সাহিত্যে গবেষণা ।। পর্ব ১

মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম কবি, গবেষক এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। মূলত ইংরেজিতে লিখে থাকেন। বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন গবেষণা-পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সহজিয়ার জন্য তিনি লিখবেন গবেষণা বিষয়ক ধারাবাহিক গদ্য। আজ প্রকাশিত হলো লেখাটির প্রথম পর্ব

 

রাটলেজ [সঠিক উচ্চারণ (/ˈraʊtlɪdʒ/)]-এর একটি জার্নালে ২০১৯ এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের শিরোনাম এটি : “Green numbers? Green selfies? An ecocritical reading of stories in the social media and self-quantification”। কিছুক্ষণ চোখ আটকে থাকলো শিরোনামের মধ্যে। এরকম প্রবন্ধ পড়ার আগ্রহ আছে, পড়িও। বিশেষ করে গবেষণা প্রবন্ধ লেখার সময়। তবে এ প্রবন্ধটি ভাবিয়ে তুললো। আমাদের এখানে কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা হচ্ছে? এই লেভেল-এর গবেষণা কখন শুরু হতে পারে? তবে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন এখন ভালো লিখছে এবং স্কোপাস, ওয়েভ অভ সাইন্স সহ অন্যান্য প্রসিদ্ধ ইনডেক্সড জার্ণালে তাদের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। রাটলেজ, সেইজ, ব্রিল, স্প্রিংগার, প্রজেক্ট মিউজ কর্তৃক প্রকাশিত জার্ণালগুলোতে অনেকেই প্রকাশ করছে।

 

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে বেশ পেছনে, কিন্তু আমরা আশাবাদী হতেই পারি। গবেষণার প্রতি শুভ দৃষ্টি ও পজিটিভ মানসিকতা আমাদেরকে অনেক এগিয়ে নিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। এক্ষেত্রে আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রী আর নবীন গবেষক ও শিক্ষকদেরকে উৎসাহ প্রদান ও উন্নত মানের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা খুব প্রয়োজন। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা — বিশেষ করে যারা গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছে বা চাচ্ছে তাদের জন্য প্রযোজ্য – না বললেই নয়, সেটা হলো তাদেরকে প্রিডেটরি জার্নাল চিনতে হবে এবং সেগুলোতে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বুঝে না বুঝে শুরুতে এ ভুলটি অনেকে করে থাকে।

 

গবেষণা বিষয়ে, বিশেষ করে সাহিত্যে গবেষণা বিষয়ে তেমন একটা লেখালেখি চোখে পড়ে না। আমি নিজেও ছাত্র-জীবনে সাহিত্য বিষয়ক গবেষণার আলোচনা বা দিকনির্দেশনার অভাব বোধ করেছি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সাহিত্যে গবেষণা বিষয়ক আলোচনা বা লেখালেখি অনেক পরে শুরু হয়েছে — বিংশ শতাব্দীর নব্বই দশকের পরে। ব্যাক্তিগত পর্যায় থেকে অনেকেই তাদের নিজস্ব জ্ঞান থেকে গবেষণা করে গেছেন। কিন্তু নব্বই দশক থেকে সাহিত্যে গবেষণার উপর বই প্রকাশিত হয়।

 

যাই হোক এ বিষয়ে অনেকের আগ্রহ আছে। বিশেষ করে নবীন গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়নরত অনেকেই এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে এ বিশ্বাসে আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থেকে ধারাবাহিকভাবে কিছু লিখে যাওয়ার চেষ্টা করে যাব। এতে নানা বিষয় আলোচিত হবে বিধায় গবেষণার বিষয়গুলোরও ধারাবাহিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করবো। আর এখানে বলে নিতে চাই যে, এ লেখাগুলো হিউম্যানিটিজের অন্তর্ভুক্ত সাহিত্য, আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে ইংরেজি সাহিত্যের গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে হিউম্যানিটিজের অন্যান্য বিষয়গুলোর জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে। এও বলা যেতে পারে এ আলোচনার অনেক বিষয় সামগ্রিকভাবে অন্যান্য বিষয়ের গবেষণার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে।

 

এ পর্বে বলতে চাই গবেষণা কী — সে বিষয়ে, কারণ এটি হতে যাচ্ছে প্রারম্ভিক আলোচনা। আমি আগেই বলে নিচ্ছি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে আলোচনা করছি, সুতরাং অনেক সীমাবদ্ধতা থাকবে। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, এ লেখাগুলো মূলত যারা গবেষণায় আগ্রহী বা নবীন বা যারা শুরু করতে যাচ্ছেন বা শুরু করতে চাচ্ছেন। যারা গবেষণা করছেন, নিয়মিত প্রকাশ করছেন তাদের কাছে সুচিন্তিতি মতামত ও পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।

 

গবেষণা কী?

