হাওয়ার্ড মামফোর্ড জোনস (১৬.০৪.১৮৯২-১১.০৫.১৯৮০) একজন কবি, জীবনীকার, সমালোচক এবং সাহিত্যের ঐতিহাসিক। কিন্তু আজকালকার বেশিরভাগ লেখকের সর্বোপরি সকল বিদ্বানের মতোই, তিনিও একজন শিক্ষক এবং একজন সুশিক্ষকের মতোই তিনি তার বিষয় ইংরেজি ছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে উৎসাহী এবং অনেক বেশি জানেনও। “লোহার দড়ি” (THE IRON STRING : 1950) মূলত হার্ভডে যেখানে তিনি শিক্ষকতা করতেন সেখানে কিছু শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি বক্তৃতা; বক্তৃতাটির বিষয় শুধু সাহিত্য নয় সমাজও। এবং এর মধ্যে এমন কিছু তাৎপর্যও আছে যাকে এক সময় জোনস তার “প্রধান কারিগরি লক্ষ্য” বলে অভিহিত করেছিলেন: “গদ্যের একটি রীতি গড়ে তোলা যা তুলনামূলকভাবে জটিল কোনো ধারণাকে সাধারণ শ্রোতা দর্শকদের সামনে অতিসরলীকরণ না করেও নিজের উচ্চাসন বজায় রেখেই পৌঁছে দিতে পারে।” মামফোর্ডের প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন কবি ও প্রাবন্ধিক মাহবুব বোরহান।
১১
এবার আমি আমার শেষ উদাহরণ তুলে ধরবো। গবেষণার সামরিক নিয়ন্ত্রণের মতো উচ্চশিক্ষায় এমন নিশ্চিত বিপদ অতিক্রম করার পর ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনেও অনন্য সাধারণ শপথ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়, নৌবাহিনীর কর্মকর্ত প্রশিক্ষণ দপ্তরে ছাত্রদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মার্জিত করার জন্য পুলিশের গুপ্তচর বিষয়ক বিধির দাবি করা হয়। সংক্ষেপে আমি কলেজিয়েট প্রশিক্ষণের দুইটি ধরনের তুলনামূলক আলোচনা করবো।
১২
আমি মনে করি উনিশ শতকে হার্ভার্ডের শ্রেষ্ঠ সভাপতি ছিলেন চার্লস ডব্লিউ. এলিয়ট।১৯ এমারসনের মতো তিনিও বর্তমানে অবমূল্যায়নের শিকার। তিনি ব্যক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার সবচেয়ে মহৎ কাজ ছিলো তিনি এই প্রথার প্রাচীরকে ভেঙে দিয়েছিলেন যা সেই সময়ে এই কলেজকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো। তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন যে, যদি একজন মানুষের কলেজে যাওয়ার যথেষ্ট যোগ্য বয়স হয়, তা হলে কলেজে সে কীসের জন্য যাচ্ছে এটা বোঝার যোগ্য বয়সও তার হয়েছে। অতঃপর মি. এলিয়ট নৈর্বাচনিক পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তিনি বিদ্বান এবং বিদ্যাগ্রহণ উভয়কেই গুরুত্ব দেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে তার পদ্ধতি দ্বারা অধিক লোক লাভবান হবে না। এবং ঐ সমস্ত অধিক সংখ্যক লোক যারা তার পদ্ধতি দ্বারা লাভবান হবে না, তারাই তার পদ্ধতিকে নিন্দাবাদ জানাবে এবং গালিগালাজ করবে। কিন্তু তিনি এটাও খুব ভালো করেই জানতেন যে, মানুষের জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন কার্যকর শিক্ষা। তিনি শিক্ষারত বালকদের নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি মনে করতেন যে সামাজিক লাভ সামাজিক লোকসানকে ছাড়িয়ে যাবে; এবং মি. এলিয়টের সময়ে হার্ভার্ড থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী একদল মেধাবী বিশিষ্ট মানুষই প্রমাণ করে যে তিনি সঠিক ছিলেন।
