নদ ও নদী : দ্বিধা কেন?

ব্রহ্মপুত্র নদ, ব্রহ্মপুত্র নদী নয় কেন? পদ্মা নদী, পদ্মা নদ নয় কেন? নদ ও নদীর ব্যবহার নিয়ে অনেক প্রশ্ন; সেগুলোর জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন জাফর ইকবাল

নদ এবং নদী এই দুটো শব্দের ব্যবহার নিয়ে আমাদের অনেক সময়ই দ্বিধায় পড়তে হয়। কোথায় নদ হবে আর কোথায় হবে নদী? আমাদের মনে আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায় — ‘কেন নদ হবে আবার কেনই বা নদী?’ ছোট বেলা থেকে আমরা এর সোজাসাপটা একটা উত্তর আমাদের শিক্ষক বা পরিচিত জনের কাছ থেকে জেনে এসেছি, ‘যে নদীগুলোর শাখা নদী আছে বা উপনদী আছে সেগুলোকে নদী বলে আর যেগুলোর শাখা নদী বা উপনদী নেই সেগুলোকে বলে নদ।’ নদ এবং নদী শব্দ দুটোর ব্যবহারে উল্লিখিত মতবাদটি ভ্রান্ত ধারণা মাত্র।
প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী বা উপনদী থাকলেও এটি নদ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। তাহলে নদ-নদী ব্যবহারের সঠিক কারণ আমাদের জানা দরকার। আর এজন্য প্রথমেই আমাদের থাকতে হবে বিশেষ্য, বিশেষণ ও লিঙ্গ বিষয়ক ধারণা। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের অধিকাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংস্কৃত বা তৎসম ভাষা হতে আগত। সংস্কৃত ব্যাকরণে বিশেষ্য, বিশেষণ এবং লিঙ্গের ব্যবহার সুনির্দিষ্ট। যেমন : বিশেষ্যপদটি যদি পুংলিঙ্গ হয়, তবে তার বিশেষণ পদটিও হবে পুংলিঙ্গ; আবার বিশেষ্য পদটি যদি স্ত্রী লিঙ্গ হয়, তবে তার বিশেষণ পদটিও হবে স্ত্রীলিঙ্গ বাচক। Professor শব্দটি সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে পুরুষবাচক শব্দের পূর্বে অর্থ হবে অধ্যাপক, নারীবাচক শব্দের পূ্র্বে অর্থ হবে অধ্যাপিকা, Teacher শব্দটি সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে পুরুষবাচক শব্দের পূর্বে অর্থ হবে শিক্ষক, নারীবাচক শব্দের পূর্বে অর্থ হবে শিক্ষিকা।
সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে বিশেষ্যের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষণের লিঙ্গভাগী হয়ে থাকে। সংস্কৃত ব্যাকরণে নদ পুরুষবাচক শব্দ আর নদী নারীবাচক শব্দ। যেসকল নদীর নাম পুরুষবাচক সেগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে নদ। যেমন : ব্রহ্মপুত্র নদ, কুমার নদ, নীল (নিল) নদ। যেসকল নদীর নাম নারী বাচক তাদের সাথে হবে নদী। যেমন- পদ্মা নদী, মেঘনা নদী, যমুনা নদী, ধলেশ্বরী নদী। এখন প্রশ্ন হলো কোন নামটি নারীবাচক আর কোনটি পুরুষবাচক তা চিনবো কীভাবে? এক্ষেত্রেও আমাদের সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসরণ করতে হবে। যেমন : যেসকল শব্দ অ-কারন্ত সেগুলো পুরুষবাচক শব্দ, আর যেগুলো আ, ই বা ঈ-কার প্রত্যয়যুক্ত সেগুলো নারীবাচক। যেমন : ব্রহ্মপুত্র, কুমার বা নীল (নিল) শব্দগুলো অ-কারন্ত, তাই এগুলো পুরুষবাচক শব্দ। আবার পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এগুলো আ-কারন্ত শব্দ, আবার গৌরী, ইছামতি, ধলেশ্বরী এগুলোতে নারীবাচক ই/ঈ-কার প্রত্যয় যুক্ত শব্দ তাই এগুলো নারীবাচক শব্দ।
