স্কুল-পর্যায়ে বাংলা ব্যাকরণ শিক্ষার পর্বান্তর : ‘‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’’

(নবম-দশম শ্রেণি) বইয়ের পর্যালোচনা

বাংলাদেশে পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনার প্রধান প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের বিভিন্ন বই প্রকাশ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন কালপর্বে বাংলা ভাষা শিখন ও শিক্ষাদানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি বিষয়ক নতুন রীতির পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে এনসিটিবি। এ বই নিয়ে সমালোচনা ও পর্যালোচনামূলক গদ্য লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক মোহাম্মদ আজম

 

পটভূমি

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক রূপে নতুন বই প্রকাশ করেছে। এটা একটা বড় ঘটনা। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

 

কেউ কেউ বইটির প্রতি তাঁদের মনোভাবের বিরূপতা প্রকাশ করেছেন। আমি যদ্দুর দেখেছি, আগের বইটির প্রতি অনুরাগই এ বিরাগের উৎস। কাজেই এ বিরাগ যুক্তিসম্মত নয়। ব্যাকরণ বই হিসাবে আগের বইটি ভালো ছিল। কিন্তু ওই বই লেখা হয়েছিল বাংলা ব্যাকরণপাঠের সুনীতিকুমার-প্রবর্তিত ধারায়। গত দু-তিন দশকে সে ধারায় উল্লেখযোগ্য বদল ঘটেছে। বিশেষ করে বাংলা একাডেমির জোড়া-ব্যাকরণ [প্রমিত ও ব্যবহারিক] আমাদের ব্যাকরণচর্চার একটা নতুন পর্বের সূত্রপাত করেছে — এমন বলার সঙ্গত কারণ আছে। দৃষ্টিভঙ্গির বদলের পাশাপাশি পরিভাষাগত বদলও কয়েক দশকের চর্চায় উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। স্কুল-কলেজপাঠ্য ব্যাকরণে তার প্রতিফলন না ঘটার কোনো কারণ নাই। এসব তথ্যে না-ওয়াকিফ থেকে যাঁরা কেবল আগের বইটির রচয়িতাদের নাম-মাহাত্ম্যে বুঁদ থাকতে চাইছেন, তাঁদের মন্তব্য এসব কারণেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

আরেকটা কথাও মনে রাখা জরুরি। মুখে সবসময় স্বীকার না করলেও আমরা সবাই কমবেশি জানি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থার কারণে ব্যাকরণের মতো বিশেষায়িত পাঠ্যপুস্তক রচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যোগ্য ও দক্ষ লোকবলের বেজায় ঘাটতি আছে। কাজেই বর্তমান বইটি যাঁরা লিখেছেন, অন্তত রচনা ও সম্পাদনা-তালিকায় যাঁদের নাম আছে, তাঁদের বাইরে চট করে বিকল্প নাম প্রস্তাব করা খুব সহজ নয়। কথাটা বললাম এ কারণে যে, কেউ কেউ রচয়িতাদের নাম ধরে আপত্তি জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাঁরা কাজটি খুব চিন্তাভাবনা করে করেছেন বলে মনে হয় না।

পাঠ্যপুস্তক হিসাবে এটি ক্রমশ নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে। অবশ্য, লেখকভেদে মনোভাব ও চিন্তাধারার ফারাক তো থাকবেই। ফলে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো অবস্থান নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তার চেয়ে জরুরি কাজ হবে প্রকাশিত ব্যাকরণটির গঠনমূলক সমালোচনা, যদি কারো থাকে, উপস্থাপন করা। তা যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে পরের সংস্করণগুলোতে ধীরে ধীরে বইটির উন্নয়ন সম্ভব হবে। পাঠ্যপুস্তক হিসাবে এটি ক্রমশ নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে। অবশ্য, লেখকভেদে মনোভাব ও চিন্তাধারার ফারাক তো থাকবেই। ফলে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো অবস্থান নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার দরকারও নাই। কিন্তু স্কুলপাঠ্য বই হিসাবে একাডেমিক অর্থে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভাব্য সংশোধন ও উন্নয়নে গুরুত্ব পাবে বলে ভরসা করি। তারই অংশ হিসাবে আমরা এখানে বইটির পর্যালোচনা করে কিছু পর্যবেক্ষণ উপস্থিত করছি।

 

পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ

১। ‘ভাষা একদিকে মুখে বলার এবং অন্যদিকে কানে শোনার জিনিস। সভ্যতার অগ্রগতিতে মুখের ভাষা ক্রমে লেখার ও ছাপার, সেইসঙ্গে চোখ দিয়ে পড়ার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্দীদের জন্য ভাষাকে উঁচুনিচু করে তৈরি করার ও হাত দিয়ে অনুভব করার ব্রেইল ভাষা, আবার বাক্-প্রতিবন্দীদের বোঝানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ইশারা ভাষা মানুষ তৈরি করেছে।’ (পরিচ্ছেদ ১, পৃ. ১)

 

প্রথম বাক্যটি চমৎকার এবং উপকারী। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্য প্রথমটিকে নাকচ করে দেয়। বাক্যটি নিজেই একটা ভুল সংবাদ দিচ্ছে। এটা পড়ে মনে হবে, সভ্যতার অগ্রগতিতে এখন আর আগের বাক্যে বর্ণিত অবস্থাটা কার্যকর নাই। খুবই বিভ্রান্তিকর। তৃতীয় বাক্যের প্রথমাংশ দুর্বল ও অস্পষ্ট। তবে এ উল্লেখ উপকারী হয়েছে। কিন্তু এসব উদাহরণ থাকার পরে শিক্ষার্থীকে বলে দেয়া জরুরি, বর্তমান ব্যাকরণ বইটি এসব ভাষা নিয়ে কারবার করবে না। এমনকি প্রাথমিকভাবে লিখিত ভাষা নিয়েও নয়। কারণ, ব্যাকরণ কাজ করে মুখ্যত মুখের ভাষা নিয়ে; আর ওটাই ভাষা। ভাষার লিখিত রূপ ভাষা-সংরক্ষণ ও যোগাযোগের সুবিধাজনক উপায় মাত্র। এসব সতর্কবাণী না থাকার কারণে অনুচ্ছেদটি কেবল ভুল তথ্যই দিচ্ছে না, রীতিমতো বিভ্রান্তিকর হয়েছে।

 

২। এর পরের অনুচ্ছেদের তিনটি বাক্যই অগ্রহণযোগ্য। প্রথম বাক্য : ‘জনগোষ্ঠী ভেদে বাক্যের গঠন আলাদা হয়, ভাষাও আলাদা হয়ে ওঠে।’ এ বাক্য থেকে ভাষার আলাদা হওয়ার ব্যাপারটা-যে শুরু হয় ধ্বনিস্তরে, এবং পরের সবগুলো স্তরে তা অব্যাহত থাকে, তা বোঝা যায় না; শুধু বাক্যের স্তরে আলাদা হয় — এরকম অযৌক্তিক দাবি করা হয়। দ্বিতীয় বাক্যটি এরকম : ‘এভাবে পৃথিবীতে কয়েক হাজার ভাষার জন্ম হয়েছে।’ বোধ হয় বলার লক্ষ্য ছিল, এখন দুনিয়ায় কয়েক হাজার ভাষা এভাবেই আলাদা ভাষা হিসাবে বিদ্যমান আছে। তা না বলায় বাক্যটি তথ্যের দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হয় নাই। কারণ, আগের-পরের সব ভাষা মিলিয়ে দুনিয়ার ভাষার সংখ্যা সম্পর্কে অনুমান করাই অসম্ভব। তৃতীয় বাক্যে গোলমালটা ঘটেছে একই কারণে। এখানে বোধ হয় বর্তমান জীবিত ভাষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা উল্লেখ না করায় সংস্কৃত, লাতিন, গ্রিক ইত্যাদি বাদ পড়েছে।

