয়েছেন’ বললেন চম্পা বর্মণ। বাজার ব্যবস্থপনা না থাকার কারণে সকল শুভ উদ্যোগ আলোর মুখ দেখতে পারে না।

প্রকৃতি থেকে যে যতদূরে সে তত ভীত সন্ত্রস্ত। কোচ বনঘেরা অরণ্যের সন্তান। নিজস্ব যাপন কৌশলেই হয়তো করোনা মোকাবিলা করার প্রতিরোধ নিজের শরীরে নিজের অজান্তেই গঠে উঠেছে।

কোচ নারী ও পুরুষের পোশাক এখন পুরোপুরি বাঙালি বাজার নির্ভর। এই উত্তর জনপদ শেরপুরের তিনটি থানায় — নালিতাবাড়ির ৪টি, শ্রীবর্দী ৪টি ও ঝিনাইগাতিতে ১৪টি গ্রাম — মোটি ২২টি গ্রামে কোচদের বিস্তার। যদিও সংখ্যা ক্রম হ্রাসমান। নারীদের পোশাক পরার কায়দা কিছুটা কোচাশ্রিত হলেও হতে পারে কিন্তু পুরুষের পোশাক পরার ধরন-ধারন বাঙালি দ্বারা শাসিত। তাকে ঘর থেকে বের হতে। সমাজের সাথে মেলামেশি করতে হয়। তাই পুরুষের প্রভাব সরাসরি।

 

রাংটিয়া ও ঘোষগাঁওতে এনজি ব্যাকড চিত্ত রঞ্জন তাঁত প্রতিষ্ঠার আগে কোচ পোশাক কিন্তু নিজস্ব ঘরনায় তৈরি করেই পরিধান করতো। ছিল বংশ পরম্পরায় নিজস্ব বুনন কৌশল। কোচদের ঘরে ঘরে যে তাঁত ছিল সেটিকে কোচ ভাষায় বলে ‘বানা’। আর বানায় কাপড় তৈরির পুরো প্রক্রিয়াকে বলে বানা সিংনি। এটি ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতি। বংশ পরম্পরায় কারিগরি জ্ঞান। প্রাত্যহিক কাপড় চোপড় সবই বানাতে তৈরি করত কোচেরা।

 

পোশাক তৈরির কাঁচামাল সুতা বাজার নির্ভর। একটা সময়ে কোচ পাড়ায় ব্যবসায়ীরা মাথায় করে পুটলি বেঁধে  নানা রঙের সুতার গুটি নিয়ে আসত। সেই সুতা ভাতের মাড়ের পাত্রে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে লাটাইয়ে পেঁচানো হয়। অনেকটা নাড়া বাঁধার মতো। একেই বলে ‘মার ছড়াইনি’।

 

অতঃপর সেই লাটাইয়ের সুতা একই সমান্তরালে পুতা ৪/৫টি লম্বালম্বি বাঁশের খুঁটির উপর আড়াআড়িভাবে জড়ানো হয়। যাকে বলা হয় সিংনি। অনেকটা বাঁশের বেড়া তৈরি করার মত। পার্থক্যশুধু মিহি ঘন বুনট। শ্রম আর মেধায় একেক জনের হাতে একেক রকম হয়ে উঠে ল্যাফেন ও ওয়াকচু কখনো আবার গামছা, চাদরও।

 