১৩
আমি মনে করি বিশ শতকের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ সভাপতি ছিলেন মি. হাটচিনস।২০ আমি মি. হাটচিনসকে সম্মান করি। তিনি মন থেকে কথা বলেন। তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু আমি এটা জেনে সব সময়ই হতভম্ব হয়ে যাই যে মি. হাটচিনস যিনি মন থেকে কথা বলেন তিনি কীভাবে সিদ্ধান্তে আসেন যে একাগ্রচিত্ততাই উদারনৈতিক শিক্ষার প্রধান গুণ। মি. হাটচিনস মি. এলিয়টের কাঠামোকে বাতিল করে এ্যাকুইনাস২১ এর কাঠামোতে প্রত্যাবর্তন করেন। আমি শিকাগো পদ্ধতিকে ঠিক বুঝি না, কিন্তু এই অংশটুকু খুব ভালো করেই বুঝি যে তাদের তত্ত্ব হলো — মহৎগ্রন্থের একটি নির্বাচিত তালিকাই একটি উদারনৈতিক শিক্ষার জন্য যথেষ্ট বা সমার্থক। এটাই শিক্ষকদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে প্রচার করতে হবে, কিংবা শিক্ষার্থীদেরকেও তাই শেখানো হবে। সে যুক্তি দিতে পারে, বিতর্ক করতে পারে. কিন্তু তিনি সেখানে আছেন এই গ্রন্থাগারে কর্তৃত্ব করার জন্যই।
১৪
কিন্তু গ্রন্থাগার কীসের জন্য? যে সমস্ত লোক এই বইগুলো লিখেছেন তাদের বেশিরভাগেরই এরকম গ্রন্থাগার ছিলো না। যেমন এমারসন বলেন, অন্য মানুষদের চেয়ে গ্রন্থাগারিকরা অধিক জ্ঞানী নয়। কেন গ্রন্থকেন্দ্রিকতা? একটি মহৎ গ্রন্থ কাকে বলে? কে এটা নির্ধারণ করবে যে, এই বইটা পড়ার জন্য যথেষ্ট মহৎ অথবা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো নিরিখে কীভাবে এটা কম মহৎ বিবেচনায় পরিত্যাজ্য হবে? কিছু বই কিছু সময়ের জন্য কিছু মানুষের কাছে/জন্য খুব সুন্দর, এবং কিছু বই কিছু মানুষের জন্য কিছু সময়ে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, কিন্তু আমি নিবেদন করছি যে, একজন মানুষ একটি ছোটো বই থেকেও যথেষ্ট আনন্দ, জ্ঞান এবং নির্দেশনা পেতে পারে, যেমন কেউ বড়ো গ্রন্থ থেকে পায়। বাস্তবিকই মহৎ গ্রন্থ বলে কিছু আছে কি? নিশ্চয়ই কেউ সত্যিকারভাবে বলবে না যে, বইয়ের একমাত্র মহৎ পাঠকেরাই আছে, এবং ঐ মহৎ পাঠকেরা কদাচিৎ নিজেকে নির্ধারিত তালিকাতেই নিবদ্ধ রাখবে। যদিও এটা শিকাগোতে কঠোরভাবে মেনে চলা হয়, (কারণ তারা মনে করে) একমাত্র গ্রন্থিক কর্তৃপক্ষই গণতন্ত্রকে পরিচালনা এবং সংস্কৃতিকে বিকশিত করতে পারে।
১৫
এটা সত্যিই দুঃখজনক যে আব্রাহাম লিঙ্কনের গ্রন্থাগারটি ছিলো যথেষ্ট ছোটো। তিনি কখনো এ্যকুইনাস পড়েন নি। তিনি শুধু ‘গ্যাটিসবার্গ ভাষণ’ লিখেছেন যা ‘পেরিক্লিস’২২ -এর চেয়েও সংক্ষিপ্ত কিন্তু অনন্য। এমারসন বলেন, সুবোধ যুবকেরা এই বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে গ্রন্থাগারে গড়ে উঠছে যে তাদের দায়িত্ব হলো সিসেরো, বেকন যে অভিমত ব্যক্ত করেছে/ যা বলেছে তাই গ্রহণ করা, এটা ভুলে গিয়ে যে সিসেরো, লক এবং বেকন যখন এই সমস্ত গ্রন্থ লেখেন তখন তারাও গ্রন্থাগারের একজন যুবক ছিলো। এটা সত্য যে, মি. এলিয়ট একই সাথে হার্ভর্ড ক্লাসিকসও রেখেছিলেন, কিন্তু তিনি এগুলো দিয়েই গ্রন্থাগার শেষ করেন নি; তিনি শুধু ভেবেছিলেন একটা কিছু শুরু করার জন্য এটা একটা সাশ্রয়ী পথ হতে পারে।