 

৩। ‘সংস্কৃত ও মৈথিলি ভাষা এক সময়ে এই লিপিতে লেখা হতো।’ (পরিচ্ছেদ ১, পৃ. ২)
এ বাক্য থেকে মনে হবে, এ দুই ভাষা কেবল বাংলা লিপিতেই লেখা হত। আসলে তো তা নয়। অন্য লিপির পাশাপাশি এ লিপিতেও লেখা হত — এরকম বলাই সঙ্গত।

 

৪। ‘যেমন কথ্যভাষারীতির মধ্যে রয়েছে আদর্শ কথ্য রীতি ও আঞ্চলিক কথ্য রীতি। আবার লেখ্য ভাষা রীতির মধ্যে রয়েছে প্রমিত রীতি…’ (পরিচ্ছেদ ৩, পৃ. ৫)
‘আদর্শ কথ্য রীতি’ — এ কথা ব্যাকরণে বর্জনীয়। পরের লাইনে যেখানে ‘প্রমিত’ কথাটা আছে, আর ‘প্রমিত’ কথাটা ভাষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রচলিত ও ব্যাকরণসম্মত, সেখানে ‘আদর্শ’ কথাটার ব্যবহার শুধু সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ই নয়, ক্ষতিকরও বটে। কারণ, এটা ভাষা সম্পর্কে একটা অপরিবর্তনীয় ভাষারূপের ধারণা তৈরি করে। ‘ভালো-খারাপ’ বাইনারির মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি করে।

 

৫। ‘আদর্শ কথ্য রীতি হলো বাঙালি জনগোষ্ঠীর সর্বজনীন কথ্য ভাষা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় নানা ধরনের অডিও-ভিডিও মাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্য, আলোচনা, নাটক ও সংগীতে এই রীতির প্রয়োগ দেখা যায়। এই রীতিই প্রমিত লেখ্য রীতির ভিত্তি।’ (পরিচ্ছেদ ৩, পৃ. ৫)

 

এখানে ‘আদর্শ’ শব্দ ব্যবহারের সংকট সম্পর্কে আগেই বলেছি। কিন্তু সে রীতি সম্পর্কে যে বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে, তা বেশ গোলমেলে — ঐতিহাসিক দিক থেকেও অসত্য, বর্তমান বাস্তবতার দিক থেকেও অপ্রযোজ্য। প্রথমত, এটা সর্বজনীন কথ্য ভাষা নয়। আনুষ্ঠানিক ভাষা। দুইয়ের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। দ্বিতীয়ত, বক্তৃতায়-আলোচনায় কিংবা নাটকে-গানে এ ভাষা ব্যবহৃত হয় — এ ধরনের একটা অকারণ দাবি শিক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতার সাথে মিলাতে পারবে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ দীর্ঘমেয়াদি কুসংস্কারে ডুবতে থাকবে যে, চারপাশে যা কিছু হচ্ছে তার সবই ভুল-ভাল হচ্ছে। ভাষা সম্পর্কে এ ধরনের একটা ধারণা দেয়া রীতিমতো অনৈতিক।

 

আসলে এ অংশের লেখক একটা সরল সত্য লুকাতে চেয়েছেন। অকারণে। তিনি যাকে আদর্শ বলছেন সেই কথ্যরীতি এসেছে বাংলার একটা বিশেষ উপভাষা থেকে। কালক্রমে সেটা বাংলাভাষী অঞ্চলের প্রমিত রূপ হিসাবে মান্যতা পেয়েছে। এ সরল কথাটা না বলাতে এতগুলো গোলমাল তৈরি হল। অকারণে।

আসলে ‘কাব্য রীতি’ বিভাগটিই অপ্রয়োজনীয়। কেননা, সাহিত্যিক ভাষামাত্রই আলাদা ভাষা। কেবল কাব্য নয়। তাছাড়া দর্শনের ভাষা বা বিজ্ঞানের ভাষা কেন লেখ্য রীতির আওতায় আসবে না? কাজেই এ বিভাগটি বাদ দেয়া জরুরি।

৬। ‘একুশ শতকের সূচনায় চলিত রীতির একটি আদর্শ রূপ প্রমিত রীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এই প্রমিত রীতিই লেখ্য বাংলা ভাষার সর্বজনগ্রাহ্য লিখিত রূপ।’ (পরিচ্ছেদ ৩, পৃ. ৬)

প্রথম বাক্যটি বিস্ময়কর। এটা কখন কিভাবে গৃহীত হল, কেই বা গ্রহণ করল, তা বোঝা গেল না। একে আবার বলা হয়েছে ‘সর্বজনগ্রাহ্য লিখিত রূপ’। খুুবই অসত্য বিবৃতি। লিখিত বাংলার বড় অংশই আসলে ‘অপ্রমিত’। লেখক বোধ হয় শিক্ষার্থীদের এমন একটা ধারণা দেবার চেষ্টা করেছেন যে, এভাবেই লেখা উচিত। দরকার ছিল না। আনুষ্ঠানিক রচনায় প্রমিত লেখ্য রীতি ব্যবহার করতে হয় — এটা বললেই সব কুল রক্ষা হয়।

 

৭। লেখ্য ভাষা রীতির একটা ভাগ করা হয়েছে ‘কাব্য রীতি’। এরপর বলা হয়েছে, এটা নাকি আবার দুইভাগে বিভক্ত : ‘পদ্য কাব্য রীতি ও গদ্য কাব্য রীতি’। খুবই দুর্বল ধারণা। কবিতায় ‘পদ্য’ আর ‘গদ্য’ শব্দ দুটির এরকম ব্যবহারে আসলে কিছুই বোঝা যায় না। কাজেই এরকম বিভাজন হাস্যকর।
আসলে ‘কাব্য রীতি’ বিভাগটিই অপ্রয়োজনীয়। কেননা, সাহিত্যিক ভাষামাত্রই আলাদা ভাষা। কেবল কাব্য নয়। তাছাড়া দর্শনের ভাষা বা বিজ্ঞানের ভাষা কেন লেখ্য রীতির আওতায় আসবে না? কাজেই এ বিভাগটি বাদ দেয়া জরুরি। অকারণে একরাশ বিভ্রান্তি তৈরি ছাড়া এটা আসলে কোনো উদ্দেশ্যই সাধন করছে না।

 

৮। সাধু রীতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই রীতি বাংলা লেখ্য ভাষার আদর্শ রীতি হিসেবে চালু থাকে।’ (পরিচ্ছেদ ৩, পৃ. ৬)
তথ্য হিসাবে এটা ঠিক নয়। একটু পরে এ বইতেই বলা হয়েছে, বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে চলিত রীতি এ স্থান দখল করেছে। কাজেই ‘প্রায় দেড় শতাব্দী’ লেখা যেতে পারে।

সাধু রীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্যে আসল কথাটাই বলা হয় নাই। শব্দসম্ভার ও সাধিত শব্দের দিক থেকে সাধুরীতির মূল প্রবণতা না বললে এ রীতি সম্পর্কে মূল কথাটা অকথিত থেকে যায়। ব্যাপারটা বস্তুত আরো অনেক জটিল ও গভীর। তবে নবম-দশম শ্রেণির বইতে এরচেয়ে বেশি বলা হয়ত জরুরি নয়।

 