সংখ্যার প্রভাব প্রতাপ সর্বগ্রাসী। ক্ষুদ্রের কী ভাষা কী পোশাকআশাক কী ধর্ম সংস্কৃতি এমনকি রান্নাঘর পর্যন্ত পাল্টে দেয়। দিতে বাধ্য। বাজার সংস্কৃতির অর্থনীতি সেই বাধ্যবাধকতাকে আরো তরান্বিত করে মাত্র। কোচ গারো যেমন বাঙালির চাপে তাপে তেমনি বাঙালি নিজেও হিন্দি ও ইংরেজির ভাঁপেও ক্রমই ওষ্ঠাগত প্রাণ। এখানেও সংখ্যার খেলা। শুধু পাল্টে যায় পরিপ্রেক্ষিত। আর কুশীলব। নাম্বার ক্রিয়েটস পাওয়ার। কখনো আদিবাসী কখনো বাঙালি। কখনো আদিবাসীসহ হিন্দুরা সংখ্যা লঘু কখনো বাঙালি নিজেই সংখ্যালঘু। নিজের সংস্কৃতি ভাষা মায় যাপন সংকটাপন্ন। কোচ সংখ্যায় কম বলে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে — আমরা কিছুটা সংখ্যায় বেশি বলে নড়নচড়ন চোখে পড়ে না।

 

জাগোন্দ্র কোচের বাড়ি ঢুকবার পথের দু’পাশ বাঁশের বাতা দিয়ে বরফিকাটার মতো করে বুকসমান বেড়া দেয়া। সারি সারি কোচ পরিবার। সুন্দর নিকিনো উঠান ঝকঝক করছে।কোথাও নয়া ধান মেলে দিয়েছে গোবর লেপা উঠানে। আরেকটু এগিয়ে গেলেই চুয়ালিস কোচিনীর আয়ত উঠান। একপাশে আলু খেত অন্যপাশে সবজি বাগান। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে চুয়ালিস কোচিনী। তবু হাতের নিশানা চোখের চেয়ে প্রখর।

 

টপাটপ কাঁচা বাঁশের পাতলা কাবারি দিয়ে বুনে চলছে ধামা। একটু একটু করে বিনুনি করছে আর জল ছিটিয়ে হাতের চেটেয় ধাক্কা দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে গোলাকার মুখটি। কথা বলছে আর দুই হাত ঠিক ঠিক একের পর এক কাবারি দিযে দিয়ে বিনুনি গেঁথে চলছেন চুয়ালিস কোচিনী।

 

কত হবে বয়স? সত্তর ছাড়িয়ে গেছে। বিধবা। এখনো বয়স্ক ভাতা পান নি। ঠিক কত বয়স হলে বয়স্ক ভাতা পাবেন আমার ঠিক জানা নেই। আসাদের প্যান্ট শার্ট পরা দেখে তিনি তাঁর বয়স্ক ভাতার কথা পাড়লেন। এক সময় বাঁশের তৈরি কুলা, চালুন, টুকরি, ধারি, টোপা, খলুই, থৈচালনা চালুন ধান চালার চালুন, বড় ধানের গোলা, টোনা ইত্যাদির ব্যবহার সর্বত্র ছিল। গেরস্থমাত্রই কোন-না-কোন জিনিসের প্রয়োজন হতো। আর কিছু  না হোক চালুন কুলা খালুই ছাড়া আমাদের জীবন চলতই না। মঙ্গলবারের হাটে খলচন্দা থেকে কোচ ডালু বানাইয়েরা নিয়ে আসত এগুলো। সারা বছরই চাহিদা থাকলেও বর্ষার পরই এইগুলো হাঁটে উঠত বেশি বেশি। কালের দাপটে চাহিদা পড়ে গেছে। আমাদের সংসারে ঢুকে গেছে আরএফএল। এহেন পণ্য নেই যা সংসারে ঢুকে যায়নি।

 

একটা সময় ফুল তোলা কাঁচের গ্লাস সম্পন্ন থরের কাঁচের আলমারিতে সাজিয়ে রেখে দিত। সিরামিকের প্লেটও। নিত্য ব্যবহৃত হতো সিলভারের গ্লাস। কারো কারো বাসায় পরিবারের কর্তার নাম খোদাই করা কাঁসার গ্লাস থালা। প্লাস্টিক আর সিরামিকের সহজলভ্যতা পুরান অভ্যস্ত পাল্টে দিয়েছে পুরোটা। বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার কমে তলানি। যারা এই চুয়ালিস কোচের মতো উৎপাদক তাদের বিকল্প আয়ের দিকে সরে যেতে হয়েছে। তিনিই হয়তো শেষ প্রজন্ম হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাঁশের ধামা বানাবার শেষ কারিগর। অথচ এই চুয়ালিস কোচিনীরা যখন ‘খারি চক্কেনা’ বানাবার সক্ষমতা অর্জন করত তখনই তারা বিবাহযোগ্যা হয়েছে বলে ধরে নিতো।মেয়ে এখন স্বামী সংসার সামলাতের পারবে।