বাংলা ব্যাকরণ এক্ষেত্রে ভিন্ন ধারণা দিয়ে থাকে। যেমন : প্রফেসর শব্দের বাংলা অর্থ শুধু অধ্যাপক, টিচার শব্দের অর্থ শিক্ষক। বাংলায় অধ্যাপিকা বা শিক্ষিকা শব্দের ব্যবহার যেমন নেই, ঠিক সেভাবেই সুন্দরী শব্দের ব্যবহারও নেই। যেমন- সংস্কৃত ভাষায় ‘অধ্যাপক রহিম ও অধ্যাপিকা রহিমা’ অথবা ‘সুন্দর বালক ও সুন্দরী বালিকা’ হলেও বাংলায় কিন্তু ‘অধ্যাপক রহিম ও অধ্যাপক রহিমা’ এবং ‘সুন্দর বালক এবং সু্ন্দর বালিকা’ হবে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে বাংলা ব্যাকরণ অনুসারে ‘অধ্যাপিকা রহিমা’ বা ‘সুন্দরী বালিকা’ অশুদ্ধ বলে গণ্য। বাংলা স্ত্রীলিঙ্গের ক্ষেত্রেই স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ ব্যবহার করা অশুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং ক্লীবলিঙ্গের ক্ষেত্রে স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ ব্যবহার শুধু ভুলই নয়, বড় ধরনের ত্রুটিও বটে। এদিক বিবেচনায় কোনো শব্দের সাথেই নদ বা নদী বিভাজন করে ব্যবহারের সুযোগ নেই।
এবার বাংলা লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা যাক। বাংলা ব্যাকরণ অনুসারে লিঙ্গ চার প্রকার। যথা : পুংলিঙ্গ: যে শব্দ দ্বারা পুরুষ জাতিকে বোঝায় তাকে পুংলিঙ্গ বলে। যেমন : বাবা, ভাই, মামা ইত্যাদি। স্ত্রীলিঙ্গ: যে শব্দ দ্বারা নারীজাতিকে বোঝায় তাকে স্ত্রীলিঙ্গ বলে। যেমন : মা, মেয়ে, বোন ইত্যাদি। উভয়লিঙ্গ : যে শব্দ দ্বারা নারী এবং পুরুষ উভয় জাতিকে বোঝায় তাকে উভয়লিঙ্গ বলে। যেমন : সন্তান, কবি, লেখক ইত্যাদি। ক্লীবলিঙ্গ: যে শব্দ দ্বারা নারী বা পুরুষ কিছুই বোঝায় না তাকে ক্লীবলিঙ্গ বলে। যেমন : নদী, পুকুর, কলম, বই ইত্যাদি।
বাংলা লিঙ্গ বিশ্লেষণের দিক হতে দেখা যাচ্ছে ‘নদী’ ক্লীবলিঙ্গ। যার নারী বা পুরুষ বলে পৃথক কোনো পরিচয় নেই। সুতরাং এখানে নদীর পুংলিঙ্গ নদ নির্ণয়ের সুযোগ নেই। এজন্যই বাংলায় যে নদীরগুলোর নাম তার নিজস্ব সেগুলোতে নদ শব্দের ব্যবহার নেই। যেমন : তিতাস একটি নদীর নাম, নাফ নদী বাংলাদেশ ও মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত, কুমার নদীটি ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিতাস, নাফ ও কুমার সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে পুরুষবাচক এবং এদের পরে হওয়ার কথা নদ। কিন্তু বাংলা ব্যাকরণ অনুসারে এগুলোর শেষে নদী শব্দটি যুক্ত হয়েছে। আমরা কয়েকটি নদীর সাথে নদ শব্দের ব্যবহার করে থাকি। যেমন : ব্রহ্মপুত্র নদ, নীল (নিল) নদ। এগুলো মূলত সংস্কৃত বা হিন্দি ব্যাকরণ ও ভাষার অনুকরণে হয়েছে। বাংলা ব্যাকরণ এগুলোকে সমর্থন করে না। আরও একটি তথ্য দিয়ে রাখি ‘রূপ (পুরুষ) সাহা’র নাম অনুসারে রূপসা নদী নামকরণ হলেও আমরা একে নদ বলি না। কারণ আমাদের বাংলা ব্যাকরণ অনুসারে নদীকে আমরা পুং বা স্ত্রী লিঙ্গে পৃথক করে ব্যবহার করি না। বাংলা কোনো গানে নদ শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায় না, যেমনটা নদী শব্দের ব্যবহার পাই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here