৯। ‘প্রমিত রীতি’ অনুচ্ছেদে ‘প্রমিত’ সম্পর্কে যে ধারণা দেয়া হয়েছে তা রীতিমতো বিপজ্জনক। (পৃ. ৭) এখানে আবার বলা হয়েছে, ‘একুশ শতকের সূচনা নাগাদ এই চলিত রীতিরই নতুন নাম হয় ‘প্রমিত রীতি’’। ‘স্ট্যান্ডার্ড’ রীতি হিসাবে ‘প্রমিত’ কথাটার ব্যবহার শুরু হয়েছে আরো অনেক আগে, আর এর রূপ-রীতি অনেকটাই নির্ধারিত হওয়ার ঘটনাও আগে ঘটেছে। একুশ শতকে নতুন করে কিছুই ঘটে নাই।

এখানে এমনভাবে বলা হয়েছে যেন প্রমিত কোনো অচল-অনড় ভাষারূপ। তা তো নয়।

তারচেয়ে বড় কথা, এখানে এমনভাবে বলা হয়েছে যেন প্রমিত কোনো অচল-অনড় ভাষারূপ। তা তো নয়। শিষ্ট মৌখিক উচ্চারণের সাথে সাথে এ ভাষারূপ নিত্য পরিবর্তিত হতে থাকে। বরং বারবার মনে করিয়ে দেয়া উচিত ছিল, আনুষ্ঠানিক ব্যবহারে, যোগাযোগজনিত সুবিধার দিক থেকে, কিংবা লেখায়-বলায় শৃঙ্খলা আনার স্বার্থে, ভাষার প্রমিত রূপ নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়ে; যদিও তা কোনো স্থায়ী রূপ নয়। তাছাড়া প্রমিত রূপও-যে একটা উপভাষা বৈ নয়, সে ধারণাও কোথাও দেয়া হয় নাই।

 

১০। এ পরিচ্ছেদের শেষ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : ‘আদর্শ কথ্য বা লেখ্য প্রমিত তার কাছে দ্বিতীয় ভাষা’। (পৃ. ৮)
এখানে ‘আদর্শ’ শব্দটি একেবারেই অনাবশ্যক এবং বিভ্রান্তিকর। আগেই বলেছি, ‘আদর্শ’ শব্দটির ব্যবহার এসেছে ভুল ধারণা থেকে। পরের বাক্যেই তার গভীরতর প্রমাণ আছে। বলা হয়েছে : ‘বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রম যেহেতু প্রমিত রীতি অনুসরণ করে,…’। এ বাক্য বিভ্রান্তিকর। কারণ এ থেকে যে কেউ ধারণা করবে, অন্য কোথাও বুঝি অপ্রমিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলে। শিক্ষা কার্যক্রম ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের প্রধান খাত। কাজেই এ খাতে প্রমিতের ব্যবহার হবেই। এ ধরনের কেজো বর্গ হিসাবে না দেখে ‘আদর্শ’ হিসাবে দেখার প্রবণতার কারণেই এসব ছোটখাট কিন্তু গুরুতর ভুল রয়ে গেছে।

 

১১। ‘বাগ্‌যন্ত্র’ শব্দের হসন্ত পরিহার করা প্রয়োজন। (পৃ. ১০) এটা ব্যাকরণের দিক থেকে আবশ্যিক নয়, বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানবিধিরও পরিপন্থি। সবচেয়ে বড় কথা, এ শব্দে যে-কারণে হসন্ত রক্ষিত হয়েছে, সে কারণ মান্য করলে আরো বহু শব্দে হসন্ত লিখতে হয়। পরিচ্ছেদ ৪০-এর ‘বাগ্‌ধারা’ (পৃ. ১০৯) শব্দের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।

 

১২। ‘ধ্বনি ও বর্ণ’ অধ্যায়টি বর্ণ দিয়ে শুরু করা উচিত। শিক্ষার্থীরা বর্ণের সাথেই পরিচিত, ধ্বনির সাথে নয়। বর্ণ থেকে ধ্বনির দিকে গেলে ইতিমধ্যে পরিচিত বর্ণের সাপেক্ষে ধ্বনি-ধারণার সাথে যোগাযোগটা অনেক কার্যকর হবে। বলা যাবে, কোনটি কেন শুধু বর্ণ, ধ্বনি নয়। বর্ণমালায় নাই, এমন ধ্বনির আলোচনা থেকে ব্যাপারটা সম্পর্কে ধারণা আরো পোক্ত হবে।

 

১৩। ‘ভাষার ক্ষুদ্রতম একককে ধ্বনি বলে।’ (পরিচ্ছেদ ৫, পৃ. ১২)
ধ্বনির সংজ্ঞা হিসাবে এটুকুই বলা আছে। কাজটা ঠিক হয় নাই। এ পদ্ধতির সংজ্ঞায়ন পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহার করা খুব উপকারী হয় না। বলা উচিত, ভাষার ক্ষুদ্রতম একক ধ্বনি। এরপর ধ্বনির বিধি-মোতাবেক সংজ্ঞা দেয়া উচিত, যে সংজ্ঞায় থাকবে ধ্বনি কী, এবং কী নয়। সংজ্ঞা এবং তার বিশ্লেষণ ও উদাহরণ যে কোনো পাঠে কায়দামাফিক প্রবেশ করার সদর রাস্তা। অন্তত নবম-দশম পর্যায়ে কোনো বিষয়েই এর অন্যথা হওয়া উচিত নয়।

 

১৪। ‘ধ্বনির প্রতীককে বলা হয় বর্ণ। এই বর্ণ কানে শোনার বিষয়কে চোখে দেখার বিষয়ে পরিণত করে।’ (পরিচ্ছেদ ৫, পৃ. ১২)
এ প্রসঙ্গে আমরা আগেই আলাপ করেছি। একই সমস্যা ঘটেছে এখানেও। এ বিবৃতি থেকে মনে হবে, বর্ণের মধ্য দিয়ে ভাষার ভূমিকা ও কার্যপ্রণালি বদলে যায়, কানের জায়গা দখল করে চোখ। বরং এখানে জোর দিয়ে বলা দরকার, আমরা ব্যাকরণ বর্ণযোগে পড়লেও ব্যাপারটা আসলে মুখে বলার ও কানে শোনার বিষয়। লিখিত ভাষার বিশিষ্টতা ব্যাকরণের আলাপে খুব সামান্যই প্রভাব বিস্তার করে। যদ্দুর সম্ভব সে প্রভাব এড়ানোই ভাষা-আলোচনার জন্য উত্তম।

 

বস্তুত, ভাষার সাথে ধ্বনির সম্পর্ক-যে আবশ্যিক, আর বর্ণের সম্পর্ক নিতান্তই আকস্মিক, সে কথাটা এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার। এ বইতে যে বিবরণ আছে, তাতে বিপরীত ধারণা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

 

১৫। ‘ধ্বনির বিভাজন অনুযায়ী বর্ণমালাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়।’ (পরিচ্ছেদ ৫, পৃ. ১২)
এ বাক্যে ‘বাংলা বর্ণমালা’ না বললে কথাটার আসলে কোনো অর্থই হয় না। বর্ণনাটা যেভাবে আছে, তাতে ‘বাংলা’ কথাটা উহ্য থাকলেও-যে পাঠক সেভাবে বুঝে নেবে, তার উপায় নাই।

 

