যোগ দর্শনের ইতিবৃত্ত

ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক, গল্পকার রোয়াল্ড ডালের “A wonderful story of Henry Sugar” গল্পের প্রধান চরিত্র হেনরি সুগার কোটিপতি হওয়ার একঘেয়েমি কাটাতে বিভিন্ন ধরনের বাজি ধরে, জীবনের সঙ্গে জুয়া খেলতে খেলতে, অবশেষে যোগসাধনার অলৌকিক কার্যকলাপের সন্ধান পান হাতে লেখা এক ডায়েরিতে অমরৎ সিং এর কথা পড়ে। অমরৎ চোখ বুঝে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে দেখতে পেতেন। আর সেই অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার প্রদর্শন করতেন এক সার্কাস দলে। ঋষিকেশে মিস্টার ব্যানার্জির কাছে প্রথম যোগসাধনা শিখতে গেলেও অবশেষে তাকে শিষ্যত্ব নিতে হয় হরিদ্বারের মিস্টার ব্যানার্জির অপর এক শিষ্যের কাছে। গুরু তাকে মনসংযোগ অভ্যাস করার কৌশল শিক্ষা দেন। মোমবাতির শিখার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নিজের মস্তিষ্ককে কোন একটি মাত্র বস্তুতে কেন্দ্রীভূত করতে পারলেই আসবে অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা। অমরৎ নিজের ভাইয়ের কথা চিন্তা করত। দিনের-পর-দিন এই অভ্যাসের ফলে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে অনায়াসে খালি পায়ে হেঁটে যেতে পারে সে। চোখ বন্ধ করে দেখতে শেখে গোটা দুনিয়া। কিন্তু হারিয়ে ফেলে নিজের ঘ্রাণশক্তি। অন্যদিকে তার এই অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় আগ্রহী হয়ে হেনরি শুরু করে মনঃসংযোগের অনুশীলন। জ্বলন্ত শিখার সামনে নিজের মুখ ছাড়া কিছুই মনে করতে পারে না হেনরি। তবু বছর দু’য়েকের মধ্যেই সে রপ্ত করে ফেলে কয়েক মুহুর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তাসের উলটো পিঠের চিহ্ন ও সংখ্যা বুঝে যাওয়ার আশ্চর্য কৌশল। লুঠ হয়ে যেতে শুরু করে লন্ডন ও তার আশেপাশের ক্যাসিনোগুলো। নিজের সুউচ্চ ফ্লাট বাড়ির ব্যালকনি থেকে টাকা ছড়িয়ে স্তব্ধ করে দেয় গোটা লন্ডন শহর। তবু মৃত্যুর পর অকৃতদার হেনরি সুগারের কয়েক লক্ষ কোটি টাকার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয় তাঁর তৈরি অসংখ্য অনাথ আশ্রম।

 

অলৌকিক, রহস্যময়, অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন এই রকম চরিত্রেরা পাশ্চাত্যর আখ্যানে বিরল হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধরনের চরিত্রেরা ইতিহাস ও জীবন-যাপনের অঙ্গ। মহাবতার বাবাজী, শ্যামাচরণ লাহিড়ী, পরমহংস যোগানন্দ, স্বামী শ্রী যুক্তেশ্বর গিরির মত মানুষদের জীবন কাহিনি এমন নানা রহস্যময়তায় ভরা। বলা হয় ভারতবর্ষের আদি অকৃত্রিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায়ে যোগসাধনা জন্ম বিবর্তন ঘটেছিল পাশ্চাত্যে পৌঁছে তা আধুনিক যোগাভ্যাসের রূপ পায়। ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দুধর্ম ও দর্শনের এক ঐতিহ্যবাহী শরীর বৃত্তীয় ও মানসিক সাধন প্রণালী হিসেবে ‘যোগসাধনা’ র জন্ম হয়।

 

