বীজ ।। কিস্তি : ৬

বীজ উপন্যাসে প্রকাশিত হয়েছে এক তরুণীর তীব্র সংবেদনা; পর্যবেক্ষণশীল চোখ দিয়ে সে দেখেছে নিজের ভেতর ও বাহির। মনিরুল ইসলামের লেখা এই উপন্যাস আপনাকে নিয়ে যাবে সমকালীন জীবনের অন্দরমহলে।

 

বৃহস্পতিবারের রাতটা আমার খুব প্রিয়। ভেতরে ভেতরে উৎসব-উৎসব একটা ভাব কাজ করে। আজ ক্ষুধা লেগে গেছে। বাসায় ঢুকতেই পেটটা জানান দিল। ঝটপট গোসল করে নিলাম। বাসা জুড়ে মসলার গন্ধ। ব্লেন্ডারে মা ব্লেন্ড করছে। রিয়ার কথা ছিল আসার। আসবে না। আসা-যাওয়ার ঝামেলা। এছাড়া টার্মটেস্ট আছে নাকি একটা। রিয়ার অ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার নেই তো কারো সঙ্গে! কোনো শোভনের সঙ্গে! খেতে বসলাম। বললাম, ক্ষুধা লেগে গেছে আমার। বাবা কি একটা হিসাব-টিসাব করছিল। এসে বসল। দাদিও করছিল কিছু একটা। খাবার একটু আগে আগে হিয়ার চিয়ার-আপ টাইম। ও টিভি দেখছিল। চলে এল। মা একটু পরে খাবে। দাদির ঔষধ খাওয়ার ব্যাপার আছে, তাই ঠিক টাইমে খেতে হবে। মা চলে এল তদারকি করতে। মার তদারকির দরকার আসলে নেই। তবু বিষয়টা একটা প্রথার মত হয়ে গেছে। খাবার সময় কাছে না-থাকলে মা নিজেও শান্তি পায় না। ভাবটা এমন যেন কী খেলাম, না-খেলাম।

 

মসজিদের মুয়াজ্জিন আর পাঁচজন এতিমকে দাওয়াত করে এসেছে বাবা। নামাজের পরপরই আসবেন। ঘরদোর সকাল সকালই গুছিয়ে ফেলতে হবে। কোথাও মাকড়সার ঝুলটুল থাকা যাবে না। ড্রয়িংরুমেই যেহেতু বসবেন। সোফার নিচটাও পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। সুগন্ধি মিশিয়ে মেঝেটাও মুছতে হবে। সোফার কভার-টভার ধুয়ে ফেলা হয়েছে আজকেই। যখন যার যেটা মনে হবে, সঙ্গে সঙ্গে তা করে ফেলতে হবে। বাবার নির্দেশ। রান্না-বান্নার সরঞ্জামাদি আনা হয়েছে সব। দইটা কাল আনা হবে। বাবা আজকে সময় পায়নি। আসলে সময় নয়, মনে ছিল না। পিরিয়ড এখনো ভালো হয়নি আমার। নামাজের বিষয়টা কি হবে, বুঝতেছি না।

 

