রাইয়ান রাজীর কবিতা

বাংলাদেশের তরুণ কবিদের একজন রাইয়ান রাজী। ব্যক্তিক জীবন ও অভিজ্ঞতার প্রতিটি মুহূর্তকে দার্শনিকভাবে দেখার ঝোঁক তার কবিতায় দৃশ্যমান। বিষণ্ণতার চাদরে মোড়া কবিতাগুলোতে পাওয়া যাবে প্রজ্ঞাপূর্ণ এক আন্তরিক উচ্চারণ।

 

অস্তাচল

অশ্রু দেখিয়ে হার মানানোর মতো,

জাদুকরী কোনো টুপির ভেতর থেকে

বের হয়ে এসে কোনো ধবধবে খরগোশ

কখনোই কোনো চমক জাগাবে না।

 

পাথুরে পথকে পেরিয়ে তোমার শহর।

সেখানে মঞ্চে প্রতিদিন এসে

টুপি খোলে জাদুকর!

 

আমার টুপিতে বহু বছরের নোনা-

নিয়তি মাথায় একঘেয়ে সিসিফাস।

দর্শক তুমি, পূজনীয় কোনো দেবকন্যার মতো-

স্বাভাবিক থাকি

জানতে না দিয়ে গোধূলির হাঁসফাঁস।

 

গোধূলি বেলায় ছায়ার দৈর্ঘ্য কমে।

তপ্ত জমিন থাকবে না সাথে জেনে,

একা একা সে নিজের দেহের

ভেতরে ফেরত আসে।

 

অপার গন্তব্যে

রাত্রির ধৃষ্টতা সরিয়ে

তোমার কাছে পৌঁছুতে চাই।

এ রাত্রি নীরবতার তীরে

দাঁড়ানো লাঠি ঠোকা বৃদ্ধ।

জলের আয়নায় দেখে নেয়

পুরাতন জ্যোতি কতটা দৃশ্যমান করে

প্রতিফলন, অপার অন্ধকারে।

 

ভাষার সকল শব্দ বেঁধে রেখেছে

অসমাপ্ত নৌকাকে।

কুঁচকানো চামড়ার তলে

এ হাত অশ্রুমালা।

দাঁড় বেয়ে ওপারে, তোমার সৈকতে

শুয়ে বাজাতে চায় গত জন্মের বেহালা।

স্মৃতির পরপারে বয়স্ক ত্বকে লাবণ্য

দেখা দেবে বহুকাল পরে।

তখনও স্মৃতিরা জন্মায়নি বলে

আসেনি অথর্ব অন্ধকার,

বালকের শুধু নির্ভার রৌদ্রস্নান।

বড় হবার ইচ্ছেয় কাগজের নৌকা

বালক নাবিকের কী নিষ্পাপ জলযান!

 

জীবনে তাদের নেই নিঃসঙ্গতা

আমরা আমাদের কতগুলো জীবনকে মাটিচাপা দিই?

বীজ থেকে তবু হঠাৎ একদিন ফোটে লাল ফুল

অথচ তখন আমরা পুষ্পপ্রেমী নই

নাসারন্ধ্র ঢেকে গেছে ভিন্ন সুবাসে …

অসময়ে কেন সে আসে?

এতকাল পরে

কী করে

আবার করবে ব্যাকুল?

কখনো উঠে আসে পোকা

এরা দলগত জীব,

জীবনে তাদের নেই নিঃসঙ্গতা।

আমাদের আছে,

আমাদের মৃতদেহ খেয়ে

সেসব কীটেরা বাঁচে

 

মুনিয়াদের জন্য

কখনো কখনো এরকম মুহূর্ত আসে। মাথার ভেতর খুব ভার ভার লাগে। মনে হয়, বিশাল এক পাথর গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। আমার চোখের ডালে কয়েকটা মুনিয়া পাখির বাস। আমি সাধারণত হেডফোন ব্যবহার করি না। আমাকে দেখে অন্যেরা হয়তো খানিকটা পাগল পাগল ভাবে। আধপাগলেরাই তো মনে মনে গান গেয়ে একা একা মাথা দোলায়। কিন্তু মুনিয়াদের নিভৃত অবদান কারও চোখে পড়ে না। তাদের গান কারও কানে পৌঁছে না। শুধু আমার অভাব দূর হয়ে যায়। মানুষের গান আমি খুঁজতে যাই না।