১৬। ‘কারবর্ণের স্বতন্ত্র ব্যবহার নেই। এগুলো ব্যঞ্জনবর্ণের আগে, পরে, উপরে, নিচে বা উভয় দিকে যুক্ত হয়। কোনো ব্যঞ্জনের সঙ্গে কারবর্ণ বা হসচিহ্ন না থাকলে ব্যঞ্জনটির সঙ্গে একটি ‘অ’ আছে বলে ধরে নেওয়া হয়।’ (পরিচ্ছেদ ৫, পৃ. ১২)
প্রথম দুই বাক্যে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, তা প্রাথমিকভাবে ঠিকই আছে। তবে এখানে বলে দেয়া জরুরি, কারবর্ণগুলো ব্যঞ্জনের সাথে বসে সংশ্লিষ্ট ধ্বনিগুলোই দ্যোতিত করে। এগুলো পূর্ণ স্বরধ্বনিই। আরেকটি কথা বলা জরুরি : বাংলা কারবর্ণগুলো ব্যঞ্জনের আগে-পরে-উপরে-নিচে যেখানেই বসুক, দ্যোতিত স্বরধ্বনি ব্যঞ্জনের ডানেই থাকে। আগের ব্যাকরণ বইয়ের তুলনায় এ নতুন ব্যাকরণটি অনেক বেশি ধ্বনিকেন্দ্রিক বলে — এবং সেটা সঙ্গতভাবেই — এ উল্লেখ আরো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

 

স্বরধ্বনি-যে ব্যঞ্জনের ডানে বসে ব্যঞ্জনের উচ্চারণ সম্ভবপর করে তোলে, সে কথাটা না বলা থাকলে তৃতীয় বাক্যটিরও আসলে কোনো তাৎপর্য দাঁড়ায় না। এখানে উল্লেখ করা জরুরি, এ বইয়ে হসন্ত সম্পর্কে কোনো পরিচয়মূলক বাক্য নাই। এটা থাকা প্রয়োজন। বাংলা বর্ণে হসন্ত কেন আবশ্যিক, আর এর তাৎপর্যই বা কী, সে কথা এক অনুচ্ছেদে যোগ করা জরুরি। এই জ্ঞান একদিকে শিক্ষার্থীকে বাংলা যুক্তবর্ণ বুঝতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে পুরো ব্যাকরণ বইতে-যে অসংখ্য হসন্তওয়ালা ধ্বনি, রূপ বা শব্দাংশ ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোকে পরিচ্ছন্ন করবে। এ প্রসঙ্গে বাংলায় হসন্তের মতো একটা উপাদান কেন জরুরি, যেখানে ইংরেজি বা অন্য অনেক ভাষায় নয়, সে কথাটাও বলা দরকার। তাহলে ব্যাপারটা শিক্ষার্থীর মনে বাংলা ধ্বনি ও বর্ণ সম্পর্কে কার্যকর বোধ তৈরিতে সহায়ক হবে।

 

১৭। স্বরধ্বনির আলোচনাটা (পরিচ্ছেদ ৬) স্বরবর্ণ থেকে শুরু করলেই ভালো। যদি ৮ম শ্রেণির বইতে এ আলোচনা থাকে, তাহলে দরকার নাই। কিন্তু না থাকলে শিক্ষার্থীর পক্ষে এ আলোচনায় ঢুকা রীতিমতো অসম্ভব। প্রথমে ১১ টি স্বরবর্ণ লিখে কোনটি কেন ধ্বনি এবং কোনটি নয়, সে আলাপ করলে শিক্ষার্থীর পক্ষে তার পূর্বতন পড়াশোনার সাথে এ আলোচনার সঙ্গতি রক্ষা করা সম্ভব হবে। ‘অ্যা’ ধ্বনি সম্পর্কে এখানে বাড়তি আলোচনা প্রয়োজন। তাতে শিক্ষার্থীর এ ধারণা পোক্ত হবে যে, ভাষা লিখিত রূপের বা বর্ণের ব্যাপার নয়। এখানে যেভাবে আলোচনা করা হয়েছে, তা ভাষাবিজ্ঞানসম্মত; কিন্তু খুব বেশি পরিমাণে শ্রেণিশিক্ষকের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের প্রচুর শিক্ষক পাওয়ার আশা বাতুলতা মাত্র। তাছাড়া পাঠ্যপুস্তকেরও দায় আছে খোদ শিক্ষককে সহায়তা করার।

 

১৮। ‘কিন্তু ধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময়ে কোমল তালু খানিকটা নিচে নেমে গেলে কিছুটা বায়ু নাক দিয়েও বের হয়। এর ফলে ধ্বনিগুলো অনুনাসিক হয়ে যায়। স্বরধ্বনির এই অনুনাসিকতা বোঝাতে বাংলা স্বরবর্ণের উপরে চন্দ্রবিন্দু (ঁ) ব্যবহৃত হয়ে থাকে।’ (পরিচ্ছেদ ৬, পৃ. ১৬)

এখানকার প্রথম দুই বাক্যের বর্ণনা পড়লে মনে হবে, কেউ একজন ইচ্ছা করলে এরকমভাবে স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারণ করতে পারে। আসলে বলা উচিত, বাংলা উচ্চারণে অনেক শব্দেই স্বরধ্বনিগুলো অনুনাসিক হয়। তখন স্বরধ্বনিটা এ প্রক্রিয়ায় উচ্চারিত হয়। ধারণার দিক থেকে এ দুই কথা বেশ আলাদা।

 

তৃতীয় বাক্যটির সাথে যোগ করা উচিত, বাংলা লেখ্যরূপে চন্দ্রবিন্দু যেখানেই বসুক না কেন, তা উচ্চারিত হয় স্বরধ্বনিটির সাথে, এবং ডানে। তাছাড়া, বাংলা স্বরধ্বনিগুলো-যে অনুনাসিক হতে পারে, তাতে অর্থপার্থক্য তৈরি হয়, আর এ কারণে অনেকে এগুলোকে আলাদা ধ্বনি গণ্য করতে চান — সে কথাটা উল্লেখ থাকলেও খারাপ হয় না। কথাগুলো বইয়ের অন্য কোথাও নাই যেহেতু।

 

১৯। অর্ধস্বরধ্বনি ও দ্বিস্বরধ্বনির আলোচনা ছোট, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হয়েছে। শুধু অর্ধস্বরধ্বনি পুরোপুরি উচ্চারিত হয় না — এ কথাটা আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলা উচিত। কারণ বাকি আলোচনা এ ধারণার উপরই প্রতিষ্ঠিত।

 

২০। স্বরধ্বনির মতো ব্যঞ্জনধ্বনির আলোচনাও (পরিচ্ছেদ ৭) শুরু হয়েছে আঁতকা। এর আগে ব্যঞ্জনধ্বনি সম্পর্কে (‘ধ্বনি ও বর্ণ’ অধ্যায়ে) কেবল একটি বাক্য আছে। কাজেই এ অধ্যায়ে ব্যঞ্জন সম্পর্কে পরিচিতিমূলক একটা অনুচ্ছেদ থাকলে ভালো হয়।

 

২১। বর্ণের উচ্চারণ (পরিচ্ছেদ ৮) অধ্যায়ে উচ্চারণগুলো দেখানো শুরু করার আগে অর্থাৎ প্রথম প্যারার পরে (পৃ. ২৩) একটা পরিচিতিমূলক অনুচ্ছেদ যোগ করা আবশ্যিক। কেন উচ্চারণ দেখানোর জন্য হসচিহ্ন ব্যবহার করা হবে, কেন অনেকগুলো বর্ণের উচ্চারণ দেখানো হবে না, সে সম্পর্কে নির্দেশনা দিলেই কেবল পরের আলোচনার সাথে শিক্ষার্থী যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। হসন্ত সম্পর্কে এখানে আরেকবার মনে করিয়ে দেয়া বাঞ্ছনীয়।

 