সংস্কৃতে ‘যোগ’ শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। ব্যুৎপত্তিগত যার জন্ম ‘যুজ’ ধাতু থেকে। যার অর্থ ‘নিয়ন্ত্রণ করা’, ‘যুক্ত করা’ বা  ‘ঐক্যবদ্ধ করা’ । ‘যোগ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ তাই ‘যুক্ত করা’, ‘ঐক্যবদ্ধ করার’ সংযোগ বা পদ্ধতি। হিন্দু দর্শনে যুগের প্রধান শাখা গুলি হল : রাজযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ,ভক্তিযোগ ও হঠযোগ। যুগের উৎস বা কে এর প্রবর্তক তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন। কারণ হিন্দু ধর্মের বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যোগ। দেবাদিদেব মহাদেবকে সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী বলা হয়। পরবর্তীকালে মহর্ষি পতঞ্জলি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দর্শনের কাঠামোগত রূপ দেন। পতঞ্জলি যোগসূত্র যে যোগের উল্লেখ আছে তা হিন্দু দর্শনের ছ’টি প্রধান শাখার অন্যতম। এগুলি হল : কপিলের সাংখ্য, গৌতমের ন্যায়, কণাদের  বৈশেষিক, জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা ও বাদরায়ানের উত্তর মীমাংসা বা বেদান্ত। অন্যান্য যেসব হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থে যোগ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে সেগুলি হলো উপনিষদ, ভগবদ্গীতা, হঠযোগ প্রদীপিকা, শিব সংহিতা, বিভিন্ন পুরাণ ও বিভিন্ন তন্ত্রগ্রন্থ। যোগ ইতিহাসের প্রাচীনত্ব অন্তত ৫০০০ বছর বা তারও বেশি।

ভারতীয় দর্শনে আত্মোপলব্ধির পথে অথবা অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা জাগরণের ক্ষেত্রে দুটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মুখ্য অন্যটি আনুষঙ্গিক। আধ্যাত্মিক জ্ঞান এখানে মুখ্য কারণ এবং যোগাভ্যাস হল আনুষঙ্গিক কারণ। হিন্দুধর্মের যোগশাস্ত্রে এরকম ভাবে বলা হয়েছে ‘নাড়ি’ ও ‘প্রাণে’র কথা।কিন্তু দুটির কোনোটিই স্পর্শ সাধ্য নয়।প্রাণ হলো মানুষের জীবনিশক্তি। এই প্রাণের পাঁচটি স্তরে রয়েছে। ‘প্রাণা’, ‘ভায়ানা’, ‘উদানা’, ‘সামানা’ ও ‘আপানা’। প্রাণের এই পাঁচটি অঙ্গ আবর্তিত হচ্ছে যে পথ অবলম্বন করে তাকেই বলা হচ্ছে নাড়ী। নাড়ি তিন প্রকার। সুষুম্না, ইড়া এবং পিঙ্গলা। এই একই কথা আমরা চর্যাপদেও পাই।

বৌদ্ধ বজ্রযান থেকে উৎপন্ন সহজযানের সাধনার কথাই চর্যাপদে নানা রূপক প্রতীকে প্রকাশিত। বৌদ্ধ সহজযানী দর্শন হল ভাববাদী দর্শন। সহজযান সাধকরা মনে করেন আদিতে এ জগত ছিল অনুৎপন্ন । এর কোন বাস্তব সত্তা নেই। বস্তু বিশ্বে যা কিছু আমরা দেখি তা ভ্রান্ত চিত্তের একটি প্রতিভাসমাত্র। ইন্দ্রিয়বেদ্য জ্ঞানে সবই মিথ্যা। পরমার্থতঃ জগতের সৃষ্টি ও নেই ধ্বংস নেই। ৪১ সংখ্যক চর্চায় ভুসুকুপাদ যেমন বলেছেন :