 

কিন্তু যখন এরকম মুহূর্ত আসে, পাখিগুলো সম্ভবত ভয় পেয়ে যায়। যে আকাশে পাথর ঝুলে আছে, তার তলায় বসে গান আসে না। সেখানে সকল কণ্ঠে থাকে শুধু বাঁচার আকুতি। মুনিয়াগুলিও উড়ে যায় কোনো আলোকিত আকাশে। আমি শূন্য চোখে সকল সুরকে উধাও হয়ে যেতে দেখি।

 

আমি ভালো ভালো কথা ভাবতে চাই। ভাবতে চাই, আমার মুনিয়াগুলি অন্য কারও ভেতর আশ্রয় পেয়েছে। কারও কণ্ঠে গান হয়ে বেঁচে আছে। তার মগজ এক নিরাপদ আকাশ! আমার মগজ এক উপলখণ্ড। এরকম মুহূর্তে ভালো ভালো চিন্তা আসে না। চিন্তাজুড়ে শুধু পাথরচাপার পূর্বাভাস।

 

এইসব মুহূর্তে আমি আমার মুনিয়াদের গান শুনতে চাই। আমার ভীষণ পাগল পাগল লাগে। অন্যেরা তা টের পায় না। তারা দেখে না, উড়ে গেছে আমার চোখের জ্যোতি। আমাকে তারা দেখে, তাদেরই মতো শান্ত প্রকৃতস্থ হয়ে গেছি। অবশ্য পাথরে নির্মিত হলেও প্রতিটি ভাস্কর্যেরই নিজস্বতা আছে। নাহলে তারা কেন বোঝে না, একটা একটা মুনিয়া উড়ে গেলে আমি একটু একটু উন্মাদ হয়ে যাই? হেডফোন গুঁজে খুঁজতে থাকি তাকে, যার চোখে বৃক্ষের ছায়া পেয়েছে আমার মুনিয়ারা।

 

 বালুতটে শুয়ে আছে বিরান সকাল

এইখানে কেউ আসে না। জাহাজঘাটায় শ্যাওলা বলে দিচ্ছে, পৃথিবীর এই কোণে ছোট মাছের রাজত্ব। নবজাতক মাছেরা হয়তো মরিচার গন্ধ ভালোবাসে। অথবা আয়নায় নিজেদের ধাতব আঁশ দেখে ভাবে, বয়সের সাথে সাথে তাদের শরীরেও মরিচার জন্ম হয়। মরিচা মানে তাদের কাছে বয়স, বয়স্ক সময়।

 

আমরা সেই হলদেটে আয়নার পারা। আমাদের গা ঘেঁষে মাছগুলি দেখে নেয়, চকচকে পিঠ, নিজেদের উৎসুক চেহারা। আমরা কিছু জলরঙা সবুজ পাথর। স্মৃতি আঁকড়ে আছে ঝাপসা নাবিকের নোঙর। খালাসের কালে গায়ে ঝরে পড়েছিল মসলা আর মোহরের স্বাদ। শূন্য বোতল থেকে দুয়েক বিন্দু নাবিকের অবসাদ। আজ তারা কোথায় গিয়েছে চলে? হয়তো অন্য কোনো পৃথিবীতে, মর্মর দেয়াল সমুদ্রতীরে বসে আছে সেখানে সুরম্য পা ঝুলিয়ে।

 