২২। ‘[ই] ধ্বনির হ্রস্বতা ও দীর্ঘতা বোঝাতে দুটি বর্ণ রয়েছে : ই এবং ঈ। কিন্তু বাংলা ভাষায় উভয় বর্ণের উচ্চারণ একই রকম’। (পরিচ্ছেদ ৮, পৃ. ২৩)
আগেই বলেছি, স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনির আলোচনাটা করা উচিত ছিল বর্ণের পরিচয় দেয়ার সূত্রে। তাহলে ঈ কেন বাংলার স্বরধ্বনি নয়, দীর্ঘস্বর বাংলায় নেই বলতে কী বোঝায় ইত্যাদি বলা যেত। সে আলোচনা না থাকায়, এবং এখানেও কিছু বলে না দেয়ায়, এ দুই বাক্যের আসলে বোধগম্য কোনো মানে দাঁড়াচ্ছে না। যদি বাংলায় উভয় বর্ণের উচ্চারণ একই হয়, তাহলে ‘হ্রস্বতা ও দীর্ঘতা বোঝাতে’ কথাটারও তো কোনো অর্থ হয় না। দীর্ঘতা বোঝানোর জন্য স্বরবর্ণ আছে, অথচ তার উচ্চারণ নাই — এর ব্যাখ্যা আগেই করা উচিত। তা যেহেতু করা হয় নাই, এখানে করা উচিত ছিল।

 

২৩। ‘এ বর্ণের উচ্চারণ দুই রকম : [এ] এবং [অ্যা]। সাধারণ উচ্চারণ [এ], কিন্তু পাশের ধ্বনির প্রভাবে এ কখনো কখনো [অ্যা] উচ্চারিত হয়।’ (পরিচ্ছেদ ৮, পৃ. ২৩)
এ বিবৃতি সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। এখানে আলাপটা বর্ণ থেকে ধ্বনিতে গেছে। বলা উচিত : অ্যা ধ্বনিটি কখনো কখনো এ দিয়ে লেখা হয়, যেহেতু বাংলায় অ্যা ধ্বনির জন্য কোনো বর্ণ নাই।

 

২৪। ‘উপসর্গ ও প্রত্যয় দিয়ে তৈরি শব্দকে সাধিত শব্দ বলা হয়। উপসর্গ ও প্রত্যয় ছাড়া শব্দগঠনের আরো কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রক্রিয়া হল সমাস,’। (পরিচ্ছেদ ৯, পৃ. ২৬)
তাহলে সমাস বা দ্বিত্ব ইত্যাদি কি সাধিত শব্দের কৌশল নয়? সাধিত শব্দের আলাদা সংজ্ঞায়ন করে আলোচনাটা করা উচিত ছিল।

 

২৫। ‘সমাস দিয়ে শব্দ গঠন’ (পরিচ্ছেদ ১২) শিরোনামটি এভাবে না দিলেই ভালো হত। প্রত্যয় দিয়ে বা উপসর্গ দিয়ে বলা হয় যে-অর্থে, ঠিক সেভাবে সমাস দিয়ে কথাটার কোনো মানে হয় না। বলা যেত, সমাস প্রক্রিয়ায়, বা সমাসের মাধ্যমে।

 

২৬। ‘এই সংক্ষেপ প্রক্রিয়ার নাম সমাস’ (পরিচ্ছেদ ১২, পৃ. ৩৭) — এখানে ‘সংক্ষেপ’ কথাটা বোধ হয় সরল করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটা আসলে হবে ‘সংক্ষেপণ’। যদি জটিল বলে এটা পরিহার করতে হয়, তাহলে বলা উচিত ‘সংক্ষেপ করার’।

আচমকা ‘সমাস মূলত চার প্রকার’ বলাটা বিভ্রান্তিকর। পাঠ্যবইয়ের লেখকদের এতটা প্রত্যয় প্রকাশের কোনো সুযোগ নাই। চারপাশের লক্ষ বইয়ে অন্যরকম লেখা আছে।

২৭। সমাসের আলোচনায় ‘সমস্তপদ’, ‘সমস্যমান পদ’, ‘ব্যাসবাক্য’ ইত্যাদি শব্দের খুব সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা থাকতে পারত। তাতে শব্দগুলো নিজগুণেই সংজ্ঞার্থ প্রকাশ করত।
ব্যাসবাক্যের সংজ্ঞায়নে বলা হয়েছে, ‘যেসব শব্দ দিয়ে সমস্তপদকে ব্যাখ্যা করা হয়’। (পৃ. ৩৭) বলা উচিত, সমস্তপদকে প্রসারিত করে বা বিশ্লেষণ করে যা পাওয়া যায়। এভাবে বললে যে-বাক্য বা বাক্যাংশ সংক্ষেপিত হয়ে সমাস হয়েছে, ব্যাসবাক্য-যে আদতে তাই, সে ধারণা পষ্ট হয়। তা না হলে মনে হবে, এটা বুঝি নতুন বা ভিন্ন কিছু।

 

২৮। আচমকা ‘সমাস মূলত চার প্রকার’ বলাটা বিভ্রান্তিকর। পাঠ্যবইয়ের লেখকদের এতটা প্রত্যয় প্রকাশের কোনো সুযোগ নাই। চারপাশের লক্ষ বইয়ে অন্যরকম লেখা আছে। এটাও বিবেচনায় থাকা দরকার। কাজেই একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং এ প্রকারভেদের কার্যকারণ বলে নেয়া জরুরি ছিল।

 

সমাসের নামগুলো এরকম কেন, প্রত্যেক সমাসের প্রকারগুলোর নামেরই বা তাৎপর্য কী, তার ব্যাখ্যা থাকা উচিত। তাতে নাম মুখস্থ করে মনে রাখার ঝক্কি কমত। তাছাড়া অতি প্রচলিত যেসব নাম বাদ পড়েছে, সেগুলো বাদ পড়ার যুক্তিটাও বলে রাখা দরকার ছিল। যদি সম্পূর্ণ নতুন নাম ও প্রণালি-পদ্ধতি অনুযায়ী অধ্যায়টা রচিত হত, তাহলে এসব বলার দরকার হত না। কিন্তু তা তো হয় নাই। একেবারেই পুরনো বিবরণী থেকে কাটছাঁট করে কিছু বাদ দেয়া হয়েছে। সে কারণেই এ ব্যাখ্যা সব অর্থেই জরুরি — নিজের ন্যয্যতার জন্যও বটে, বোঝাবুঝির স্বার্থেও বটে।

 

২৯। বাংলা ব্যাকরণচর্চার যে নতুন পর্বে আমরা প্রবেশ করেছি বাংলা একাডেমির প্রমিত ও ব্যবহারিক ব্যাকরণের সূত্রে, আর বর্তমান স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ বইটিতে যার কাঙ্ক্ষিত প্রতিফলন ঘটেছে, সে পর্বে পুরনো ব্যাকরণের কয়েকটি অধ্যায় জুতমতো সামলানো রীতিমতো কঠিন। সন্ধি এর একটি।

প্রশ্ন জাগে, বাংলায় যদি সন্ধি না-ই থাকে, তাহলে সন্ধির সূত্র এল কোত্থেকে। কয়েকটা বাক্যে ব্যাপারটার ব্যাখ্যা থাকলে এ গোলমাল এড়ানো যায়।

বইয়ে সন্ধি রাখতেই হচ্ছে, অথচ বলতে হচ্ছে, সন্ধি বাংলা ভাষার খুবই অনিয়মিত ও বিরল একটি প্রক্রিয়া Ñ এই দুই অবস্থানের মিলমিশ করা মোটেই সহজ নয়। আমাদের বলে নেয়া উচিত, বাংলা ব্যাকরণে সন্ধির প্রক্রিয়াটা মুখ্যত সেসব শব্দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যেগুলো সংস্কৃত থেকে সন্ধিবদ্ধ হয়ে এসেছে। এগুলোর পরিমাণ বিপুল হওয়ায় ওই শব্দগুলোর পরিচয়ের জন্য, এবং লিখিত বাংলার বানান সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণার জন্য, সংস্কৃত সন্ধির অনেকাংশ সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। তা না বললে যে-সমস্যা হবেই, বর্তমান বইয়ের সন্ধি অংশে সে সমস্যাই হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, ‘বাংলা ভাষায় উপসর্গ, প্রত্যয় ও সমাস প্রক্রিয়ায় শব্দগঠনের ক্ষেত্রে সন্ধির সূত্র কাজে লাগে।’ (পরিচ্ছেদ ১৩, পৃ. ৪১)
প্রশ্ন জাগে, বাংলায় যদি সন্ধি না-ই থাকে, তাহলে সন্ধির সূত্র এল কোত্থেকে। কয়েকটা বাক্যে ব্যাপারটার ব্যাখ্যা থাকলে এ গোলমাল এড়ানো যায়।