আইএ অনুঅনা এ জগরে ভাংতিএঁ সো পড়িহাই।

রাজসাপ দেখি জো চমকিই সাচে কিঁ তঁ বোড়ো খাই।।

অর্থাৎ আদিতে এই জগত ছিল অনুৎপন্ন । ভ্রান্তিতে সে প্রতিভাত হচ্ছে। দড়িকে সাপ ভেবে যে চমকায় তাকে কি সত্যি বোড়া সাপে খায়?… এই-জগৎ হচ্ছে মরুভূমির মরীচিকা, গন্ধর্বের নগরী, দর্পণের প্রতিবিম্ব, বায়ুর আবর্তে সৃষ্ট জলস্তম্ভের মত, বন্ধ্যা নারীর পুত্রের খেলা, বালুকার তেল, শশকের সিং বা আকাশকুসুমের মতো অলীক। প্রজ্ঞা ও করুণার মিলনে এই ভ্রান্তি অপনোদন করে সাধককে স্বর্গ শূন্যতা বা নির্বাণের বোধে পৌঁছে সহজানন্দ উপলব্ধি করতে হবে। জন্ম-মৃত্যুর অতীত এক শাশ্বত উপলব্ধিই  হল নির্বাণ। এতে সাধকের অহংভাবের বিলোপ হয় এবং নিত্যত্বের বোধ জন্মায়।

 

সহজযানী বৌদ্ধ সাধকরা মনে করেন, এই সহজানন্দ বা মহা সুখ লাভের বোধ বা বোধি মানবের সহজাত এবং তা নিজদেহের মধ্যেই আছে। তার জন্য দূরে যাবার প্রয়োজন নেই :

নিঅড্ ভি বোহি, দূর মা জাহী ।

কায়া-সাধনার মধ্য দিয়ে দেহের মধ্যে এই বোধির উপলব্ধিই সহজযানী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনা। ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘The Sahajiya cult,as an offshoot of Tantric Buddhism lays that highest stress on the practical method for realising the Sahaja nature of the self and of all the Dharmas” (obscure religious cults)

 

শূন্যতা ও করুণার মিলনে সহজ সুখ উপলব্ধির বিষয়টিকে সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকরা দেহের বিবিধ ক্রিয়া সাধন এর উপর স্থাপন করেছেন। এজন্য তারা দেহের মধ্যে চারটি চক্র বা পদ্ম কল্পনা করেছেন। নাভিতে নির্মাণ চক্র, হৃদয়ে ধর্মচক্র, কন্ঠে সম্ভোগচক্র ও মস্তকে সহজ চক্র বা মহাসুখ চক্র। এই শেষ চক্রটিকে সহস্রার বা উষ্ণীষকমলও বলা হয়। এই মহাসুখ চক্রই বোধিচিত্তের স্বস্থান ।

 

দেহের চারটি চক্র ছাড়াও সহজিয়া সাধকগণ বামগা, দক্ষিণগা ও মধ্যগা — তিনটি নাড়ির কথা বলেছেন। বামগা নাড়িটি প্রজ্ঞা এবং দক্ষিণগা নাড়িটি উপায়। এদের ধমন-চমণ, আলি-কালি, রবি-শশী, গঙ্গা-যমুনা ইত্যাদি পারিভাষিক নাম দেওয়া হয়েছে। মধ্যগা নাড়িটি বিশুদ্ধাবধূতিকা বা অবধূতী। একেই ডোমনি, শবরী, চন্ডালী ইত্যাদি রূপক নাম দেওয়া হয়েছে। বামগা ও দক্ষিণগা নাড়ির স্বাভাবিক গতি নিম্নমুখী। বায়ু সংযম করে উভয়ের নিম্নমুখী গতিধারা রুদ্ধ করতে হবে এবং তাকে মধ্যগা অবধূতীমার্গে পাঠিয়ে ঊর্ধ্বগামী করতে হবে। এর ফলে প্রথমে নাভিতে নির্মাণচক্রে বোধিচিত্ত উৎপন্ন হবে। এরপরে বোধিচিত্ত ধর্মচক্র ও সম্ভোগচক্র পার হয়ে মস্তকের মহাসুখচক্রে পৌছবে। ফলে বোধিচিত্ত তার ‘অবিদ্যাপ্রপঞ্চগ্রস্থ’ সাংবৃত্তিক রূপ হারিয়ে পারমার্থিক রূপে উত্তীর্ণ হবে। তখনই হবে সহজানন্দের অনুভূতি। এই অনুভূতির চারটি স্তর। নাভিতে নির্মাণ চক্রে আনন্দ। হৃদয়ে ধর্মচক্রে পরমানন্দ। কন্ঠে সম্ভোগচক্রে বিরমানন্দ । সবশেষে মস্তকে মহাসুখচক্রে বা উষ্ণীষকমলে সহজানন্দ বা আত্যনিক আনন্দ। প্রজ্ঞা ও উপায়, শূন্যতা ও করুণার মিলনেই এই অদ্বয় মহাসুখের উপলব্ধি ঘটে। এই বৌদ্ধ তত্ত্ব দর্শন ও দেহবাদী সাধনাই চর্যাগান গুলিতে কখনো সরাসরি, কখনো রূপক প্রতীকের রূপ ধরেছে।

কুলকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করাই যোগচর্চার একমাত্র উদ্দেশ্য, যা যোগাভ্যাস ও প্রাণায়ামের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়ে থাকে। সহজানন্দলাভের জন্য আভ্যন্তরীণ তীর্থযাত্রা শুরু হয় মূলাধার চক্র থেকে। এরপর স্বাধিষ্ঠান চক্র, নাভিচক্র বা মণিপুর চক্র, অনাহুত চক্র হয়ে তা পৌঁছায় বিশুদ্ধি চক্রে। সেখানে ইড়া-পিঙ্গলার মধ্যে দিয়ে অবধূতি মার্গে পৌঁছে অজ্ঞান চক্র পার করে এবং তখনই মানুষ উত্তীর্ণ হতে পারে সাহাস্রারা চক্রে। তখনই সে পরমানন্দ লাভ করে।

 

প্রাণায়াম এবং যোগাসনের মধ্য দিয়ে এগুলো বহুলভাবে হিন্দুধর্ম ও দর্শনের আধ্যাত্মিক জীবনের সাথে জড়িত। পতঞ্জলির রচনা “অষ্টাঙ্গ যোগ” নামে প্রচলিত ব্যবস্থাটির মূল ভিত্তি এটিই। এই অষ্টাঙ্গ যোগের ধারণাটি পাওয়া যায় যোগসূত্রের দ্বিতীয় খণ্ডের ২৯তম সূত্রে। অষ্টাঙ্গ যোগই বর্তমানে প্রচলিত রাজযোগের প্রতিটি প্রকারভেদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই আটটি অঙ্গ হল:

১. যম : (পাঁচটি “পরিহার”) অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ।

২. প্রাণায়ম : (“প্রাণবায়ু নিয়ন্ত্রণ”) প্রাণস্বরূপ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবনশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ।

৩. নিয়ম : (পাঁচটি “ধার্মিক ক্রিয়া”) পবিত্রতা, সন্তুষ্টি, তপস্যা, সাধ্যায় ও ঈশ্বরের নিকট আত্মসমর্পণ। ‘যম’ ও ‘নিয়ম’ এ দুয়েরই উদ্দেশ্য হল ইন্দ্রিয় ও চিত্তবৃত্তিগুলিকে দমন করা এবং এগুলিকে অন্তর্মুখী করে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করা।

৪. আসন : যোগ অভ্যাস করার জন্য যে ভঙ্গিমায় শরীরকে রাখলে শরীর স্থির থাকে অথচ কোনোরূপ কষ্টের কারণ ঘটেনা তাকে আসন বলে। সংক্ষেপে স্থির ও সুখজনকভাবে অবস্থান করার নামই আসন।

৫. প্রত্যাহার : বাইরের বিষয়গুলি থেকে ইন্দ্রিয়কে সরিয়ে আনা। আসন ও প্রাণায়ামের সাহায্যে শরীরকে নিশ্চল করলেও ইন্দ্রিয় ও মনের চঞ্চলতা সম্পূর্ণ দূর নাও হতে পারে। এরূপ অবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলোকে বাহ্যবিষয় থেকে প্রতিনিবৃত্ত করে চিত্তের অনুগত করাই হল প্রত্যাহার।

৬. ধ্যান : মনকে ধ্যেয় বিষয়ে বিলীন করা। যে বিষয়ে চিত্ত নিবিষ্ট হয়, সে বিষয়ে যদি চিত্তে একাত্মতা জন্মায় তাহলে তাকে ধ্যান বলে। এই একাত্মতার অর্থ অবিরতভাবে চিন্তা করতে থাকা।