 

সোডা বা ক্ষার গারো বা কোচ রন্ধন প্রণালির অন্যতম উপাদান। সোডা ছাড়া কোচ নারীর চলে না। যেকোন কিছু ভালোভাবে সিদ্ধ করার জন্য এটি প্রয়োজন। একটা সময় প্রাকৃতিক উপায়ে এই ক্ষার জল তৈরি করে সিদ্ধর কাজে ব্যবহৃত হতো। যদিও এখন বাজার থেকে রাসায়নিক সোডা কিনে রান্নার কাজে ব্যবহার করে। একটা কলা গাছের গুঁড়ি টুকরোটুকরো করে কড়া রোদে শুকিয়ে পুড়ানো হতো। তারপর বাঁশের বা নেটের ছাকনিতে ছেঁকে জলে দীর্ঘক্ষণ চুবিয়ে রেখে সেখান থেকে যে জলের ফোটা ফোটা পড়ত সেটিই নানা রান্নায় ক্ষার হিসেবে ব্যবহৃত হত।

 

নেটের ছাকনি রান্না ঘুরে হাল আমলে ঢুকলেও কোচদের ভেতর বাঁশের মিহিদানা চটি দিয়ে এক ধরনের ছাকনি বা খারি চক্কেনা বানাত। ক্ষার ও এই খারি চক্কেনা বানাবার সক্ষমতার মাপকাঠি দিয়েই বুঝে নিতো কন্যা বিবাহযোগ্যা হয়েছে। গেরস্থকর্মের উপায় শিখেছে। মেয়ে এখন স্বামী সংসার সামলাতে পারবে। কোচিনী চুয়ালিস এখন পড়তি দিকে। সেই কারি চক্কেনা দিনগুলো সেই স্মৃতি। দাওয়ায় বসে বসে শুধু হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধামা তৈরি করে আর ফ্যাকাসে পিঙ্গল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে উত্তরের খোলা প্রান্তের দিকে।

 

মিতালি কোচের প্রশস্ত উঠান। কোচপল্লীর নানা বয়সী নারী দুপুরের কাজকাম সেরে কোলের শিশুকে নিয়ে সামাজিক দূরত্ব মেনেই বসেছে চট বিছানো উঠানে। কোলের শিশুদের ফোকলা দাঁতের হাসিতে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মিতালি কোচের উঠান।

 

এপাশে থরে থরে রাখা চেয়ারে বসেছেন অতিথিবৃন্দ। জনউদ্যেগের কেয়ার অফে কোভিড ১৯ সচেতনতা ক্যাম্পেইন। জন উদ্যোগ স্থানিকের নানামুখী কর্ম তৎপরতার একটি প্লাটফরম। বছর পাঁচেক ধরে কাজকাম করে যাচ্ছে একদল সংগঠক। স্থানিকের নানা সমস্যা চিহ্নিত করে যেমন কার্যনির্বাহকের দৃষ্টি আর্কষণ করছে তেমনই জন উদ্যোগও নিজের জায়গা থেকে সচেতনতামূলক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। স্থানিকের একটি ভয়েজের নাম জনউদ্যোগ।

 

