পাঠাভ্যাস ও লেখকের দায়

পাঠের মাঝেই একজন পাঠক তার মনের আনন্দ খুঁজে ফেরে। পাঠের মাধ্যমে একটি লেখাকে নিজের কল্পনাশক্তি দিয়ে একজন পাঠক তার নিজের মত একটি অর্থ বা ভাব দিয়ে থাকে। যা লেখকের লেখাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই নতুন ভাব প্রদানের মাধ্যমে লেখক এর সৃষ্টি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাত্রা পেয়ে থাকে যা অনন্য একটি  বিষয়। এই বিবেচনায় লেখা এবং পাঠ এর এমন একটি যুগলবন্দির মাধ্যমেই একটি লেখা ভিন্নমাত্রা পেয়ে থাকে যার অংশীদার লেখক এর সাথে সাথে একজন পাঠকেরও। এখানে লেখকের মুন্সিয়ানা বা দক্ষতাকে কোনভাবেই উপেক্ষা করবার মত নয়। লেখক তার ধারণা কে সুনিপুণভাবে পাঠকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে একজন লেখক একটি ফলপ্রসূ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে লেখক এবং পাঠকের মধ্যে এক সেতু হিসেবে ক্ষেত্রে কাজ করে। তাই একজন লেখক এর দক্ষতা বা মুন্সিয়ানা প্রকাশ পায় তখনই যখন সে পাঠকের নিকট এমন একটি লেখা পৌছে দিতে সমর্থ হন যেখানে পাঠক তার কল্পনা শক্তির মাধ্যমে নিজের মতো করে একটি চিত্রকল্প বা গল্প বিন্যাস তৈরি করার মত একটি সুযোগ পায়। আর এ কারণেই আমরা সকল লেখককে একই রকম করে পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটতে দেখি না। পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটার বিষয়টিকে অনেকেই লেখক এর জনপ্রিয়তা হিসেবেও ব্যাখা করে। তবে এই প্রচলিত জনপ্রিয়তার বাইরে, একজন লেখককে তখনই সার্থক বলা যায় যখন তার লেখার মাধ্যমে পাঠক নিজ কল্পনার ঘুড়ি নীল আকাশে উড়িয়ে তার নিজস্ব একটি বিশ্ব তৈরি করে।

 

আমার মনে পড়ে একবার একজন বিখ্যাত লেখক এর একটি জনপ্রিয় উপন্যাস পাঠ করবার পর, আমি যখন ঘুমাতে যাই, তখন স্বপ্নের মাঝে, গল্পের নায়ক-বেশে আমার অন্য এক স্বত্তার আবির্ভাব ঘটে। আমার এমন একটি মানসিক অবস্থা তৈরি হয়েছিল যা বলবার মত না। বেশ কয়েকদিন ধরেই এমন হতো যে, আমি ঘুমাতে গেলেই সেই গল্পের নায়কের চরিত্র ধারণ করে, ভিন্ন একজন আমি কে দেখতে পেতাম। বেশ কয়েকদিন যেন এক ঘোরের মধ্যে আমার দিন কেটেছিল। এমনটি হয়তো আরও অনেকেরই হয়ে থাকে, আর এর মাধ্যমেই পাঠক পাঠের পরিপূর্ণ আনন্দকে আস্বাদন করতে পারে। এই ধরনের অভিজ্ঞতাকে পাঠের চুড়ান্ত আনন্দের বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। ক্যারিশমাটিক লেখক এর দক্ষতা বোধ করি এখানেই। এই ধরনের লেখাকে এক একজন পাঠক এক এক রকমভাবে ধারণ করতে থাকে। তখন থেকে সেই লেখা পাঠকের কল্পনার একান্ত সাথী হিসেবে বিরাজ করে। যে বিষয়টিকে বিখ্যাত দার্শনিক রোলা বার্থ এর ‘ডেথ অফ অথর’এর সাথে তুলনা করা যায়। সেই একই কারণে বলা যায় যে, এ ধরনের লেখার মধ্য দিয়ে একজন লেখক অমরত্ব লাভ করেন। তবে এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে যে, সকল সময়েই কি পাঠকের পাঠাভ্যাস এবং তার কল্পনার ক্ষেত্রটি কি এমন ছিল নাকি সময়ের সাথে এটিও বদলায়?