খাওয়ার পর পর খুব ক্লান্ত লাগে। বিশেষ করে বিছানায় শুইলেই গা গলে পানি হয়ে যায়। হিয়া আসলো ঘরে। কী একটা কঠিন ইংরেজি বুঝতেছে না। বললাম, নিয়ে আসো। ইংরেজি একটা ইডিওম। সরাসরি অর্থ করলে মিনিং আসে না। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে আমিও হিয়ার মত ছিলাম। হিয়ার গা থেকে ইন্টারমিডিয়েটের গন্ধ আসছে। কী সুন্দর গন্ধ! এটাকেই বোধ হয় মেয়েলি গন্ধ বলে। কেবল হিয়া টের পাবে না। কিন্তু বাকি সবাই পাবে। হিয়াকে দেখে আমার মায়া হল খুব। চুমু দিতে ইচ্ছা করল। দেওয়া যাবে না। বড় হয়ে গেছে। তার চুল থেকে তেলের গন্ধ আসছে। মা জোর করে দিয়ে দেয়। হিয়া কি আসলেই ইংরেজি বুঝতে এসেছে। নাকি আমার সঙ্গে সময় কাটাতে এসেছে। হিয়া কাউকে পছন্দ-টছন্দ করে নাকি। সর্বনাশ। আরো আগেই এ-ব্যাপারে আমার সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। এখনকার মেয়েরা নাকি অল্পেই পেকে যায়। ওর কি কোনো ইঁচড়ে পাকা বান্ধবী নেই! তার সঙ্গে ও কি কোনোদিন পর্ন দেখেছে! পর্ন দেখে অপরাধবোধে ভুগেছে। অনেক প্রশ্ন জেগে উঠল! ওকে একদিন ব্রিফিং দেওয়া দরকার। ও আমার বোন। আমাদের শরীরে একই রক্ত। ওদের আমি ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। হিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে আমার। আমি তো এমন ছিলাম না। আমি ছিলাম ওভারকনফিডেন্ট একটা মেয়ে। পাত্তাই দিতাম না কাউকে। ঝাড়ির ওপরে রাখতাম ছোটো ভাইবোনদেরকে। এখন কেমন জানি ইমোশনাল হয়ে গেছি। ওরা কি এখনো আমাকে ভয় পায়?

 

‘তুমি কি এটা বুঝতেই এসেছ? নাকি অন্যকিছু?’, মুখে একটা নকল বিরক্তির ভাব নিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম। আপনজনদের কাছে ভালোবাসা প্রকাশ করতে নেই। অপ্রকাশিত ভালোবাসাই সুন্দর। বললো, ‘তোমার সঙ্গে তো কথাই হয় না। ব্যস্ত থাকো খুব। অবশ্য আমাদের জন্যই তোমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়।’ আমি হা হা করে হাসলাম। বললাম, ‘কে শিখায়া দিছে বলো? মা, না দাদি? বলো?’ ও মনে হয় লজ্জা পেল। আমি বললাম, ‘বসো।’ বিছানার কোনায় সে বসলো। আমি বললাম, ‘বসে থেকে কী করবো? বসে থাকা বিরক্তিকর। তাই চাকরিটা করছি। তোমাদের ধারণাটা ভুল। তবে তোমার কথা শুনে কেমন ভালো লাগলো! তুমি খুব ভালো মেয়ে। ভালো করে পড়াশোনা করবে। যাও।’ স্টুডেন্টদের মত চলে যাচ্ছিলো হিয়া। যেন আমি তার কলেজের ম্যাডাম। পারলে সালাম দিয়ে বলে, দোয়া করবেন ম্যাডাম। বললাম, ‘শোনো, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। দিন দিন সুন্দর হয়ে যাচ্ছো তুমি।’ ও চলে গেলো। আরও বড় হয়ে ওঠবে সে। যেখানে যতটুকু দরকার মাংস জন্মাবে। প্রকৃতি তাকে তৈরি করছে। কার জন্য তৈরি করছে? আরেকজন শোভনের জন্য?

 

আজ জলদিই ঘুম এসে যাচ্ছে। আর খুব ক্লান্ত লাগছে। আর খুব ভালো লাগছে। বিসিএস বিসিএস করে মাথা খেয়ে ফেলতো শোভন। কেন জানি আমার সবসময়ই মনে হতো, আমার দ্বারা ওসব হবে না। কোনো অ্যাম্বিশন নেই বলেই হয়তো চাকরিটা খারাপ লাগে না। সর্বোচ্চ, ভালো দেখে একটা কলেজে ঢুকে যাবো। জীবন এভাবে পার হয়ে গেলেও খারাপ না। আমার বিয়েসাদি নিয়ে বাবা খুব চিন্তিত, বোঝা যায়। এত চিন্তিত হওয়ার আমি কিছু দেখি না। বিয়ে হয়ে গেলে তো গেলোই। আর তা যে-কারো সঙ্গেই হতে পারে। কিন্তু বিয়ে মানে আসলে কী? হাজবেন্ডের সঙ্গে সেক্স করে সন্তান জন্ম দেওয়া? পরে সেই সন্তানকে আশ্রয় করেই বাকি জীবন পার করে দেওয়া? তাহলে বিয়ে ছাড়াই তো জীবন বেশ কাটছে!