কোভিডের করাল গ্রাসে সমগ্র বিশ্ব প্রকম্পিত। জীবন জীবিকা যেভাবে চলছিল এই অদৃশ্য শত্রুর আক্রমনে এখন দিশাহারা সমস্ত মানুষ। দ্বিতীয় তরঙ্গেও এই আপতকালীন সময়ে উঠে আসছে জীবন ও জীবিকা কোটি টাকার প্রশ্ন। জীবন বাঁচাতে গেলে জীবিকার মাথায় পড়ে বাজ। জীবিকাকে এগিয়ে ধরলে জীবন ধ্বংসের মুখে পড়ে। জীবনই যদি নাই বাঁচে কী হবে জীবিকা দিয়ে? অথবা যদি বেঁচে যাই তবে তো  তাকে বাঁচাতে হলে ঘরের বাইরে পা রাখা জরুরি হয়ে পড়ছে।

 

দ্বিতীয় তরঙ্গে তাই মানুষের ভেতর ড্যাম কেয়ার ভাব। কীসের কী? করোনা লকডাউন সরকারের চাল। যদিও মৃত্যুর গ্রাফ প্রতিদিন উর্ধ্বমুখী।প্রশাসনিক চাপে মাস্ক ব্যবহারে যেমন অনীহা তেমন হাত ধোয়া — বারবার হাত ধোয়ার জরুরি স্থাস্থ্যবিধি কাড়ে উঠেছে।

 

সামাজিক দূরত্ব নৈব নৈব চ। “মাস্ক নাই যার সেবা নাই তার” স্টিকারে ময়লা জমেছ বেশ। এমনতর সময়ে জীবন ও জীবিকার রেললাইন বহে সমান্তরাল। কোথাও মেলে না। এক দিকে টানলে ওদিকে কম পড়ে যায়। এই প্রান্তিকে কোভিড প্রতিরোধের বার্তা নিয়েই এসেছে জন উদ্যোগ। শহর থেকে দূরে। প্রান্তিক আদিবাসী কোচপল্লীতে। রাংটিয়া বিটের এই অংশের নাম বড় রাংটিয়া পশ্চিমে নওকুচি পূর্বে হলদি গ্রামে।

 

এখনো এখানে টিকা নেবার সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। টিকা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি শহুরের অনেক মানুষের মতো তাদের মাঝেও বিদ্যমান। সেই নিয়েই সংগঠকেরা বললেন, “জীবন বাঁচার কথা।স্বাস্থ্যবিধি মানার ভেতর দিয়ে কিভাবে মোকাবিলা করতে পারি এই শত্রুকে। নিজে বাঁচা ও অন্যের বাঁচার পরিসর সৃষ্টি করেই মূলত আমরা জীবনকে জীবন্ত করে তুলতে পারি।” যদিও এই কোচ পল্লীর কেউ করোনা আক্রান্ত হয়নি। প্রকৃতি থেকে যে যতদূরে সে তত ভীত সন্ত্রস্ত। কোচ বনঘেরা অরণ্যের সন্তান। নিজস্ব যাপন কৌশলেই হয়তো করোনা মোকাবিলা করার প্রতিরোধ নিজের শরীরে নিজের অজান্তেই গঠে উঠেছে। কিন্তু করোনা লেপাপোছা আধুনিক জীবন ব্যবস্থাপনার নানা জারিজুরি উদলা করে দিয়েছে। শুধু স্বাস্থ্য পরিসেবা নয় — অর্থনৈতিক পরিকাঠামোও।

 

অর্থনৈতিক আঘাতে কোচপল্লী এখন আক্রান্ত। একদিকে জীবন বাঁচার লড়াই অন্যদিকে জীবিকা — ভেঙে পড়েছে। কৃষিজীবী বা নানা ফুটফরমাশ খাটা কোচদের ঘরে অভাব কড়া নাড়ছে। এই ভূমিলগ্ন কোচেররা বোবা কান্নায় বুক ভাসাবে কিন্তু মুখফুটে নিজের চাহিদার কথা বলবে না। নিজের নিদারুণ অর্থ কষ্টের কথা বলবে না। কান্না আছে। ভাষা নেই। প্রকাশে সংকোচ। হাত বাড়িয়ে দিতে নিজের ব্যক্তিত্বে বাধে।