১৬
আমি জানি না ‘চেতনার ব্যর্থতা’/ বোধের ব্যর্থতা এই শব্দবন্ধ কে প্রথম সৃষ্টি করেছিলো। কিন্তু ‘প্রথাবদ্ধতা’/রীতিপ্রথাবদ্ধতা ’র দীর্ঘ যাত্রার এই সব উদাহরণ থেকে আমি একটি ‘চেতনার ব্যর্থতা’ শনাক্ত করেছি, সেটি হলো বিশ্বাসের ব্যর্থতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসের একটি ব্যর্থতা।
১৭
প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই প্রথাবদ্ধতা/প্রথাগত গুণ সম্পর্কে কিছু বলার থাকে। সবসময়ই প্রথাবদ্ধতা সম্পর্কে কিছু বলার আছে। উদাহরণ হিসেবে আমি মনে করি, ডেমোক্রেটিক অথবা রিপাবলিকান যে দলই ক্ষমতায় থাকুক উভয়েরই এই তত্ত্ব সম্পর্কে কিছু বলার থাকে। সত্যিকার অর্থে আমাদের সরকার হলো একটি সমন্বিত সরকার, কিন্তু সমন্বিত সরকার এতোটাই নিরাপত্তাহীন যে , এটা মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দেশদ্রোহীমূলক মনে করে। এমন সরকারকে কোনোভাবেই এমারসন অনুমোদ করেন না। “বাবা সবচেয়ে ভালো জানেন” এই মতবাদ প্রেসিডেন্সি এবং রাষ্ট্রের সচিবালয় দপ্তর কে অসুবিধায় ফেলে; কিন্তু এটা এমারসনের মতামত নয়। দেশপ্রেমমূলক শপথের দাবিও এমারসনের সময়ের প্রেসিডেন্টের২৩ অনুভূতির সংগে সাংঘর্ষিক, যিনি একদা একজন বিদ্রোহী সম্পর্কে বলেছিলেন যে তিনি আনন্দের সাথেই জেনারেল ম্যাকলেলান-এর পদ অধিকার করতে পারেন, যদিও এটা করার মাধ্যমে তিনি দেশকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারেন।
১৮
সম্মান কোনো ছাপানো কাগজ নয় যা একদল নোটারি পাবলিকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা যায়। এটা একটি পৌরুষদীপ্ত আত্মসম্মানের বিষয় (কাজ) এটা একটা সময়ের স্মারকচিহ্ন যাকে একটা পুরোনো ঘরানার বাগধারা দিয়ে প্রকাশের জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। মানসম্মত জ্ঞানের ধারণা — প্লেটোর কিছু অংশ, নিউটনের কিছু অংশ, মিল্টনের কিছু অংশ মিলিয়ে নেওয়ার পূর্বে ঝাঁকি না দিলে যা উৎপন্ন হবে — ঠিক ঐ রকম জিনিস হলো বোধ/চেতনা হারানো। এটা তাড়াহুড়া এবং অবিশ্বাস প্রকাশ করে — তাড়াহুড়া, কারণ — আপনি যখন সূত্রটি আবিষ্কার করে ফেলেছেন, তখন পণ্যটিকে আপনি সুন্দর আকৃতি দেওয়ার জন্য অতিদ্রুত চাপ দিতে পারেন; অবিশ্বাস, কারণ — যখন আপনি ব্যক্তির সমতার জন্য একটি কাঠামোর বিকল্প সমতাধর্মী অন্য একটি কাঠামো চালু করবেনদ, তখন আপনি ব্যক্তির বদলে আপনার বিশ্বাসকে কাঠামোর উপর স্থাপন করবেন। একজন বিলম্বিত এমারসনিয়ান হিসেবে আমি এখনো ব্যক্তির চেতনায় বিশ্বাস করি। রবার্ট ফ্রস্ট আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে একক মানুষের বিপ্লবই একমাত্র বিপ্লব যা আসন্ন।
১৯