বার্তাবাহক মীনশিশু, তোমার পৃথিবী এখনও সম্ভাবনায় ভরা। এখানে কেউ থাকে না আমাদের মতো কিছু অনড় শ্যাওলা-পাথর ছাড়া। চলাচলের সকল জলপথ উন্মুক্ত তোমার অভিযানে। তুমি যাও, শামুকের সাথে খোলসবন্দি থেকো না এইখানে। কাপ্তানকে বলো, নাবিকের উৎসব-অবসর-পানাহার হয়ে গেছে অব্যবহৃত কঙ্কাল। হীরকখনি নেই, বালুতটে শুয়ে আছে বিরান সকাল। লৌহখণ্ড ইতস্তত কিছু, কে যেন করে গেছে তাদের সুরতহাল! যাও, পেশাদার জালে পেঁচিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে দাও মরিচামাখা লাশের ঘ্রাণ। ঝাঁক বেঁধে জানাও, তাদের অতীত এখন এক প্রস্তরীভূত গোরস্থান। অবকাশের মোহে ভুলে থেকো না নিজ বংশধারা। এখানে তোমার সহোদরও ছিল, তাকেও দিয়েছি অনর্থক পাহারা। তুমি যাও, চলে যাও তোমার নিয়তির কাছে। সিরামিক প্লেট কিংবা অ্যাকুরিয়ামে। অনেক সুসভ্য নুড়ি তোমাকে সঙ্গ দেবে চকচকে কাঁচবাক্সের ছাঁচে। অথবা নাবিকের সাথে মর্মর হয়ে যাও হলদেটে আগুনের আঁচে।

 

বিলীনরেখা

সমুদ্রের কাছে এসে শব্দ থমকে গেছে।

সাঁতার জানা নেই, শব্দেরা ঢুকে গেছে

মৃত শামুকের খোলসে। ধীরগতি উপমা,

তোমাদের কুড়াতে এসে বালি মেখে

কবি কি পায় নাবিকের ভাসমান ঠিকানা?

আমিও গুটিয়ে নিচ্ছি সৌহার্দ্যের পাজামা —

গাংচিল দেখতে দেখতে আজ চলে যাব

ঝিনুকের রুপালি পেটে। চঞ্চল কাঁকড়া

খুঁজে নেবে আমার পিচ্ছিল শব্দাবলি।

নৈঃশব্দ্যে তলিয়ে যাবার আগে আমরা

মুক্তা জন্মাতে এতবার ব্যর্থ হই! অচেনা

শঙ্খ দেয়ালে বিস্মৃতির নোনা প্রতিধ্বনি তুলি

 

প্রত্যাবর্তন

বাকিটা অদৃশ্যমানতা অন্ধ কিংবা সৈকতে বেহালাবাদকের জন্য রাখা যেতে পারে। কিন্তু আমার তল্লাটজুড়ে সকালের সামুদ্রিকতা কিঞ্চিৎ মাংসল। গাঙচিলের সফেদ গলে গলে পড়ছে ঝিনুকের মুখে, এসে গেছে আমারও বেড-টি। সাইট্রাস ঝাঁঝে কেইবা আর মুক্তা পোষে?

 

হে আমার আজকের অবকাশ, ওই যে দ্যাখো, দূরবীনের পাশে রঙচটা কম্পাস — নিজের মূল্য বুঝে, চাইলে তুমি আরও সদয় হতে পার। অনেক হাঙর চলে গেছে আমার জাহাজের তলা ঘেঁষে। তাজা পত্রিকা হাতে প্রতিনিয়ত তোমাকে পেয়েছে যে, কোনো সংবাদে সেসব সে মুদ্রিত দেখেনি। দেখেছে মুদ্রাস্ফীতি, স্বর্ণমোহর থেকে গেছে সমুদ্রতলায়। মদ্যপ বাচালের জোয়ারে তলিয়ে গেছে টুকটাক না-বলায়।

 

আমিও তো কোনো টিনটিন নই। আবলুস কাঠের তাকে সাজানো ছিল না আমার দুর্ধর্ষ অভিযান। অংক না-জানা দোকানির মতো লোকসানে চলে গেছে অসংখ্য লেনদেন, নতুন ফ্রকের বায়নায় বেড়ে গেছে দোকানিকন্যার অদৃশ্য অভিমান। জানা না হোক সেসব কিছুই, রোদচশমার ঘেরাটোপে সব থেকে যাক অদেখা। ঘ্রাণ পাচ্ছি, তৈরি হচ্ছে অবিকল সিন্দাবাদের নাস্তা। মোনালির থেকে দূরে সেলন বন্দরে আজকে শুষে নিচ্ছি টাটকা রুটি আর মসলাদার মাংসের পোড়া পোড়া ঘ্রাণ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here