৭. সমাধি : ধ্যেয়ের সঙ্গে চৈতন্যের বিলোপসাধন। ধ্যান যখন গাঢ় হয় তখন ধ্যানের বিষয়ে চিত্ত এমনভাবে নিবষ্ট হয়ে পড়ে যে, চিত্ত ধ্যানের বিষয়ে লীন হয়ে যায়। এ অবস্থায় ধ্যান রূপ প্রক্রিয়া ও ধ্যানের বিষয় উভয়ের প্রভেদ লুপ্ত হয়ে যায়। চিত্তের এই প্রকার অবস্থাকেই সমাধি বলে। এই সমাধি প্রকার – সবিকল্প এবং নির্বিকল্প। সাধকের ধ্যানের বস্তু ও নিজের মধ্যে পার্থক্যের অনুভূতি থাকলে, তাকে বলা হয় সবিকল্প সমাধি। আবার সাধক যখন ধ্যেয় বস্তুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান সে অবস্থাকে বলা হয় নির্বিকল্প সমধি। তখন তাঁর মনে চিন্তার কোনো লেশমাত্র থাকে না। এই সমাধি লাভ যোগসাধনার সর্বোচ্চ স্তর, যোগীর পরম প্রাপ্তি। এই শাখার মতে, চৈতন্যের সর্বোচ্চ অবস্থায় উঠতে পারলে বৈচিত্র্যময় জগতকে আর মায়া বলে মনে হয় না। প্রতিদিনের জগতকে সত্য মনে হয়। এই অবস্থায় ব্যক্তি আত্মজ্ঞান লাভ করে। তাঁর আমিত্ব রহিত হয়।

৮. ধারণা : কোনো একটি বিষয়ে মনকে স্থিত করা। কোনো বিশেষ বস্তুতে বা আধারে চিত্তকে নিবিষ্ট বা আবদ্ধ করে রাখাকে ধারণা বলে।

 

পতঞ্জলির যোগ, যা মনকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায়, তাকে রাজযোগ নামে চিহ্নিত করা হয়। মহর্ষি পতঞ্জলির যোগদর্শন চারটি পাদে বিভক্ত।

১। সমাধিপাদ : এই পাদে যোগের লক্ষণ, স্বরূপ ও প্রাপ্তির উপায় বর্ণনা করা হয়েছে।

২। কৈবল্যপাদ : মুক্তি প্রাপ্তিতে সক্ষম চিত্তের স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। যোগদর্শনের জন্য যে যে শঙ্কা তৈরি হতে পারে তার কথাও বলা হয়েছে এই অধ্যায়ে। শেষে সমাধিস্থ পুরুষের স্বরূপ বর্ণনা করে গ্রন্থের শেষ হয়েছে।

৩। সাধনপাদ : এই পাদে অবিদ্যাসহ বিভিন্ন প্রকার ক্লেশকে সমস্ত দুঃখের কারণ বলা হয়েছে। এই পাদেই যোগের আটটি অঙ্গের কথা তথা অষ্টাঙ্গ যোগের বর্ণনা রয়েছে।

৪। বিভূতিপাদ : অষ্টাঙ্গ যোগের মধ্যে ধারণা, ধ্যান এবং সমাধি একত্রে এই তিনটিকে সংযম বলা হয়েছে। সাধক যাতে ভুল করেও সিদ্ধিলাভের প্রলোভনে না পড়েন সেই দিকেও সতর্ক করা হয়েছে।