 

সেক্ষেত্রে এখানে যেরকম সংক্ষেপে সূত্রগুলো বলা হয়েছে, তা ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভ্রান্তিকর হবে বলেই মনে হয়। এগুলো একটু বিস্তারিত করে বর্তমান সজ্জায় অধ্যায়টি লিখলে বানান ও ভাষাবোধের জন্য ভালো হত। যদি সূত্রগুলো বাংলার নয় বলে বাদ দেয়া হত, তাহলে একথা বলার দরকার হত না। আছেই যখন, এবং লিখিত বাংলার জন্য তার দরকারও যখন আছে, তখন আরেকটু খোলামেলা আলাপ থাকলে লাভ বৈ ক্ষতি নাই।
সেক্ষেত্রে প্রাত্যহিক ব্যবহারে বাংলার যেসব সন্ধি হয়, সেগুলোর একটা অংশ থাকলেই বরং ভালো। ধারণাটা পরিষ্কার হতে তা সাহায্য করবে।

 

৩০। নতুন ব্যাকরণের আরেকটি স্পর্শকাতর অংশ ‘শব্দের শ্রেণিবিভাগ’ (পরিচ্ছেদ ১৭)। এর মধ্যে ‘উৎস অনুযায়ী শব্দের শ্রেণিবিভাগ’ বলে এক চিজ আছে। বহু দশক ধরে এ অধ্যায়টি ব্যাকরণ বইয়ের গোড়ায় অবস্থান করত। না করার কোনো কারণও নাই। কেউ মুখ ফুটে বলে নাই বটে, কিন্তু বাংলা ব্যাকরণ এবং বানান মূলত তৎসম ও অতৎসম — এই দুই শ্রেণিকরণের উপর ভিত্তি করেই রচিত। এ অবস্থার কিছুটা বদল ঘটে বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ব্যাকরণে; যদিও মীমাংসাটা সন্তোষজনক হয় নাই। তবে বোধ করি তার প্রভাবেই নবম-দশম শ্রেণির এ ব্যাকরণে ‘বাংলা শব্দের উৎসগত শ্রেণিবিভাগ’ বইয়ের গোড়ায় না এসে এসেছে ১৭তম পরিচ্ছেদে। আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে এ বইয়ে। বিভিন্ন অধ্যায়ে তৎসম তথা সংস্কৃত অংশকে কথিত বাংলা অংশ থেকে আলাদা করে ভাগাভাগির যে বালসুলভ ব্যাকরণনামা আমরা বহুদিন ধরে দেখে আসছি, বাংলা ব্যাকরণের নতুন পর্বে তা থেকে মুক্তির একটা চেষ্টা লক্ষ করা গেছে।

 

কিন্তু অন্যত্র ‘তৎসম’ সংজ্ঞাটিকে পাত্তা না দিলেও ১৭ পরিচ্ছেদে এসে আলোচ্য ব্যাকরণ-বইটি আর তাল সামলাতে পারে নাই। ফিরে গেছে সাবেক আমলেরও আগে।

 

তৎসম শব্দের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে : ‘প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে বিবর্তিত যেসব বাংলা শব্দের লিখিত চেহারা সংস্কৃত ভাষার শব্দের অনুরূপ সেগুলোকে তৎসম শব্দ বলে।’ (পরিচ্ছেদ ১৭, পৃ. ৫২)

 

এ সংজ্ঞা রীতিমতো ভয়াবহ। তৎসম শব্দগুলো প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে, গত দুশ বছর ধরে চর্চিত সংস্কৃতায়িত ব্যাকরণগুলোতেও এরকম কোনো দাবি পাওয়া যায় না। ভাষাবিজ্ঞানে তো নয়ই। আর সংজ্ঞার দ্বিতীয়াংশ ‘লিখিত চেহারা সংস্কৃত ভাষার শব্দের অনুরূপ’ এসেছে সম্ভবত জ্যোতিভূষণ চাকীর ফাজলামি থেকে। এ সংজ্ঞা মোটেই ব্যাকরণসম্মত নয়, এবং সে কারণেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

অথচ এ ধরনের চাপ নেয়ার কোনো দরকারই ছিল না। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা ব্যাকরণে এগুলোকে বলা হয়েছে সংস্কৃত ঋণশব্দ। এটা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। বর্তমান ব্যাকরণে অর্ধতৎসম বাদ দেয়া হয়েছে। অন্য নামে এ বর্গ বরং জরুরি ছিল। মোট কথা, এ শ্রেণিবিভাগের পুনর্লিখন আবশ্যিক। তা না হলে অন্য অধ্যায়গুলোর যে-পরিবর্তন, তার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে ওঠে।

 

৩১। এ ব্যাকরণে শব্দের শ্রেণিবিভাগ অংশে ‘পদ বিবেচনায় শব্দের শ্রেণিবিভাগ’ নামে একটা বর্গ করা হয়েছে। এটা এখানে থাকার কোনো যুক্তি নাই। শব্দ ও পদকে আলাদা রাখাই ব্যাকরণসম্মত হত। এ বিভাজন পরের অংশে নিয়ে যাওয়াই ভালো।

 

বরং পুরনো ব্যাকরণে শব্দের অর্থগত শ্রেণিবিভাগ বলে যে বস্তু ছিল, তা সংশোধন করে রেখে দেয়াই সঙ্গত মনে করি। কারণ, যোগরূঢ় শব্দের ধারণা বাংলা অর্থতত্ত্বের এক অতি জরুরি অংশ। যদিও কথাটা খুব একটা উচ্চারিত হয় নাই, কিন্তু যে কেউ সমার্থক শব্দের তালিকা দেখলেই বুঝবে, প্রধানত সংস্কৃত থেকে আমদানি করা শব্দগুলোর একটা বড় অংশই যোগরূঢ় শব্দ। এ ধারণা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী বলেই মনে করি। আগের ব্যাকরণে শ্রেণিবিভাগটা খুব চিন্তাভাবনা করে হয় নাই। কোন ভাষায় আলাপটা তুললে সবকুল রক্ষিত হয়, তা নতুনভাবে ভাবা যেতে পারে।

 

৩২। ১৮-২৬ নম্বর পরিচ্ছেদ সম্পর্কে আলাদা মন্তব্য করতে চাই না। এ অধ্যায়গুলোতে বিভিন্ন শব্দশ্রেণির যে বিভাজনগুলো করা হয়েছে, সেগুলো-যে কেজো বিভাজন মাত্র, খুব নির্দিষ্ট ব্যাকরণিক ধারণায় সিদ্ধ নয়, সে বোধ বিবরণীতে দেয়া দরকার ছিল। কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও থাকা উচিত। শুধু ভাগ করে ছোট সংজ্ঞা ও উদাহরণে ধারণাগুলো পরিচ্ছন্ন হয় না।

 