গবেষণা হলো নতুন নতুন জ্ঞানের অনুসন্ধান বা বিরাজমান জ্ঞান বা বিদ্যার সাথে নতুন কিছু সংযোজন। এটা একটা পদ্ধতিগত কর্ম যার মাধ্যমে একটা বিষয়ে নতুন কথা বলা হয় বা বলার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পদ্ধতিটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্ঞানকে কোনো একটা দৃষ্টির মধ্যে সীমাবাদ্ধ না রেখে তাকে ছড়িয়ে দেয়া বা তার সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা। এটা এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী কর্মও। অন্যভাবে বলতে গেলে গবেষণা হলো কোন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।

এমন একটা পৃথিবী কি চিন্তা করা যায় যেখানে এক বছর সাহিত্য পড়া বা চর্চা নিষিদ্ধ করা হলো? ভাবুন ঠিক তার পরবর্তী সময়ের কথা! কলা বা হিউম্যানিটিজের গবেষণাও ঠিক তাই। এটার চর্চা না থাকলে একটা রোবটিক পৃথিবীর বাসিন্দা হবো আমরা।

গবেষণার উদ্দেশ্য

উপরের আলোচনায় উদ্দ্যেশ্য কিছুটা আলোচিত হয়েছে। তবে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো মানবসমাজের কল্যাণ সাধনের জন্য নতুন নতুন জ্ঞানের শাখা অনুসন্ধান বা মানবসমাজের বিকাশের জন্য বিরাজমান জ্ঞান বা পঠনকে এক্সপ্লোর করা বা বিশ্লেষণের মাধ্যমে উক্ত জ্ঞান বা পঠনকে সম্প্রসারিত করা। গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের প্রসার ঘটানো। এখানে একটা কথা বলে নেয়া দরকার যে, সাহিত্য পড়ে যেমন সরাসরি বা তাৎক্ষণিক ঔষধীয় কোন ফল পাওয়ার আশা করা অবান্তর, তেমনি সাহিত্যের গবেষণার ক্ষেত্রেও সরাসরি বা তাৎক্ষণিক ঔষধীয় মানবকল্যাণের আশা পোষণ করা অস্বাভাবিক। তবে এটা বলাই যায় সাহিত্য যেমন মানুষের মনোজগত পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রাখে, সাহিত্য তথা হিউম্যানিটিজের বিষয়গুলোর উপর গবেষণা সমাজে বা মানব কল্যাণে অসামান্য অবদান রাখে। সেটা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়না। কিন্তু এর প্রতিফলন ব্যাপক ও গভীর।

 

অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন (এটা অবশ্যই ন্যারো স্পেইস থেকে বলা হয়) সাহিত্যের গবেষণা ব্যাপকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো কল্যাণ সাধন করতে পারছে কিনা। যারা এ প্রশ্ন তুলতে চান তারা অন্যান্য ক্ষেত্রে গবেষণা করছে বা করতে পারছে তা নয়। সুতরাং এটা একটা ‘সেলফ ডিফেন্স’। তবে বলি, সাহিত্য তথা হিউম্যানিটিজ-এর গবেষণা মানুষের মনোজগতের বিকাশ সাধনে এবং সমাজের বিভিন্ন অসংগতি দূরীকরণে বিশাল ভূমিকা রাখে। এমন একটা পৃথিবী কি চিন্তা করা যায় যেখানে এক বছর সাহিত্য পড়া বা চর্চা নিষিদ্ধ করা হলো? ভাবুন ঠিক তার পরবর্তী সময়ের কথা! কলা বা হিউম্যানিটিজের গবেষণাও ঠিক তাই। এটার চর্চা না থাকলে একটা রোবটিক পৃথিবীর বাসিন্দা হবো আমরা।

 

সাহিত্য যেমন সমাজের দর্পণ, সাহিত্যে গবেষণাও তেমনি সমাজ বা মানবজাতির নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোকপাত করে থাকে। এর ফলাফল তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু তার প্রভাব অপরিসীম।

(চলবে)

4 মন্তব্যসমূহ

  1. আগ্রহ নিয়ে পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম

  2. চমৎকার লিখেছেন। সাহিত্য গবেষণার গুরুত্ব বোঝা সাধারণের জন্য খুব জরুরি বিষয়। পরের পর্ব পড়ার আগ্রহ থাকলো। তবে একটা ব্যাপারে অনুরোধ জানাই। যেমন, Predatory Journal বা এই প্রকার শব্দগুলো আরেকটু বুঝিয়ে বললে অনার্স মাস্টার্সের ছাত্র কিংবা যারা গবেষক হতে চায়, তাদের খুব উপকার হবে। সম্ভব হলে খুব সহজে ছোট্ট একটা ব্যাখ্যা। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে এই ধরনের লেখার জন্য।

  3. নির্দেশনামূলক লেখা। গবেষণার প্রারম্ভে প্রস্তুতির জন্য উপযোগী।

  4. সহজ,সরল,সাবলীল ভাষায় গবেষণার আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করার জন্য ধন্যবাদ, আপনাকে।উপকৃত হলাম, সাথে অনুপ্রাণিতও।কাজে লাগবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here