বৈদিক সংহিতায় তপস্বীদের উল্লেখ থাকলেও, তপস্যার (তপঃ) স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক ব্রাহ্মণ গ্রন্থে। সিন্ধু সভ্যতার (৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বিভিন্ন প্রত্নস্থলে পাওয়া সিলমোহরে ধ্যানাসনে উপবিষ্ট ব্যক্তির ছবি পাওয়া গেছে। ধ্যানের মাধ্যমে চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার পদ্ধতি হিন্দুধর্মের বৈদিক ধারায় বর্ণিত হয়েছে। নাসদীয় সূক্ত এবং ঋগ্বৈদিক যুগেও ধ্যানপ্রণালীর অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। “যোগ” শব্দটি প্রথম উল্লিখিত হয়েছে কঠোপনিষদে। এই গ্রন্থে “যোগ” শব্দটির অর্থ ইন্দ্রিয় সংযোগ ও মানসিক প্রবৃত্তিগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের মাধ্যমে চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়া। যোগ ধারণার বিবর্তন যে সকল গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, imagesসেগুলি হল উপনিষদসমূহ, মহাভারত, (ভগবদ্গীতা) ও পতঞ্জলির যোগসূত্র । যোগের উল্লেখ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও আছে। হিন্দু দর্শনে যোগ ছয়টি মূল দার্শনিক শাখার একটি। যোগ শাখাটি সাংখ্য শাখাটির সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। পতঞ্জলি বর্ণিত যোগদর্শন সাংখ্য দর্শনের মনস্তত্ত্ব, সৃষ্টি ও জ্ঞান-সংক্রান্ত দর্শন তত্ত্বকে গ্রহণ করলেও, সাংখ্য দর্শনের তুলনায় পতঞ্জলির যোগদর্শন অনেক বেশি ঈশ্বরমুখী।

 

হিন্দুধর্মীয় বিভিন্ন গ্রন্থে যোগের বর্ণনা রয়েছে। সেগুলো হলো- বক্ষঃ, গ্রীবা ও শিরোদেশ উন্নতভাবে রেখে, শরীরকে সমভাবে ধারণ করে, ইন্দ্রিয়গুলিকে মনে স্থাপন করে জ্ঞানী ব্যক্তি ব্রহ্মস্বরূপ ভেলায় সকল ভয়াবহ স্রোত পার হয়ে যান। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫ মন্ত্রসমূহে যোগ-ধ্যান সম্পর্কে বলা হয়েছে, সমুদয় বৃত্তির নিরোধে ধ্যানসিদ্ধি হয়। (সাংখ্য-প্রবচন সূত্র ৩:৩১)

 

কারণ ধ্যানী পুরুষকে নিশ্চল পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে যোগ-ধ্যান সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বর্ণনা করেছেন, ‘মেরুদণ্ড, মস্তক, গ্রীবা সমান ও নিশ্চলভাবে স্থির করে নিজ নাসিকার অগ্রভাগে দৃষ্টিস্থাপন করে, অন্য কোনো দিকে না তাকিয়ে, ব্রহ্মচর্যে স্থিত ও প্রশান্তচিত্ত যোগী সতর্কতার সাথে মনকে সংযত করবে।’ (গীতা, ৬:১৩-১৪) গীতায় এমন আরও বহু শ্লোক আছে।মহাভারতের বিভিন্ন জায়গায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, গুরু দ্রোণাচার্য, ব্যাসদেব ও অনেকের ধ্যান ও যোগের উল্লেখ রয়েছে।
ব্যাবহারিক দিক থেকে যোগ ৮ ভাগে বিভক্ত : ১। ভক্তিযোগ ২। কর্মযোগ ৩। জ্ঞানযোগ ৪। রাজযোগ ৫। তন্ত্রযোগ ৬। ক্রিয়াযোগ ৭। কুলকন্ডলিনীযোগ ৮।হঠযোগ

হঠযোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে শরীরকে সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ু করা। হঠযোগীর ধারণা কোনোরূপ শক্তিকে আয়ত্ত করতে হলেই শরীরকে নিয়ন্ত্রিত করা প্রয়োজন। সাধারণ লোক যোগ বলতে হঠযোগের ব্যায়াম বা আসনগুলোকে বুঝিয়ে থাকে। রাজযোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত করা। আর এই পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত হওয়াই হচ্ছে জীবের মুক্তি বা মোক্ষলাভ। তবে হঠযোগের সঙ্গে রাজযোগের ঘনিষ্ট সম্বন্ধও রয়েছে। সাধনার পূর্বশর্ত হচ্ছে শরীরকে সুস্থ রাখা। “শরীরমাদ্যং খলু ধর্মসাধনম”। অর্থাৎ, ‘শরীর মন সুস্থ না থাকলে জাগতিক বা পারমার্থিক কোনো কর্মই সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নয়’। ভক্তিযোগ ঈশ্বরের অস্তিত্বের দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। ভক্তি এবং বিশ্বাস এখানে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক যোগসূত্র স্থাপন করে। কর্মযোগ মূলত গীতায় শ্রীকৃষ্ণের অর্জুনের প্রতি দেওয়া উপদেশের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। কোন ফলের আশা না করে দৃঢ় চিত্তে নিজের কর্তব্য পালন করে যাওয়াই কর্মযোগের মূল দর্শন। জ্ঞানযোগের ক্ষেত্রে যোগী তার দেহ ও মন থেকে সমস্ত অপবিত্রতাকে দূর করে জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়। যোগীগুরু পতঞ্জলি এই জ্ঞান যোগকেই অষ্টাঙ্গ যোগ বলেছেন। এটি আবার রাজযোগ নামেও পরিচিত।