এবার যদি আমরা পাঠকের একাল-সেকাল হিসেবে একটি তুলনামূলক আলোচনা দাঁড় করবার চেষ্টা করি তাহলে দেখা যাবে যে পাঠকের পাঠের ধরণ, তার প্রকাশভঙ্গি এবং লেখাকে তার নিজের মধ্যে ধারণ করবার বিষয়টি যুগ থেকে যুগে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভিন্নভাবে বিরাজমান ছিল। একটা সময় আমাদের আগের প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার প্রতি একটি অপরিসীম আগ্রহ যেমন ছিল তেমনি, বই নিয়ে অনানুষ্ঠানিক থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার নানাবিধ কার্যক্রম পরিলক্ষিত হতো। সাথে পাড়ায় পাড়ায় বই এর লাইব্রেরির অবস্থান অনেক বেশি ছিল। এখানে লাইব্রেরি বলতে বই এর দোকান এর কথা বলছি, যেখানে বই কেনার পাশাপাশি চাইলে বই পড়াও যেত। যদিও এখানে বই এর দোকানের মালিকের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার একটি বিষয় ছিল। এর সাথে এলাকার বড় ভাইদের কিংবা বন্ধুদের নিকট থেকে বেই ধার করে হলেও নতুন বা পুরাতন নানা বই পড়ার একটি অভ্যাস অনেকের মধ্যেই ছিল। আমি এখনো মনে করতে পারি যে, আমি যেমন অনেক বই এভাবে হারিয়েছি, তেমনি অনেকের অনেক বই এখনো আমার বই এর আলমিরাতে শোভা পায় যা ধার করে নিয়ে আসার পর আর ফেরত দেয়া হয়নি। এ নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে অনেকের সাথে যে মনকষাকষি হয়নি সেটা বলা যাবে না। তবে এসবই ছিল এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও সাময়িক একটি বিষয়। পুরো বিষয়টির মাঝে যে আনন্দ লুক্কায়িত ছিল সেটি এতকাল পরে এসে অভাবনীয় মনে হয়।

 

স্কুলে থাকতে আমার শামসুর রাহমানের লেখা নির্বাচিত কবিতার বইটি আমার এক বন্ধুর নিকট থেকে নেয়া যা আর তাকে ফেরত দেয়া হয়নি। এমন আরো অনেক বই এর কথা উল্লেখ করা যাবে। নতুন কিছু জানা বা নতুন কবিতা ও গল্প পাঠের আনন্দ আস্বাদনের জন্য আমরা এইটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে একটুও পিছ-পা হতাম না। এর সাথে যুক্ত হয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমান বই এর লাইব্রেরী। এটি যে কত শত হাজার নতুন নতুন পাঠক তৈরিতে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে তা বলে বোঝানো যাবে না।

 

আমাদের সময়ে বই হাতে পেলেই প্রথম যে কাজটি করতাম সেটি হলো নতুন বই এর ঘ্রান নেয়া। এটি যে কতটা মধুর হতে পারে সেটি আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমি এখনো নতুন বই হাতে পেলে তার ঘ্রান না নিয়ে পড়তে শুরু করি না। এমন অভ্যাসের সাথে একটি বই হাতে না নিয়ে বই পাঠের কোন আনন্দই আমি পেতাম না। বোধকরি আরো অনেকেরই এমনটি হতো বা এখনো হয়। যখন বিলেতে পড়তে গেলাম মনে আছে, বিশ পাউন্ড (যা প্রায় আড়াই হাজার টাকার মত ছিল) দিয়ে জীবনে প্রথম বিদেশের মাটিতে একটি বই কিনতে হলো। সেই বইটি এখনো যখনই আমি দেখি, আমার বুকের কোনে একটি তীব্র ব্যথা আমি এখনো উপলব্ধি করি। বই উচ্চমূল্যের জন্য নয় বরং নিজের বোকামির কথা মনে করে এমন হয়। কেননা পরে জানতে পারি আমাজন নামক একটি ওয়েব থেকে আরো অনেক কম দামে বই কেনা যায়। এর পর থেকে এই আমাজন থেকে কত যে বই কেনা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। বিলেতে অনেক পিডিএফ বই পড়ার ভিড়েও আমি খুঁজে খুঁজে সস্তায় বই কিনে রাখতাম। তাই যখন দেশে ফিরলাম, কয়েকটি সুটকেসে কেবল আমার বই ছিল। এগুলো যখনই আমি দেখি, মনের মধ্যে কি যে এক প্রশান্তি অনুভব করি তা ভাষায় প্রকাশ করবার মত নয়।