 

ফেসবুকে বারবার বিভাস লিখে সার্চ দিচ্ছি। ‘পিপল ইউ মে নো’তে কত বিভাসই যে এসেছে। কিন্তু বিভাস দা’কে খুঁজে পাচ্ছি না। উনি আবার ইমরানের মত ভিন্ন কিছু প্রোফাইল পিক দিয়ে রাখেননি তো। ইমরানের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করলাম। ওর ফ্রেন্ডলিস্টে তো বিভাস দা’র থাকার কথা। কিন্তু নেই। মোজাম্মেলের ফ্রেন্ডদের মধ্যেও উনি নেই। শান্তা আপু, জেসমিন দি’র ফ্রেন্ডদের মধ্যেও নেই। উনার কোনো অ্যাকটিভিটিই নেই। থাকবে না কেন। উনাকে না-পেয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে খুঁজতে লাগলাম আমি। নেই তো নেই। উনার সম্পর্কে আসলে জানা দরকার। কী নিয়ে থাকেন, কী করেন! উনার কথাবার্তা কেমন জানি একটু ভিন্ন ধাচের। কিন্তু কী অমায়িক! আসলে উনাকে এভাবে চার্জ করে কথা বলা ঠিক হয়নি। সিনিয়র মানুষ। আমাকে একা পেয়ে উনি তো আর প্রেমের প্রস্তাব দেননি। কী আশ্চর্য, উনি সরি বললেন। আমি যে উনাকে অপছন্দ করি, আমার চোখমুখ দেখে উনি তা বুঝতে পেরেছেন। উনার ধারণা, উনার কোনো ভুল আচরণের কারণেই তা হয়েছে। মানুষ কোথায় ভুল করেও তার পক্ষে সাফাই গায়। আর তিনি সরির বস্তা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনও হতে পারে, আমাকে নিয়ে উনার কোনো টার্গেট আছে, তাই ভালো মানুষ সাজতে উনার এই ফন্দি। একদিন দেখা যাবে, প্রস্তাব দিয়ে বসেছেন। অবশ্য এটুকু বিশ্বাস উনার প্রতি আছে যে, প্রস্তাব দিলেও তা ভদ্রভাবেই দিবেন। উনার সঙ্গে আমার আসলে এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করাই ভালো হবে।

 

বিভাস দা’র একটা কথা বুঝলাম না। আমি ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম মানে! উনি কীভাবে জানলেন? কাউকে তো বলিনি আমি। এমনকি মোজাম্মেলকেও না। এজন্যে উনি আমার সঙ্গে কথাও বলতে চাচ্ছিলেন। উনার কথা বলার সঙ্গে আমার ঝামেলার সম্পর্ক কী? বিভাস দা’ই কি শোভনের সেই ফ্রেন্ড? উনি কি মিরপুর থাকেন? হঠাৎ ভয়ে শরীরটা আমার একদম ঠান্ডা হয়ে গেলো।

 

সোয়া বারোটার মত বাজে। এখন কি মোজাম্মেলকে ফোন করা উচিত হবে। ফোন দিয়ে কি জিজ্ঞাসা করব? বিভাস দা’ কোথায় থাকে? মানে কী? বুক ধুকপুক শুরু করছে। মনে হচ্ছে কান্না করার শক্তিটাও আমার নেই। কিছুই বুঝতে পারছি না। মনটা আর্তনাদ করে ওঠলো, ‘হে খোদা, তুমি আমাকে মাফ করে দাও। যে ভুল আমি করেছি, আমি জানি, সেই ভুলের কোনো মাফ নেই। তুমি মাফ না-করলে আর কে করবে! হে খোদা, বিভাস দা’ যেন শোভনের সেই ফ্রেন্ডটা না-হয়। হে খোদা, কোনোভাবেই যেন বিভাস দা’ শোভনের সেই ফ্রেন্ড না হয়। বিভাস দা’ যাতে আমার কোনো ক্ষতি করতে না-পারে।’