 

ভারতীয় দর্শন চিন্তায় দুঃখ-জরা-মৃত্যু থেকে মুক্তির পথই মূল বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পেয়েছে। জীবনযাপনের সমস্ত ক্লেদ ও দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়ার অবস্থাকে ভারতীয় দর্শন কখনো মোক্ষ, কখনো মুক্তি, কখনো কৈবল্য, অপভর্গ এবং নির্বাণ হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে। মানবজীবনের দুঃখ কষ্টকে ভারতীয় দর্শন তিনটি ভাগে ভাগ করেছে :

১. কোন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা। যেমন অসুখ, অঙ্গহানি ইত্যাদি এবং কিছু মানসিক আবেগ : যেমন ভয় ঘৃণা কাম ইত্যাদি।
২. কোন অন্য মানুষের আচার-আচরণে তৈরি হওয়া দুঃখ-কষ্ট।
৩. ভূমিকম্প, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারীর মত প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে তৈরি হওয়া দুঃখ কষ্ট।

হিন্দু দর্শন এই তিন ধরনের ‘suffering’ থেকে যখন মুক্তির পথ খুঁজছে তখন পাশ্চাত্যের মতো ‘অপর’-এর ওপর প্রভুত্ব স্থাপন বা তার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ না খুঁজে নিজের ওপর প্রভুত্ব স্থাপনের কথা বলেছে। অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে ভারতীয় দর্শন আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলেছে। ঈষোভাষ্যোপনিষদের শ্রুতিতে বলা আছে যে জ্ঞান অজ্ঞতার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। অজ্ঞ ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু যে তার নিজের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করে সে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। যোগের অবতারণা ঘটেছে এই আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন শৈলী হিসেবে।

অন্যদিকে কঠোপনিষদে যোগের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে যোগ হল সকল ইন্দ্রিয়ের দৃঢ়তা এবং নিয়ন্ত্রণের এমন এক অবস্থা যখন মানুষ তার মন এবং চেতনাকে একই সঙ্গে বশ করতে পারে এবং তা একজন ব্যক্তিকে নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত করে তোলে। অন্যদিকে শ্বেতাবতারোপনিষদে বলা হয়েছে একজন যোগীর অবয়   বে যোগের আগুনের ঔজ্জ্বল্য  লক্ষ্য করা যায়। বৃদ্ধাবস্থা ও মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তার শরীর হয়ে ওঠে নমনীয় এবং সুস্থ, মন লোভ মুক্ত। এভাবেই সে শান্তি ও পরিপূর্ণতার আধার হয়ে ওঠে।

 

যোগ-ধ্যান-ব্যায়াম এগুলো বহু বহু প্রাচীন সময় থেকে হিন্দুদের জীবন ব্যবস্থার সাথে একীভূত হয়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে আমরা এগুলো অবহেলায় দূরে রেখেছি। অথচ স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ; জীবিতদের মধ্যে বাবা রামদেব, সদগুরু, রবি শঙ্করসহ অনেক যোগগুরু এই যোগদর্শনকে পুনরায় বিশ্বের সম্পদ করে তুলেছেন। হিন্দুধর্মের এই সম্পদ এখন আবার বিশ্বসম্পদে পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here