তথ্য-প্রযুক্তির আগের যুগের এই ম্যানুয়াল বই পাঠের বিষয়টি আমাদের নিকট এক অভাবনীয় বিষয় ছিল যা সাম্প্রতিক ফ্লুইড বা তরল আধুনিকতার যুগে একদমই সেই আবেদন আনতে পারে না। অপরদিকে, সাম্প্রতিক প্রজন্মের পাঠের বৈশিষ্ট্যকে যদি সামনে নিয়ে আসি তাহলে আমরা কি দেখতে পাই? এই সময়ের পাঠকদের বিষয়ে একটি প্রচলিত সমালোচনা বা আলোচনা হলো এই যুগের ছেলেমেয়েরা বই পড়তে ভালবাসে না। আমরা যে এত এত তরুণ প্রজন্মের দর্শনার্থীদের বই মেলায় ঘোরাঘুরি করতে দেখি তারা আদতে কোন প্রয়োজনে এখানে আসেন, যদি তারা বই না কিনেন? এ কি কেবলই  বইমেলাকে একটি প্রথাগত মেলা হিসেবেই বিবেচনা করে নাকি সাথে তারা বইও কিনে থাকে? নাকি তারা বই কেনে ঠিকই কিন্তু তাদের পাঠের অভ্যাসটি সেই আগের প্রজন্মের তরুণদের মত নেই? এই প্রশ্নগুলো অনেকের মতই আমারও। হতে পারে ড্রইংরুমের আলমিরা সাজানোর এক প্রবণতা আমাদের মধ্যে এই সময়ে বিদ্যমান। এই বিষয়টিও একটি ভাবনার বিষয়। তবে এই বিষয়টি কেবলই যদি আমরা একটি প্রজন্মের উপর চাপিয়ে দেই তাহলে হয়তো আমরা একটি ভুলই করবো। কেননা, এটি মানুষের পুরনো একটি অভ্যাস যা অনেকের মধ্যেই বিদ্যমান যা কেবল প্রজন্মের বেড়াজাল দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাবে না। তবে নতুন প্রজন্মের বই মেলায় যাবার বিষয়টি আমি ইতিবাচক ভাবেই দেখি- তারা বেই কিনুক বা নাই কিনুক। কেননা এভাবেই তারা মেলায় ঘুরতে ঘুরতেই কোন এক সময় হয়তো অন্যমনস্ক হয়েই বই পড়তে শুরু করবে।

 