এই ঘোরানো পথেই আমি এমারসন এবং শিক্ষা প্রসঙ্গে ফিরে আসবো — আমরা দুইটি যুদ্ধ দেখেছি। যদি আমরা সবাই চাই আমাদের যুবকদেরকে যথার্থ শিক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলবো তা হলে কৌশলের সাথে তা করতে পারি। যদি তোমরা যুবকদের শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলতে চাও, তা হলে আগে তোমরা তার কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করো — মহৎ গ্রন্থ, সাধারণ শিক্ষা — যে নামে ইচ্ছা ডাকো — শিক্ষা তা হলে প্রশংসনীয় হতে পারে। আমরা শিক্ষার এই কাঠামো আগে স্থাপন করি, তারপর কিছু লোক খুঁজে বের করি — যারা প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে — কিছু মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এসেছির পরিবর্তে ভাববে, তাদেরকে পরিচালনার জন্য এসেছি।
২০
অন্য সকলের মতোই আমিও কারিকুলাম দ্বারা ঝালাইকৃত। কিন্তু প্রারম্ভিক সাধারণ জ্ঞান এবং কূটনীতির ন্যূনতম ধারণা ছাড়া কাঠামো কোনো গুরুত্ব বহন করবে না। আগে ভালো বিদ্বান নিয়োগ করতে হবে এবং ভালো ছাত্র জোগাড় করতে হবে যারা প্রকৃতই শিখতে চায়। কাঠামো কেবলমাত্র অল্প সময়ের জন্য অপূর্ব মনে হয়। যেকোনো হার্ভার্ড স্নাতককে দশ বছর পর জিজ্ঞেস করুন যখন আপনি জুনিয়র ছিলেন তখন ক্যাটালগে যথাযথ শিক্ষার নির্দেশনায় কী লেখা ছিলো, সম্ভবত কেউ জবাব দিতে পারবে না, তাকে জিজ্ঞেস করুন কে তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন — সে সাথে সাথে স্মরণ করে বলবে অমুক অমুক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব।
২১
শিক্ষা একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা প্রেমে পড়ার মতো ব্যক্তিগত। সাধারণ শিক্ষা বলে কোনো বস্তু নেই, আছে কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত শিক্ষা। হার্ভার্ডে শিক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের জীবনপঞ্জিতে কতবার আপনি এই কথাগুলো খুঁজবেন : “তিনি আগাসিস বা কিটরেজ, বা রয়েস, বা শারলার২৪ এর সাথে /কাছে অধ্যয়ন করেছেন। খুব কদাচিৎ নেতিবাচকতার সাথে তোতলিয়ে তোতলিয়ে বলা ছাড়া ক্যারিকুলাম আর কীভাবে মনে পড়বে!
২২
আমি পুনরাবৃত্তি করছি শিক্ষা একটি ব্যক্তিগত বিষয়। আবশ্যিকভাবেই এটা একটা একাকীত্বের কাজ, না ডিন, না উপদেষ্টা, না প্রক্টর, না টিউটর, না প্রফেসর কেউই যার বিকল্প হতে পারে না। এটা ধর্ম এবং বিয়ের মতো ব্যক্তিগত ব্যাপার, যার প্রভাবের ফলাফল চরিত্র বিশেষে প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন। হার্ভার্ডে আমরা এমন কিছু করার চেষ্টা করছি যা এমারসনের চেতনাকে সরাসরি বাতিল করে দেয়, আমার আপত্তি এখানেই।
২৩
যখন এমারসন তার বিখ্যাত বাক্য উচ্চারণ করেন, “নিজের উপর আস্থা রাখো — প্রত্যেকটি হৃদয় সেই লোহার দড়িতে কাঁপন তোলে।”২৫ তিনি বানিয়েছেন, যদি আমি বলি এমন হও, তা হলে সকল লোহাই কাঁপন থামিয়ে দেবে। তিনি অনুভূতিপ্রবণতার কথা বলেন নি, অলস, অন্তঃসারশূন্য মানুষের কথাও নয়, তিনি বলেছেন ঐ সমস্ত শিক্ষিত মানুষের কথা যারা একজন শিক্ষকের সাহায্যে এবং একটি দক্ষ ডিন অফিসের মাধ্যমে অনেক কিছু অর্জন করেছেন। তিনি এই কঠিন সত্যে অটল ছিলেন যে আমরা এই পৃথিবীতে কিছুই বহন করে আনি নি, এটা অবধারিত যে আমরা এখান থেকে কিছুই নিয়ে যেতে পারবো না, এবং সেই জন্য মাঝের এই সময়টাতে একটি মাত্র সুযোগই আমাদের হাতে আছে, তা হলো আমাদের চরিত্রকে সমুন্নত করে গড়ে তোলা। যখন তিনি বলেন গ্রন্থ হলো বিদ্বানদের অবসর সময়ের জন্য, তখন তিনি এটা বোঝান না যে কোনো ব্যক্তিরই ল্যামন্ট লাইব্রেরিতে প্রবেশ করা উচিৎ নয়।