৩৩। ‘বচন’ (পরিচ্ছেদ ২৭, পৃ. ৭২) অধ্যায়ে বচনের সংজ্ঞায়নে বোধ হয় গোলমাল ঘটেছে। লগ্নকগুলোকে কি বচন বলব? তাহলে একবচন কথাটার কি কোনো মানে হয়? তারচেয়ে, আগের মতো, একত্বের ও বহুত্বের ধারণাকে বচন বলে বহুবচনের ধারণাকে লগ্নক দিয়ে ব্যাখ্যা করাই সঙ্গত। এখানে যে সংজ্ঞায়ন ও ব্যাখ্যা আছে, তা মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

৩৪। ৯২ পৃষ্ঠায় ‘বিপদ ও দুঃখ একসঙ্গে আসে’ বাক্যটি, বোধহয় ভুলক্রমে, যৌগিক বাক্য হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

 

৩৫। ‘বাক্যের প্রকাশভঙ্গিকে বাচ্য বলে।’ (পরিচ্ছেদ ৩৬, পৃ. ৯৮)
এ সংজ্ঞা গ্রহণযোগ্য নয়। পরের লাইনগুলোতে যে ব্যাখ্যা আছে, তার পরে এ বাক্য দিলে তা গ্রহণযোগ্য হত। কারণ, যে কোনো ধরনের প্রকাশভঙ্গি বাচ্য নয়। বিশিষ্ট অর্থেই কেবল পরিভাষাটা ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩৬। ‘যতিচিহ্ন’ (পরিচ্ছেদ ৩৮, পৃ. ১০৪) অধ্যায়ে বহুদিনের পুরনো সংজ্ঞাটি রয়ে গেছে। একটু সংশোধন দরকার ছিল। হাইফেনের মতো একটা আস্ত বিরামচিহ্ন আছে, যেটা যতি বা বিরামের বদলে দ্রুত পড়তে বলে। সংজ্ঞায়নে এ কথাটা উল্লেখ থাকা জরুরি। এ আলাপের আরেকটা বড় উপকার আছে Ñ ভাষার সাধারণ শব্দ আর পরিভাষার ফারাক সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পাবে।

 

৩৭। ৩৯ নম্বর পরিচ্ছেদটির নাম ‘বাগর্থের শ্রেণি’ (পৃ. ১০৭) কেন হল, তা বোঝা গেল না। এখানে তো শুধু শ্রেণিবিভাগ নাই, আরো অনেককিছু আছে। কাজেই এ নাম ‘বাগর্থ’ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
এ অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যে বলা হয়েছে, ‘শব্দের বৈচিত্র্যময় অর্থকে বাগর্থ বলে।’ কথাটা মোটেই ঠিক নয়। অর্থটা শুধু শব্দের নয়; তাছাড়া বাগর্থ হওয়ার জন্য বৈচিত্র্যের দরকার নাই, যে কোনো অর্থ হলেই হয়। লেখকরা বোধ হয় অন্য কথা বলতে চেয়েছিলেন, অমনোযোগে এরকম বাক্য উৎপন্ন হয়েছে।

 

৩৮। ‘লক্ষ্যার্থে’র আলোচনায় (পরিচ্ছেদ ৩৯, পৃ. ১০৭) প্রথম বাক্যটি এরকম: ‘বক্তা তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাচ্যার্থকে উপেক্ষা করে আলাদা অর্থ তৈরি করে নিতে পারে।’ এরকম লিখলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না, কিন্তু না লেখাই ভালো। বক্তা ভাষা ব্যবহারে এতটা স্বাধীন নয়, বা নিজের পছন্দমতো অর্থও পয়দা করে না। ভাষার মধ্যেই এ সম্ভাবনাগুলো হয় প্রকাশ্য নয় সুপ্ত থাকে। ভাষার ব্যবহার এতটা সচেতন প্রক্রিয়া নয়, যেমনটা এ বাক্য দাবি করছে।

৩৯। ‘সারাংশ ও সারমর্ম’ (পরিচ্ছেদ ৪৫, পৃ. ১৩৩) অধ্যায়ের প্রথম বাক্য এরকম: ‘গদ্যরচনার অন্তর্নিহিত বক্তব্যকে সংক্ষেপে লেখার নাম সারাংশ, আর কাব্যভাষায় লেখা কোনো রচনার মূলভাবকে সংক্ষেপে লেখার নাম সারমর্ম।’
এ বাক্যে খুবই প্রচলিত একটা ধারণাকে, বলা উচিত সরল করে বোঝার জন্য ব্যবহৃত একটি ধারণাকে, ‘জ্ঞান’ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। খুবই অন্যায্য হয়েছে। আসলে গদ্যরচনার সারমর্ম এবং কাব্যরচনার সারাংশ খুবই হতে পারে। তবে সাধারণত গদ্যের সারাংশ এবং কবিতার সারমর্ম হয়। কেন হয়, তা না-বুঝিয়ে শুধু উপরে উদ্ধৃত বাক্যটি লেখা যায় না। ‘সাধারণত’ কথাটা না বললে ওই বাক্যটি আসলে ভুলই হয়।

 

৪০। ‘চিঠিপত্র’ (পরিচ্ছেদ ৪৭, পৃ. ১৫২) অধ্যায়ে ‘ব্যক্তিগত পত্র’ অংশের একটি বাক্য নিম্নরূপ:
‘সুলিখিত ব্যক্তিগত পত্র অনেক সময়ে উন্নত সাহিত্য হিসেবেও গণ্য হয়। যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’, ‘রাশিয়ার চিঠি’, ‘জাপান-যাত্রী’ ইত্যাদি।’

চিঠিপত্রের ফর্মকে সাহিত্যে ব্যবহারের উদাহরণ হিসাবেই কেবল কথাটা বলা যেতে পারে। অন্যথায় এ কথার বিশেষ কোনো অর্থ হয় না। রবীন্দ্রনাথের এ বইগুলো স্পষ্টতই সাহিত্যিক গদ্য হিসাবেই রচিত। এগুলোকে সাধারণ অর্থে ব্যক্তিগত পত্র কিছুতেই বলা যাবে না।

 

৪১। ব্যাকরণের অনেকগুলো অধ্যায় সম্পর্কে আমরা এখানে কোনো মন্তব্য করি নাই। তার কারণ দুটি। এক. কোনো কোনো অধ্যায়ে (যেমন, ধ্বনি, বর্ণ, বিভক্তি ও কারক) যেসব পরিবর্তন করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা মোটামুটি একমত। দুই. পদশ্রেণি এবং বাক্যতত্ত্ব বিষয়ক বেশিরভাগ অধ্যায়ে খুব নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গির আগমন ঘটে নাই। কাজেই এ অধ্যায়গুলো পুরনো ব্যাকরণের আনুকূল্য অনেক বেশি পেয়েছে।

ভাষা ও বর্ণনার পরিচ্ছন্নতা যদি আমাদের আলোচ্য বইটির সবচেয়ে বড় গুণ হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় দোষ হবে বইটির তাড়াহুড়ার ভাব। একটু ঝুঁকি নিয়ে বলতে চাই, পুরো বইটিতে একটা গাইড-ভাব আছে, ঠিক পাঠ্যপুস্তকের মেজাজ পাওয়া যায় না।

সার্বিক মূল্যায়ন ও মন্তব্য

নতুন ব্যাকরণ বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ভাষার পরিচ্ছন্নতা। মোটামুটি সরল ভাষায় বোধগম্য রীতিতে অংশগুলো লেখার একটা লক্ষণীয় চেষ্টা বইটির সর্বত্র দেখা গেছে। এ ধরনের চেষ্টা আগে করেছিলেন পুরনো ধারার বৈয়াকরণ জ্যোতিভূষণ চাকী। বাংলাদেশে এ বিষয়ে বড় কৃতিত্ব পাবেন হুমায়ুন আজাদ। আজাদ পরিভাষাগুলোর স্বচ্ছতা বিষয়েও আগাগোড়া মনোযোগী ছিলেন।