 

নিজের কোচ ভাষা বাংলার চাপে বিধ্বস্ত। অন্যদিকে নিজের সংখ্যা ক্রমেই নিচের দিকে। যুগল কিশোর কোচ শিক্ষক ও কবি — নিজের কোচ ভাষাতে বললেন স্বাস্থ্য ও নিজের অধিকারে সচেতন হবার কথা। জন উদ্যোগ স্বাস্থ্যবার্তা দেবার পাশাপাশি নিয়ে এসেছে কিছু উপহার। “আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে যেমন আমরা কিছু না কিছু নিয়ে যাই” জন উদ্যোগের আহ্বায়ক আবুল কামাল আজাদ বললেন, “তেমনি আমরা আপনাদের জন্য কিছু উপহার এনেছি।” কথাটি আমার মনে ধরেছে। এমন সংকোচ প্রবণ একটি জনজাতির আত্মসম্মানে আঘাত যেন না লাগে। লক ডাউন আর করোনার প্রভাবে তো বহু মাত্রিক। সে শুধু একবারে মারবে না। নানা দিকে থেকে দীর্ঘদিন ধরে জলেভাতে মারবে।

 

সকলের তো আর খাড়া হবার কোমর থাকে না। কারো কারোটা শক্ত কোমর। উঠে দাঁড়াতে পারবে বৈকি। অনেকে পারবে না উঠে দাঁড়াতে। করোনা-অর্থনৈতিক প্রভাবে ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। সবকিছু সরকারই করবে এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। সরকার অবশ্যই অপরের পাশে দাঁড়াবার পরিসর করে দেবে। যেন সমাজের বিত্তবানেরা এগিয়ে আসতে পারে।

 

ত্রাণ একবেলা দুই বেলার সমাধান দিতে পারে বটে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে পিছিয়ে পড়া এই উত্তর জনপদের অপরাপর জনজাতিসহ হরিজন বেদে হিজরা মৎসজীবী মুচি তাঁতি করাতি হোটেল শ্রমিক ও কুলি মজুরেরা যেন এই করোনাকালীন ও করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক ধাক্কা সামরে উঠতে পারে তাঁর বিধি ব্যবস্থা করা।

 

মিতালি কোচের ছনের বান্দায় বসে এই সবই ভাবছিলাম। পাশে লেপ্টে বসে আছে কমরেড সোলায়মান আহমেদ। একটু এগিয়ে আবু হান্নান।দুই জনই বাম রাজনীতি থেকে উঠে আসা মানুষ। এখনো মানুষের মাঝে আছেন। তারা উঠে দাঁড়াক সেই প্রত্যাশাও আমরা করতেই পারি। যদিও প্রান্তিকে বাম সংগঠন প্যাড সর্বস্ব।

 

বৈশাখের খরস্রোত রোদ একটু সরে গেছে পশ্চিমে। কাঁঠাল আর লিচুর ঝাকরা পাতার ছায়া তখন নিকানো উঠান জুড়ে। পাশাপাশি ঘর। মাটির ঘর। খড়ের ছাওয়া। নতুন খরে রোদ লেগে চিক চিক করছে। এক পাশে থাকার ঘর। তারপর ছোট্ট রান্নাঘর। বারান্দায় মাঁচা করে রাখা বনের ছোটছোট ডালপালা। সংরক্ষণ করে রেখছে। বর্ষার সিজনের জন্য। বর্ষায় লাকড়ির সংগ্রহ করা এই কোচ নারীদের জন্য কষ্ট কর হয়ে উঠে। তাই বৈশাখ জ্যৈষ্ঠেই লাকড়ি সংরক্ষণ। উঠানের এক পাশে মনসার থান। ছোট্টঘর। লেপা পোছা। নিকানো মেঝে। ভেতরে মাটির উঁচু ঢিবিতে ছড়িয়ে আছে  ফুল আর তুলসির শ্রদ্ধার্ঘ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here