২৪
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা এক দ্বারা গণনা করি বহু দ্বারা নয়, যদিও অনেকেই আছেন যারা ভিন্ন রকম কাঠামো দিয়ে গণতন্ত্রকে বিচার করে থাকে — এবং যারা বহু দ্বারা গণনা করে তাদেরকে তীব্র ঘৃণা করে। যদিও ঘৃণা পাপমোচনও নয় বাদশাহিও নয়। এমারসনের মহৎ অবদান শুধু এটাই নয় যে তিনি এক দ্বারা গণনার সাথে একমত ছিলেন — কিন্তু তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে এক — যে কোনো এক — তার পেছনে অসংখ্য/অসীম আছে। এবং যৌক্তিকভাবেই এই বিশ্বাসের বিরোধিতা করতে পারি না, এবং এটা অস্তিত্ববাদের চাইতে বেশি বিমূর্ত নয়। কিন্তু শিক্ষায় এবং জাতীয় জীবনে আমরা কীভাবে ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেবো যদি বস্তুতই তার পেছনে অসংখ্য না থাকে? আমি জানি এটা অনেকের কাছে অচিন্তনীয় এবং অল্প সংখ্যকের কাছে অবাস্তব/অব্যবহারিক মনে হবে, এবং আমি ঐতিহাসিক সত্যের একটি দিকই শুধু তুলে ধরতে পারি যে এই মতবাদ, অচিন্তনীয় এবং অবাস্তবÑ(যাই হোক) হার্ভার্ডেরই সন্তান/ প্রসবকৃত/সৃষ্টি — মহৎ হার্ভার্ড — ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড, হার্ভার্ড যে হার্ভার্ডে আমি শুধু পরিগ্রহণ হিসেবেই হার্ভার্ড। চিন্তা করি আমরা ঠকবো না। লোয়েল ২৬ ১৮৬৫ সালে যখন মৃত্যুবরণকারী হার্ভার্ডদেন উদ্দেশ্যে রচিত শোক-গাথা আবৃত্তি করেন তখন তিনি কোনো কারিকুলামকে উদযাপন করেন না :
যারা তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তারা নিজেরাও সত্য,
এবং কী আছে এমন যার স্বপ্ন এবং সম্পাদন তাদের জন্য অসম্ভব;
তারা তাকে অনুসরণ করে এবং খুঁজে পায়
যেখানে সবাই পাওয়ার আশা করতে পারে,
জ্বলে পুড়ে খাক হওয়া মনের ছাইয়ের গাদায় নয়,
সুন্দরের সাথে সেই রানির সংঘাতিক সুমিষ্টতা ঘিরে।
২৫
সম্ভবত আমরা ছাত্র-শিক্ষক সবাই যদি আরো বার বার এমারসন হলের ভাস্কর্যের মুখের দিকে তাকাই আমরা অবশ্যই তার ঠোঁটে একটি স্মিত হাস্যের পরিহাস শনাক্ত করতে সক্ষম হবো। সম্ভবত আমরা যদি এটার দিকে আরো অনেক বেশি বার তাকাই, একটি মহৎ সন্দেহ, এমারসন যেমন বলতেন এটা নিজেও তেমনি আমাদের উপদেশের উপর, কাঠামোর উপর, নির্ভযোগ্যতার উপর, আমাদের প্রথাগততার উপর বিশ্বাসের পরামর্শ দিচ্ছে।
২৬