 

ভাষা ও বর্ণনার পরিচ্ছন্নতা যদি আমাদের আলোচ্য বইটির সবচেয়ে বড় গুণ হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় দোষ হবে বইটির তাড়াহুড়ার ভাব। একটু ঝুঁকি নিয়ে বলতে চাই, পুরো বইটিতে একটা গাইড-ভাব আছে, ঠিক পাঠ্যপুস্তকের মেজাজ পাওয়া যায় না। আমি জানি না, বোর্ড পৃষ্ঠাসংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছিল কি না। না দিয়ে থাকলে তাড়াহুড়াটা খুবই অন্যায্য হয়েছে। আর দিলে, বোর্ডের আনুগত্য না দেখানোই উচিত কাজ হত।

 

অনেকগুলো অধ্যায় সম্পর্কে একথা বলা যাবে যে, পৃষ্ঠাখানেকের আলোচনা পড়ে যে কারো মনে হতে পারে, ব্যাকরণ-পাঠ নয়, শিক্ষার্থীর জন্য কতগুলো প্রশ্নোত্তর সরবরাহ করাই ছিল লেখাটার উদ্দেশ্য। এমনকি একটা উদাহরণ দিয়ে কথাটা বোঝানোর কোনো দায়িত্বও লেখক-সম্পাদকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেন নাই। একটু গুছিয়ে কথাগুলো উপস্থাপন করার জন্য আমাদের হাতে ঢাকা ও কলকাতার অনেকগুলো পুরনো ব্যাকরণের উদাহরণ ছিল। আর ছিল রবীন্দ্রনাথের দুটি ক্লাসিক — বাংলা শব্দতত্ত্ববাংলা-ভাষা পরিচয়। লেখক-সম্পাদকরা কোনোটাই এস্তেমাল করেছেন বলে মনে হয় না। নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ বইকে এতটা সংক্ষিপ্ত করার কি কোনো যুক্তি আছে? যেখানে অন্য বইগুলো বেশ ঢাউস হয়ে উঠছে, সেখানে বাংলা বইয়ের এতটা কৃশকায় চেহারার কী কারণ থাকতে পারে? মোদ্দা কথা হল, পরের সংস্করণগুলোতে হাড়ের সাথে কিছু মাংস যোগ করা অত্যাবশ্যক। তাতে শ্রীও ফিরবে।

 

পরিচ্ছেদ-বিন্যাসের ক্ষেত্রে আরেকটা দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। পরস্পর-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিন্যস্ত হয়েছে আলাদা পরিচ্ছেদে। এটা না করে বিষয়গুলোর মধ্যে-যে বিশেষ যুক্ততা আছে, সে কথাটা পরিষ্কার করার স্বার্থে অধ্যায়ের অধীনে পরিচ্ছেদ বিভাজন করা যেতে পারে। ধ্বনি, রূপ, বাক্য ও অর্থ অনুযায়ী অধ্যায় বিভাজনের বাস্তব সমস্যা আছে। কিন্তু একটা ইশারা থাকাই ভালো। যদি তা নাও করা যায়, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একটা অধ্যায়ের অধীনে আলাদা আলাদা পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করলে ভাষাবোধের জন্য তা খুব উপকারী হবে বলেই ধারণা করি।

 

বানান ও লিখিত ভাষার শুদ্ধতার দিকটা একেবারেই বাদ পড়েছে। কাজটা কি ঠিক হল? অন্য ক্লাসের বইতে আছে বা থাকবে, এ যুক্তিতে এ অধ্যায় বাদ দেয়া যায় না।

 

আগেই বলেছি, বাংলা একাডেমির ব্যাকরণ-প্রকল্প বাংলা ব্যাকরণচর্চায় একটা বড় এবং জরুরি পটপরিবর্তন ঘটিয়েছে। যদিও এসব ব্যাকরণে অনেক লেখকের লেখা ও নাম আছে, কিন্তু কার্যত প্রধান ভূমিকাটা-যে পালন করেছেন অধ্যাপক পবিত্র সরকার, সেটা তাঁর লেখাপত্র ও তৎপরতার সাথে পরিচিত যে কেউ আন্দাজ করতে পারবেন। বাংলা ভাষার একজন চর্চাকারী হিসাবে এখানে, এই সুযোগে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখছি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলা একাডেমির এই দুই ব্যাকরণ (প্রমিত ও ব্যবহারিক) নতুন দিশা দেখিয়েছে। বর্তমান ছাত্রপাঠ্য ব্যাকরণে ওই দুই ব্যাকরণের আরো অধিক অনুসরণ থাকলেই হয়ত বেশি ভালো হত।

3 মন্তব্যসমূহ

  1. আমরা যারা মুনীর চৌধুরী স্যারের বইটি পড়েছি, তাদের জন্যে এই নতুন বইয়ের কিছু কিছু জায়গা বুঝতে অসুবিধা না হলেও যারা সপ্তম-অষ্টম শ্রেনিতে তুলনামূলক ‘ছোট’ ব্যাকরণ বই পড়ে এসেছে তাদের জন্যে কিছু কিছু পাঠ বুঝতে অসুবিধা হবেই (উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই কারক-বিভক্তির পাঠটি, কেনো এত কমের ভেতর শুধুমাত্র সঙ্গার্থ এবং দুই-একটা উদাহরনের মাধ্যমে এত বড় একটি আলোচনা শেষ হলো তা বুঝতে পারলাম না)। স্যার, যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে হয়তো নতুন বই বের করা হয়েছে, কিন্তু আগের বইয়ের বিপরীতে এই বই যুক্তিযুক্ত নয় বলেই মনে করি। হয়তো, ভবিষ্যতে বইয়ের কিছু জায়গায় পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের প্রতি কোনার ছাত্র-ছাত্রীদের বইটি পড়ার জন্যে উপযুক্ত করে তোলা হবে।

  2. সূক্ষ্ম, সতর্ক/স-তর্ক পর্যবেক্ষণ । আ‌মি শুধু এখা‌নে যোগ কর‌তে চাই, ১. বা‌চ্যের শ্রেণি‌বিভা‌গে কর্মবাচ‌্য ঠিক মে‌নে নেওয়া যায় না, এ বা‌চ্যের আদতে দরকার নেই । বিলাস কর্তৃক বইটি প‌ঠিত হয়ে‌ছে, এরকম বাক‌্য আমরা ব‌্যবহার ক‌রি না, পড়‌তে ও শুন‌তে কেমন যা‌ন্ত্রিক, মে‌কি ম‌নে হয় (শ্রীমণীন্দ্রকুমার ঘো‌ষের ‘বাংল‌া বানান’-এ এবং তার বরাত দি‌য়ে প‌বিত্র সরকা‌রের চমৎকার একটা লেখা আ‌ছে এ নি‌য়ে) । ২. এ‌কেকটা প্রত‌্যয় এ‌কেক দ্যোতনা নি‌য়ে শব্দ গঠন ক‌রে, দ্যোতনা‌টি থাকা দরকার ছিল, না হ‌লে প্রত‌্যয় শেখার কো‌নো স‌ুফল মিল‌বে না । ৩. অব‌্যয়ীভাব সমাস বাদ দেওয়া হ‌য়ে‌ছে, কারণ তা উপস‌র্গের অধ‌্যা‌য়ে আ‌লো‌চিত হ‌বে পা‌রে, তাহ‌লে ‘যথাশ‌ক্তি’, ‘যথারী‌তি’ এগু‌লোর গঠন কিভা‌বে ব‌্যাখ‌্যা করা হ‌বে – যেখা‌নে ‘যথা’ উপসর্গ হি‌সে‌বে ব‌্যাকরণ-স্বীকৃত নয় – তা দেওয়া নেই ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here