একটি বই হাতে পাবার পর থেকে সেই বইটি হাতে নিয়ে দেখার আনন্দ উপভোগ করা এবং সেই আনন্দ টিকে বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া বা নতুন বই এর ভাজ খুলে তার গন্ধ নেয়ার বিষয়টি এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে অনেকটাই কমে গিয়েছে। আমার মতে এইসবই ছোট-খাট অভ্যাস আমাদের পাঠের আনন্দকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি যখন আমাদের হাতে ই-বুক তুলে দেয় তখন পাঠকের এই সব খুটি-নাটি অভ্যাসে এক পরির্বতন নিয়ে আসে, যেখানে বই হাতে নিয়ে দেখার ঐতিহ্যে অনেকটাই ভাঁটা পড়ে বলে মনে হয়। একই সাথে এই ই-বুকের প্রচলন বোধহয় পাঠের প্রতি অনীহা তৈরির একটি অন্যতম কারণ, কেননা এভাবে দীর্ঘক্ষন ধরে একটানা বই পাঠ করা একটি ক্লান্তি নিয়ে আসে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব বা কিন্ডল ব্যবহার করার মাধ্যমে পাঠের প্রথাগত ও পরিপূর্ণ আনন্দ হতেও পাঠক বঞ্চিত হয়। এভাবে ধীরে ধীরে একটি প্রজন্ম, এভাবে তথ্য-প্রযুক্তির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হবার কারণে বই পাঠের অভ্যাসে একটি আগ্রহহীনতা তৈরি করছে। এ কারণেই হয়তো ঘুমাতে যাবার আগে কিংবা এক কাপ চা হাতে অনেককেই আর বই পড়তে দেখি না, যেখানে বই পাঠরত এই ভঙ্গিমাকেও অনেক মধুর বলে মনে হতো। আবার কারো কারো মধ্যে আরেকটি প্রবণতা দেখা যায় সেটি হল ই-বুক এর মাধ্যমে একাডেমিক পাঠকে চালিয়ে যাওয়া, যা আমি নিজেও অনেকটা করি। অপরদিকে মনের খোরাক মেটানোর জন্য সেই প্রথাগত বইয়ের প্রতিই তার আকাঙ্ক্ষা এবং আগ্রহ কে আমরা দেখতে পাই। আর এ কারণেই আমরা প্রতি বছর বইমেলায় নতুন নতুন বইয়ের প্রকাশ এর ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করি। যা এই সময়ের বিচারে এক অভাবনীয় বিষয় বলে আমার মনে হয়। এর মাধ্যমে আমরা আবার হয়তো পাঠকের বেই পাঠ এর ঐতিহ্য ও প্রবণতাকে ফিরিয়ে আনতে পারব।

 

সামর্থ্যবান অনেকের বাসায় পাঠের জন্য একটি নির্ধারিত কক্ষ কিংবা কারো কারো বাড়িতে কোন একটা কর্নার তৈরি করার একটা প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যে লক্ষণীয়। আমার মনে হয় এটি একটি খুবই চমৎকার একটি ভাবনার প্রয়োগ। এর সাথে আর একটি বিষয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো কারো হয়তো ভোরবেলা বারান্দায় বসে বসে আয়েশ করে পড়তে ভালো লাগে, আবার কারো হয়তো বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়তে আরো বেশি ভালো লাগে। কেউ হয়তোবা বই পড়বার আগে অতটা চিন্তাই করে না যে সে কোথায় বসে বইটি পড়বে। বই হাতে পেয়ে সে তার সোফাতে কিংবা পড়ার টেবিলে কিংবা বিছানায় চলে যায় এবং সেই বইটি শেষ না করা পর্যন্ত যেন অন্য কোন চিন্তা তার মাথার মধ্যে থাকে না। এ ধরনের নানা রকম মজার বিষয় বই পাঠের সাথে যুক্ত থাকে। আমরা আগের প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই খবরের কাগজ হাতে নিয়ে প্রাতঃক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বাথরুমে ঢুকে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখতাম। বিলেতে অনেকের বাসার বাথরুমে ঢুকে আমার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যেত সেখানে সাজানো অনেক বই কিংবা পত্রিকা দেখে। সে বিচারে আমাদের দেশের পাঠকের বৈশিষ্ট্য হয়তো একটু ভিন্ন কিন্তু পাঠের অভ্যাস ব্যক্তির মানুষ গড়ে তোলার জন্য যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সে কথা না বললেই নয়।

 

আর তাই পাঠের পরিবেশ বা অভ্যাস যেমনই হোক, সেটি যদি পাঠকের সাথে যোগাযোগ ঘটাতে পারে তাহলেই লেখক বেচেঁ থাকে আমৃত্যু। এভাবে একজন লেখক তার পাঠকের কল্পনার জগতে নানা ভাঙ্গা গড়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আর লেখক তার সময়কে ছাপিয়ে সর্বজনীন একজন লেখকে রূপান্তরিত হন। এভাবে খুব কম লেখকই তার সময়কে ছাপিয়ে যেতে পারেন। আর যারা পারেন তারাই আসলে কালের পরিক্রমায় বেঁচে থাকেন পাঠকের মনে যুগ থেকে যুগান্তর।

 

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here