 

‘Ki obostha Mojammel, ghumiye porco naki? Tomar kotha mone porlo, vablam janai. Tomake to thanks deoya hoynai, bestota thakar por o songo dile. Bivas da khub interesting lok, kemon gyani gyani kotha bolen. Khub valo legece. Uni thaken kothay? Amake songo dilo, ami abar unake deri koriye dilam kina etai vabcilam.’

ও লিখলো,

‘Ha ha ha.. interesting. Rat 12tar somoy mone porlo amake.. r songe songe sms o pathiye dile! Khub valo laglo tomar sms peye. Onekei eta korbe na. Boltei hobe, tumi khub sorol moner manush. Bivas da puran dhakar dike thake. Unar kotha bole sesh kora jabe na. Boss lok ekta.’

 

এককথায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন মনে হচ্ছে, আসলে এত ভয় পাওয়ারও কিছু ছিলো না। বেছে বেছে উনিই হতে যাবেন কেন। আমার সেন্স আসলে কাজ করছিলো না। হঠাৎ করেই জট পাকিয়ে ফেলেছিলাম সব। ভূত দেখার মত চমকে গিয়েছিলাম। বিদায় নিয়ে নিলাম মোজাম্মেলের কাছ থেকে।

‘OK. Valo theko Mojammel. Tumiyo khub sorol moner manush. Good Night J’

 

সবাই উনাকে খুব পছন্দ করে। উনাকে তাহলে আমার ভালো লাগে না কেন! নাকি আমার চিন্তাতেই সমস্যা। আসলেই তো! এখন পর্যন্ত উনার কোন আচরণটাকে আমি ভুল বলতে পারবো? আজকে যা যা কথা হলো উনার সবগুলো কথাই ছিলো অমায়িক। আমিই বরং চার্জ করে বলেছি। অথচ আজকেই, বলতে গেলে, প্রথম কথা হলো উনার সঙ্গে।

 

মানসিকভাবে আমি আসলে পুরোপুরি সামলাতে পারছি না নিজেকে। বাইরে বাইরে যতটা না, তার চেয়ে বেশি ভেতরে ভেতরে গুলিয়ে ফেলছি সব। যতই চেষ্টা করছি সব সামলে চলার, ততই যেন সব জরাপাল্টা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব তো মোটামুটি ঠিকই আছে। কেবল বিভাস দা’র সঙ্গেই আজকে একটু কড়াভাবে কথা বলে ফেলেছি। তবু তো ঠিকই আছে। উনি তো কিছু মনেই করেননি। আমি আসলে যে-কোনো একটা বিষয় নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করে ফেলি। এটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। বিভাস দা’ আমার সঙ্গে কী কথা বলতে চায়, তা হয়তো আমার শোনা উচিত। অনেক আগেই নাকি কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ প্রথম দিককার সেই বাজে দিনগুলোতে। কিন্তু বলেননি, কারণ সময় আসেনি। অর্থাৎ আমার সঙ্গে কথা বলার উনি তখন কে! তখন নিশ্চয়ই আমি উনার সঙ্গে সেই ব্যাপারে একটা কথাও বলতাম না। তাই তিনি অপেক্ষা করেছেন। এবং সেই অপেক্ষার পালা এখন শেষ হয়েছে। এই তো বোঝালেন উনি। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, অন্তত এই একটা লোকের ব্যাপারে আমাকে সচেতন থাকতে হবে। উনার প্রতিটি চাল আমার অচেনা। সবচেয়ে ভালো হয়, উনাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা। যে যতই ভালো বলুক। এটাই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান।

 

পড়ুন ।। কিস্তি : ৫

বীজ ।। কিস্তি : ৫

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here