এমারসনের বিশ^াস যান্ত্রিক ছিলো না, ছিলো মানুষের চিন্তা, যেখানে আজ আমরা তেমন যন্ত্রের জন গর্ববোধ করি যেগুলো চিন্তা করতে পারে, এবং এমন মানুষকে সন্দেহ করি যে চিন্তা করার চেষ্টা করে। আমি দুঃখ প্রকাশ করার কিছু দেখি না, যেখানে এমন একটি কলেজে আমরা প্রটেস্টানটিজমের প্রতিবাদ করছি এবং মতদ্বৈধতার/ ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করছি ২৭ যেটি মতদ্বৈধতাবাদীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো; এবং যদিও আমার দফাটি বাস্তবায়ন করা দুরূহ, আমি কলেজের এবং দেশের চলমান ভাবনা থেকে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতার একটি কথা বলবো যে, গণতন্ত্র কেবল তখনই টিকে থাকবে যদি আমরা এমন একটি কাঠামো আরোপ করতে সক্ষম হই যেখানে যতটা সম্ভব বেশি লোককে সেটি নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করতে পারি।
২৭
শিক্ষা সম্পর্কিত সমস্যা কোনো কাঠামোর প্রথাগততা নয়, যদিও আগ্রহের দিক থেকে লোভনীয়; (সমস্যা হলো) কীভাবে নিঃসঙ্গ পথ থেকে প্রতিবন্ধকতা সরানো যায় — যেখানে কোনো কোনো শিক্ষা মানুষের চিন্তায় আশানুরূপ ফল দিতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য আমি মিসেস রুজভেল্ট থেকে উদ্ধৃতি দিবো, “আমরা কী সত্যিই সেই সীমানায় পৌঁছে গেছি, যেখানে আমরা অবশ্যই কোনো দলে যোগ দিতে ভয় পাবো, কারণ একটা সময়ে অথবা অন্য সময়ে কমিউনিস্ট মতবাদে ঝোঁকা একজন ব্যক্তি অথবা ধরা হতো কমিউনিস্ট ঝোঁকের একজন মানুষও এটায় যোগদান করবে? সেটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর জিনিস এবং আমাদের এজন্য লজ্জিত হওয়া উচিৎ।” আমিও এই প্রথাগততার জন্য চাপ সৃষ্টি করার জন্য লজ্জিত। আমি মনে করি না প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এটা বিশ^াস করার জন্য খুব বেশি বিলম্ব হয়ে গেছে যে শিক্ষায় অথবা রাজনীতিতে গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য এমারসনই এখনো চেতনার সর্বশ্রেষ্ঠ অনুঘটক। এটাই সেই চেতনা যা আমি বলার চেষ্টা করেছি।
সূত্র ও টীকা
১৯. Charles W. Elot : Charles William Elot (1834-1926); president of Harvard, (1869-1909).
২০. Hutchins : Robert Maynard Hutchins (1899-1977) president 0f the University of Chicago, (1929-1945)
২১. Aquinas : Saint Thomas Aquinas (1225-1274); Italian theologian and philosopher.
২২. Pericles’ : (c. 495- 429 B.C.); Athenian statesman.
২৩. President : Lincoln.
২৪. Agassiz, Kittredge, Royce, and Shaler : all teachers at Harvard : Jean Louis Rodolphe Agassiz (1807-1873); Swiss naturalist; George Lyman Kittredge (1860-1941); American philologist; Josiah Royce (1855-1916); American philosopher; Nathniel Southgate Shaler (1841-1906); American geologist.
২৫. “ Trust thyself – every heart vibrates to that iron string”: opening sentence of emerson’s “Self-Reliance.”
২৬. Lowell : James Russell Lowell (1819-1891); American poet, essayist, and diplomat.
২৭. protest of Protestantism and the dissidence of dissent : “the Dissidence of Dissent and the Protestantism of the Protestant religion” is a famous phrase from Matthew Arnold, Calture and Anarchy (1869).
১৭.০৭. ২০২০/রাত : ৯:৫৭ মিনিট/ মোহাম্মদপুর/ ঢাকা।
পড়ুন ।। প্রথম পর্ব ।। ক্লিক করুন নিচের লিংকে